মঙ্গলবার, আগস্ট ১৫, ২০১৭

কথক-এর আয়োজন 'প্রতিধ্বনি শুনি'


    কবিতার ভার অনেক, ধারও অনেক। গানের সাথে তুলনায় যাওয়া হয়তো উচিত হবে না, তবু খানিকটা ধৃষ্টতা দেখিয়ে বলেই ফেলা যায়, গান অনেক বেশি বারোয়ারি, বা পরিশীলিত ভাষায় বলা যায়, সার্বজনীন। চন্দ্রিল ভট্টাচার্য যেমনটা বলেছেন, গানের ব্যাপার অনেকটা রিফ্লেক্সের মতন, কেউ আপনার দিকে একটা টেনিস বল ছুঁড়ে মারলো তো আপনি না চাইলেও সেটা পট করে ধরে ফেলবেন। গানও তেমনি, বাজলো তো শুনবেন। 
     অবশ্য গানের সার্বজনীন হবার আরও বড় কারণ, গান আসলে বড় বেশি মায়াময় একটা ব্যাপার। সুরের সম্মোহন মিশিয়ে কেউ যখন গান গায়, কার হৃদয়ের কোন যে তারে সেটা টুং করে বেজে উঠে এমন অদ্ভুত মায়ার সৃষ্টি করে, সে মায়ায় কখনও ভালো লাগার মেঘে সব ভেসে যায়, কখনও বুক ফুঁড়ে হু হু করে কান্না পায়। মোদ্দা কথা হলো যে, গানের জন্যে পাগল না হয়ে পারা যায় না, গানের জন্যে ভালোবাসাটাও তাই স্বতঃস্ফূর্ত। 
    কবিতা, সে তুলনায়, খানিকটা বুঝবার ব্যাপার, কবিতাকে ভালোবাসাটাও আচমকা কিছু নয়, বরং বেশ অনেকটা প্রস্তুতির ব্যাপার। 
    মেলবোর্নে গানের আয়োজনের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। আনন্দের এবং আশার কথা, সে সব আয়োজনের অধিকাংশই এখন বেশ মন কাড়া, মানসম্মত। কিন্তু সে তুলনায় কবিতার আয়োজন একেবারেই নগণ্য। তাই যখন জানলাম ‘কথক’ এবারে কবিতার আসরের আয়োজন করছে, রীতিমতন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে ছিলাম। ‘কথক’ সত্যিকার অর্থেই মেলবোর্নের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক দল। সর্বশেষ তাঁদের আয়োজন করা ‘যাত্রা’ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। ভিনদেশের অডিটরিয়ামে সত্যি সত্যিই যাত্রার মঞ্চ, আর সেই মঞ্চে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার ঝলমলে পদচারণাই মুগ্ধ করে দেবার জন্যে যথেষ্ঠ ছিল। কিন্তু সেই সাথে উপরি পাওনা ছিল সেই চিরাচরিত ‘বিবেক’ এর উপস্থিতি, আর মঞ্চের পাশে অবিরত সংলাপ বলে যাওয়া প্রম্পটার। সব মিলিয়ে দারুণ! 


    কথক- এর এবারের আয়োজন ছিল ‘প্রতিধ্বনি শুনি’। ‘বিগত কয়েক শতক ধরে শান্তির খোঁজে মানুষের বিরামহীন সংগ্রামের গল্প নিয়ে’ আয়োজিত। 
    চ্যান্ডলার কম্যুনিটি সেন্টারে ঢুকে দর্শকদের রুগ্ন উপস্থিতি দেখে খানিকটা মন খারাপ হলো। আবার এটাও মনে হলো, যারা এলো না তাঁরা যদি জানতে পারতো কি মিসটা করছে! 
    মৃণাল-এর করা মঞ্চসজ্জা সুন্দর ছিল অনেক। আয়োজনের সাথে মানানসই দেয়ালচিত্র সুন্দর সঙ্গত দিয়ে গেছে পুরো অনুষ্ঠান জুড়েই। কয়েক মুহূর্তের জন্যে প্রায় এক যুগ আগের ফেলে আসা শিল্পকলা একাডেমি আর পাবলিক লাইব্রেরির মঞ্চের কথা মনে পড়ে গিয়েছিলো। 
    এনি আজিম এর সাবলীল উপস্থাপনা দিয়ে অনুষ্ঠানের শুরু, তারপরের দুটি ঘণ্টা কেবলই মুগ্ধতা, কেবলই ভালো লাগা। কবিতাগুলোর নির্বাচন যথার্থ হয়েছে। প্রত্যেকেই এত সুন্দর আবৃত্তি করেছেন...,  রাজীবুল ইসলাম, নাজনীন আনোয়ার, জহিরুল মল্লিক- প্রত্যেকেই দুর্দান্ত। ঠিক কতদিন পরে ভাস্কর চৌধুরীর নিরঞ্জনকে শুনতে পেলাম মনে করতে পারছি না, কিন্তু যতবারই ‘মানুষ’ শব্দটির উচ্চারণ শুনলাম, ততবারই কেঁপে কেঁপে উঠলাম। ভালো লেগেছে বাবু-র আবৃত্তি, শুভ্রের গল্প পাঠ তো অসাধারণ। বুকের ভেতরের কোথাও যেন কেউ আচমকা মুচড়ে দিয়ে গেল। আর মৌপিয়া-র কথা কী বলবো, আবৃত্তির সাথে সাথে তাঁর সমস্ত সত্তা যেন জ্বলজ্বল করছিলো মঞ্চে। অনুষ্ঠান শেষে আমি থাকতে না পেরে ওনাকে গিয়ে বললাম, “আপনি হচ্ছেন বস ক্যাটাগরির মানুষ!”  
    কবিতার সাথে সাথে মানানসই গানও ছিল বেশ কিছু। খুব ভালো লেগেছে শায়লা-র গান। ওঁর কণ্ঠে মৌসুমি ভৌমিকের ‘এখানে তুমি সংখ্যালঘু’ গানটি মনে হয়েছে নতুন জীবন পেয়েছে যেন। হিমানীর নিখুঁত কণ্ঠের গানও ভালো লেগেছে। পুরো অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় ছিল মুনশিয়ানার ছাপ। 
    শুধু একটা ব্যাপার, পর পর দুটি কবিতার মাঝের বিরাম খানিকটা অপ্রতুল মনে হয়েছে। কেমন মিলে মিশে মনোটোনাস হয়ে যাচ্ছিলো বার বার। দর্শক শ্রোতাদেরকে কবিতাটি অনুধাবনের জন্যে আরেকটু সময় দিলে ভালো হয়। আর কবি এবং কবিতার নাম জানান দেয়ার কোন উপায় রাখা হলে আরও ভালো হতো। 
    পুরো আয়োজন শুনতে শুনতে সত্যিই মনে হচ্ছিল এ যেন শেষ না হয়, চলুক সারা রাত ধরে। মাথার ভেতর অসংখ্য প্রিয় কবিতারা কেবলই ভিড় করে যাচ্ছিলো, সময়ের সাথে সাথে আরও কবিতা শুনবার তৃষ্ণা বেড়েই যাচ্ছিলো শুধু। 
    খানিকটা হলেও সুখের ব্যাপার, অনুষ্ঠান শুরুর বেশ কিছু পরে আরও কিছু দর্শক-শ্রোতা যোগ দিয়েছিলেন। গ্যালারি ভরে উঠেছিলো ক্রমশ। 
    মেলবোর্নের সংস্কৃতি-প্রিয় মানুষদের বলি, গানের অনুষ্ঠানে গিয়ে সুরের মায়ায় জড়িয়ে যান যেমন করে, তেমনি করে কবিতার আসরেও আসুন আরও বেশি বেশি। এসে হৃদয়টাকে, নিজের অস্তিত্বকে, নিজের চিন্তা-চেতনা-বোধকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে যান।  
    আর কথক-এর কাছে দাবি, আরও নিয়মিত কবিতার আয়োজন চাই আপনাদের কাছ থেকে, আরও অনেক বেশি বেশি। 

রবিবার, আগস্ট ০৬, ২০১৭

অসুখের ছবি-

এবারে একেবারে জমকালো ঠাণ্ডা পড়েছে মেলবোর্নে। 
এইটুকু লিখে মনে হলো, প্রতিবারই কি এরকমই লিখি? নাকি এবারের ঠাণ্ডা আসলেই অনেক বেশি!
প্রতি বছরই প্রস্তুত থাকি, সপ্তাহখানেক সর্দি কাশি লাগিয়ে বসে থাকবো বাসায়। রুটিনের মত করেই। ব্যস, ওই একবারই। তারপরেই আবার পুরো বছরের জন্যে মুক্তি। 
কিন্তু এবারের ঠাণ্ডা আমাকে ভালোই বাগে পেয়েছে। মাসখানেক আগে সোনামুখ করে সপ্তাহখানেক সর্দি জ্বরে ভুগলাম, বাৎসরিক রুটিন শেষের পরে যখন ভালো হয়ে গেলাম, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ভাবলাম, আহ, কি শান্তি। 
কিন্তু এই সপ্তাহখানেক আগেই আবার হঠাৎ কী হলো, দেখি নাকের ভেতরে বাতাসের সুড়সুড়ি, কপালে হাল্কা গরমের আভাস। আমাকে আশ্চর্য করে দিয়ে জ্বর ব্যাটা এই এক বছরেই দ্বিতীয়বারের মতন এটাক করে বসলো আমাকে! 
এটা একেবারে যাকে বলে, খুব খারাপ হলো। 
কুমিল্লায় রিকশা চড়লে একসময় রিকশাওয়ালা মামারা ভাড়ার কথা বলতে গেলেই শোনাত, মামা, ইনসাফ করে দিয়েন। 
রিকশা থেকে নেমে ভাড়া যত বেশিই দিতাম না কেন, তাদের করুণ চোখ দেখে সর্বদাই মনে হতো, ব্যাপক না-ইনসাফি করে ফেলেছি! 
আমি এখন একই চোখ করে কোল্ড এন্ড ফ্লু- দিকে তাকিয়ে আছি, তাই বলে দ্বিতীয়বার! একেবারে না-ইনসাফি হয়ে গেলো না আমার সাথে? 

অসুখে পড়লে আমি একটু ঝিম মেরে যাই। জ্বর থাকলে বিছানায় শুয়ে বসে বই পড়ে কাটিয়ে দিতে হয়। 
এবারেও তাই করছিলাম। পরে ভাবলাম দেখি অন্য একটা কাজে লাগানো যায় কি না সময়টা। 
নতুন একটা এপ নামিয়েছি আইপ্যাডে, Procreate নাম, দুর্দান্ত যাকে বলে। অনেক ভালো সব ফিচার, কিন্তু দাম একেবারেই সস্তা। মাত্র / ডলার। রীতিমতন ফ্রি দিয়ে দিচ্ছে বলে মনে হলো আমার। 
সেই প্রোক্রিয়েট দিয়ে শেষমেশ একটা ছবি এঁকে ফেললাম। একেবারেই বেসিক টুলস। আমার বহু বছরের পুরনো আইপ্যাড, সাথে একই পুরনো ওয়াকম স্টাইলাস, কোন প্রেশার সেনসিটিভিটি নেই। তবু আঁকতে গিয়ে মজাই লাগলো। 

এটাকে আমি মনে মনে নাম দিলাম, অসুখের ছবি। 



বুধবার, জুলাই ১২, ২০১৭

The Little Big Library


আজ বিকেলবেলায় বাসার সামনে আমার লেটার বক্সের নিচে এই জিনিসটা সেট করে ফেললাম। 
বেশ আনন্দ লাগছে! :) 
ঠিক বড় মাপের বাক্স পাইনি খুঁজে, এটা আসলে একটা লণ্ঠন। আপাতত এটা দিয়েই কাজ চালানো যায় কি না দেখি। 
নাম দিয়েছি দি লিটল বিগ লাইব্রেরি। 
সব মিলিয়ে ১৩ টির মত বই আঁটানো গেছে ভেতরে। ধারের নিয়ম খুব সোজা, একটা বই নিলে একটা রেখে যেতে হবে বদলে। 
দেখা যাক, কী হয়। 

রবিবার, জুন ১১, ২০১৭

৯ জুন ২০১৭।

একটা মনে রাখার মত দিন গেলো গতকাল। ৯ জুন ২০১৭।
সন্ধ্যায় গেলাম MCG তে, আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল এর খেলা দেখতে। লিওনেল মেসি কে সরাসরি মাঠে বসে দেখার সুযোগ হারাতে ইচ্ছে হল না। এবং গিয়ে আসলেই খুব ভাল লাগলো, মেসি-র খেলা দেখা হল, আর্জেন্টিনাও জিতল ম্যাচ ১-০ তে।



তারপরে দেখতে বসলাম বাংলাদেশ আর নিউজিল্যান্ডের খেলা।
আমার বাজে স্বভাব, খেলার শেষ বল পর্যন্তও বাংলাদেশের উপরে ভরসা হারাই না। ৩৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়েও আমি তাই মেরুদণ্ড সোজা করে বসে খেলা দেখে গেলাম। এবং ওয়াও, এর চেয়ে ভালো প্রতিদান পাওয়া কি সম্ভব ছিল কোন? দেখলাম বাংলাদেশের অন্যতম সেরা জয়!
ধন্যবাদ মাহমুদুল্লাহ, অনেক অনেক ধন্যবাদ সাকিব, এই খান থেকে কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়ার দিন শুরু হলো হয়তো আমাদের।

বুধবার, জুন ০৭, ২০১৭

ওয়ার্কশপ

 ১
 তাঁরা তিন ভাই। বাংলাদেশের সবচেয়ে সুপরিচিত পরিবারই বলা চলে তাঁদেরকে।  বড় দুজন দেশের জনপ্রিয়তম লেখক, ছোট জন আমাদের দেশের কার্টুনিস্টদের কাছে গুরুপ্রতিম। তিনজনের লেখার  কল্যাণেই তাঁদের শৈশব, অদ্ভুত সুন্দর পরিবার বা বেড়ে ওঠার সময়টারও অনেক কিছুই পাঠকদের জানা। আমরা জানতে পারি, শৈশবে তাঁদের বাবা কবিতা শেখার বিনিময়ে তাঁদেরকে সম্মানী দিতেন, বড় কবিতায় আট আনা, ছোট কবিতায় সিকি পয়সা। বাজারের ফর্দ লেখার মত করে নিয়মিত তাঁরা গল্প-কবিতা লিখতেন ছোটবেলায়, কখনো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে, কখনও সেই, সম্মানীর বিনিময়ে।  যখন এই সব পড়েছিলাম, মাঝে মাঝে আপন মনে ভেবেছি, লেখক হবার বীজ এমন করেই শৈশবে তাঁদের মধ্যে বুনে দিয়েছিলেন তাঁদের বাবা। কী চমৎকার একটা ব্যাপার। 
আইবুক থেকে সপ্তাহে একদিন নিউজলেটার পাঠায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বই এর বিজ্ঞাপন, নতুন কী বই এলো, এখন কোনটা সবচেয়ে বেশি চলছে, এরকম সব কারবার। এমনই একটা নিউজলেটারে পেলাম Liane Moriarty-র নাম। নিউইয়র্ক টাইমস বেস্ট সেলার লেখিকা। বিশেষ আগ্রহ হল লেখিকা অস্ট্রেলিয়ার শুনে। আইবুক থেকেই কয়েকটা বই এর স্যাম্পল নামিয়ে কয়েকটা প্রথম চ্যাপ্টারও পড়া হয়ে গেলো। তরতর করে এগিয়ে চলা গদ্য, চমৎকার রসবোধ লেখায়, পড়তে খুবই সুস্বাদু। কী ভেবে লেখিকার ওয়েবসাইটে ঢুকলাম। 
যে কোন বইয়ে আমার সবচেয়ে পছন্দের অংশ হচ্ছে লেখকের লেখা ভূমিকা এবং লেখক পরিচিতির অংশটুকু। আর এখনতো ওয়েবসাইটে লেখক-পরিচিতিটা বেশ বিশদে দেয়া থাকে। 
লিয়ান মরিয়ারটি ‘এবাউট মি’ পাতাটা পড়ে বেশ চমকে গেলাম। শুধু একটা প্যারা এখানে তুলে দিচ্ছি। 
‘লেখিকা প্রথম গল্প কবে লিখেছিলেন সেটা এখন আর মনে নেই, তবে প্রথম প্রকাশনা চুক্তির কথা খুব ভাল করেই তাঁর মনে আছে। বাবার জন্যে তিনি একটি উপন্যাস লিখে দিবেন, এই মর্মে চুক্তি করে বাবার কাছ থেকে অগ্রিম পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন তিনি এক ডলার। বিনিময়ে তিন খণ্ডের এক মহাকাব্যিক উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি তখন, নাম ছিল- ‘ দি মিস্ট্রি অব ডেড ম্যান’স আইল্যান্ড।’’ 

৩ 
লিয়ান মরিয়ারটিরা ছয় ভাই বোন। 
তাঁদের মধ্যে তিনজনই এখন লেখিকা। লিয়ান এর ছোট দুই বোন জ্যাকলিন এবং নিকোলারও বেশ কয়েকটি করে বই প্রকাশিত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। সেসব বই জনপ্রিয়ও হয়েছে বেশ। 

জ্যাকলিন এর ওয়েবসাইটে পরিচিতির পাতাটা সাম্প্রতিক সময়ে আমার পড়া সবচেয়ে প্রাঞ্জল ও মজার লেখা, সন্দেহ নেই।  

শুক্রবার, জুন ০২, ২০১৭

অনুবাদ প্রচেষ্টাঃ রবিন হলের দি কার্টুনিস্ট'স ওয়ার্কবুক এর ভূমিকা


ভুমিকাঃ দি কার্টুনিস্ট’স ওয়ার্কবুক 
    কার্টুন আঁকার ব্যাপারটা আমার কাছে চিরকালই খুব আকর্ষণীয় মনে হয়েছে, কারণ আমার ধারণা ছিল অন্য চাকুরেদের মত কার্টুনিস্টদের নিশ্চয়ই রোজ রোজ  সকালে ঘুম ভেঙ্গে কাজে যেতে হয় না। অবশ্য, এটাই একমাত্র কারণ নয়। আমি রীতিমতন মুগ্ধ হই এই ভেবে যে, কেবল একটা কার্টুন দিয়েই কেমন করে আমাদের জীবনের প্রায় সব রকম দৃষ্টিভঙ্গি ফুটিয়ে তোলা যায় - খুব সিরিয়াস কোন ব্যাপার থেকে শুরু করে  খুব মজার কিছু- অথবা দুনিয়া কাঁপানো কোন ঘটনাই হোক বা খুব সাধারণ কোন ব্যাপার- সব কিছু কেবল একটা ছবিতেই কেমন এঁকে ফেলা যায়।
        যাই হোক, আমি সেই ভাগ্যবানদের দলে পড়ি না যারা নানা রকম সৃজনীশক্তি নিয়ে জন্মেছে। সত্যি বলতে কি, আমার আঁকা ছবিও একেবারেই ভাল ছিল না; এমনকি খুব প্রাথমিক পর্যায়ের আঁকাআঁকিও দেখতে কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাং মনে হতো। সুতরাং কার্টুনিং যদি করতে চাই, আমাকে যে খুব ভালমতন উঠে পড়ে লাগতে হবে সেটা আমি বেশ বুঝেছিলাম। তাই হাতের কাছে আমি যা কিছু কার্টুন পেতাম সব ভাল করে দেখা শুরু করলাম, শত শত কার্টুন। আর সেগুলো দেখে দেখে আঁকা অনুশীলন করতাম কেবল, করেই যেতাম করেই যেতাম।
       অল্প অল্প করে যখন আমার আঁকা ভাল হতে শুরু করলো, আমি বুঝতে পারলাম যদি কার্টুন আঁকবার সময় আমি কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি আর ধরাবাঁধা উপায় অনুসরণ করি, তাহলে সেগুলো সত্যিই ভাল হতে বাধ্য। সময়ের সাথে সাথে এই পদ্ধতি বা উপায়গুলোকেই আমি একটা কার্যপ্রণালীতে পরিণত করে ফেললাম, যেটা শেষমেশ আমাকে কার্টুনিং জগতের দরজা খুলে দিলো।
       এই বইটি মূলত সেই পদ্ধতিগুলোকে ভাগ করে নেবার একটা চেষ্টা, বিশেষত তাদের সাথে যাদের আমার মতই উৎসাহের কোন কমতি নেই, কমতি আছে সৃজনীশক্তিতে। যারা মাত্রই শুরু করতে যাচ্ছেন এবং যারা ইতিমধ্যেই পেশাদার কার্টুনিস্ট, তাদের সবার জন্যেই আমি বেশ কিছু প্রাসঙ্গিক ছবি যোগ করে দিয়েছি, সেগুলো আশা করি সবার কাজে আসবে।
     সবশেষে সকল নব্য কার্টুনিস্টদের জন্যে আমার শুভ কামনা রইলো। 
সেই সাথে বলে রাখি ঐ কথাটি কিন্তু মিথ্যে নয়, কার্টুনিস্টদের কিন্তু আসলেই রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয় না।
- রবিন হল 



শুক্রবার, মে ২৬, ২০১৭

সন্ন্যাসীদা

সন্ন্যাসীদা নাকি আর নেই।
থ্রি কমরেডস অনুবাদের সেই অসাধারণ লেখনী, কামরাঙা ছড়াকার, সোভিয়েতস্কি কৌতুকভ পড়ে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়া, অথবা আমার খুব পছন্দের 'ক্রিকেটরঙ্গ'!
বিদায় মাসুদ মাহমুদ,  বড় অভিমানী ছিলেন আপনি...

পুনশ্চঃ
সকালে এটুকু লিখে বের হতে হল। গন্তব্য ডাক্তারখানা। সেখানে গিয়ে নাম লিখিয়ে অপেক্ষা করছিলাম বসে বসে। লম্বা সময়, কিছু একটা পড়বো ভেবে বইটা খুলেই দেখি এই, চমকে উঠলাম একেবারে। এই অনুবাদটার কথা জানা ছিল না আমার।
বুঝলাম, চলে যাওয়া মানে আসলেই প্রস্থান নয়।

শুক্রবার, মে ১৯, ২০১৭

কতটা অপচয়ের পর মানুষ চেনা যায়-

ঠিক জানি না, এক জীবনে আর কতবার, কত বার এই গানটার কাছে ঋণী হতে হবে, ফিরে ফিরে আসতে হবে বারবার, বারবার...। 
প্রশ্নটা কি আসলেই সহজ, আর উত্তরও কি সত্যিই জানা? 



শনিবার, এপ্রিল ০৮, ২০১৭

এইটা তোমার গান

চন্দ্রবিন্দুর গান গুলোর একটা ব্যাপার হচ্ছে , গানগুলো সব মায়ায় ভর্তি|
বিষয় যাই হোক, প্রেয়সী বা কোন হৃদয়হীনা, রিকশাওয়ালা বা ভিনদেশি কোন তারা, বিকেলবেলার গান, সব, সব কিছুর জন্যেই তাদের অসীম মায়া |
গানগুলো শুনতে এ কারণেই হয়তো এতো বেশি ভালো লাগে, এতো বেশি মনে লাগে |

মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০১৫

জালালের গল্প

সর্বশেষ ইমনের করা কাজ দেখেছিলাম আমাদের বসার ঘরের টিভিতে, সেটা ছিল আরএময়াইটি-র ফিল্ম কোর্সের জন্যে ওর বানানো একটা শর্ট ফিল্ম। ইমন আর তন্বীর মেলবোর্নে থাকাকালীন একটা বছর আমাদের জন্যে উল্লেখযোগ্য একটা সময় হয়ে থাকবে আজীবন, সেটা নিয়ে লিখেছি আগে এখানেই, নাম ছিল ‘গগন আজ দেশে ফিরছে”। সে দিন সকাল বেলা আমাদের বাসায় বসে দুইজনে ব্যাগ গোছাচ্ছে, আর পাশের ঘরে বসে আমি ভীষণ মন খারাপ করে লিখে চলেছি সেই ব্লগ, অতঃপর রাতে যখন ওদের প্লেনে তুলে দিয়ে আসলাম, মনে আছে তারপরের অনেকগুলো দিন আমার আর তিথি-র চারপাশ জুড়ে ছিল একটা অদ্ভুত শূন্যতা।

সেই প্লেন উড়ে চলে যাবার বছর চারেক বাদেই যে আমি আবু শাহেদ ইমনের পরিচালিত সিনেমা বড় পর্দায় দেখার জন্যে এই মেলবোর্নেরই এক সিনেমা হলের টিকেটের লাইনে দাঁড়াবো, সত্যি বলছি, এই কথা সেদিন ঘুর্নাক্ষরেও ভাবিনি! 

কিন্তু এই ছেলে আসলে চমকে দিতে জানে! প্রতিবার ওর সাথে কথা বলার সময় নতুন কোন চমকের জন্যে প্রস্তুত থাকি, চমকে দেয়াটাকেই একরকম নিয়মে পরিণত করেছে সে! 

জালালের গল্প- নিয়ে ওর ভাবনার কথা জানি অনেকদিন। শুরুর দিকের একটা স্ক্রিপ্ট রয়েছে আমার কাছে, যখন এই গল্পের নাম ছিল জালালের পিতাগণ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে ছিল গল্পের গুরুত্বপুর্ন চরিত্র। কিন্তু ইমনের মজা হল এই, ওর মাথায় গল্পেরা সারাক্ষণই বদলে বদলে যায়। এই অভ্যাস দেখেছিলাম ইমন যখন এখানে ছিল, তখুনি। তাই ওর জালালের গল্প দেখতে গিয়ে যখন দেখি শুরুর সেই গল্প একেবারে আগাগোড়া বদলে গেছে, একেবারেই অবাক হইনি, মনে হয়েছে, এটাই আসলে ইমন, ওর ট্রেডমার্ক।  

সিনেমার শুরুটা দুর্দান্ত! একটা রান্নার হাঁড়িতে করে ভাসতে ভাসতে আমাদের জালাল এসে পড়ে  গ্রামের মিরাজের ঘরে। সেখানে ঘটনাক্রমে সে হয়ে যায় শিশু-পীর। তার পা ধোয়ানো পানি খেয়ে রোগ সেরে যাচ্ছে দুরারোগ্য রোগীর, এইরকম এক গুজব রটে যায় গ্রামে গ্রামে, ভাগ্য ফিরে যায় মিরাজের। সেখান থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয় গ্রাম্য-রাজনীতি। সেই রাজনীতির চাপে পড়ে জালালকে আবার ভেসে যেতে হয় হাঁড়িতে করে। 
শৈশবের এই অংশটুকুর নাম দি এরাইভাল। এভাবে এমনি করেই আরও দুটি পর্বে আমরা দেখি জালালের কৈশোর ও যুবক বয়সের গল্প। 

পুরো গল্প এখানে বলে দিতে চাইছি না আসলে, তারচেয়ে বরং সিনেমার অন্য কিছু দিক নিয়ে কথা বলি। 

পুরো সিনেমাটাই চমৎকার গতিময়। কোথাও এতটুকু থেমে যায়নি, প্রতি মুহুর্তেই অপেক্ষা করে ছিলাম পরমুহুর্তে কী হবে তা দেখার জন্যে। জালাল হিসেবে কিশোর ও তরুণ বয়েসী দুজনের অভিনয় খুবই ভাল ছিল। প্রয়োজনমত মজার কিছু সংলাপ দর্শকদের হাসিয়েছে নিয়মিতই। মিরাজের বউ যখন মিরাজকেই পানিপড়া খেতে বলে, সেই সংলাপ শুনতে শুনতে এটা যে ইমনেরই লেখা সংলাপ সেটা মিলিয়ে নিয়েছি মুহুর্তেই। অথবা যেখানে নিঃসন্তান তৌকির তার নবপরিণীতা স্ত্রীকে বলে, ‘কালো হয়ে যাবা তো’, বা সেই স্ত্রী যখন তার দেবরতুল্য তরুণটিকে দুধের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘তুমি খাইবা না?’ - পুরো সিনেমা হল জুড়েই দর্শকেরা হা হা শব্দ করে হেসে উঠেছিলো! 

পরের দু’পর্বে গল্প বদলে যায় যদিও। কখনো কখনো বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে, কখনো হাসির নির্ভারতা, কখনো গল্পের গতিপথ হঠাত বদলের চমক! 
মিউজিক খুবই ভাল লেগেছে পুরো ছবিতেই। চিরকুট খুব যত্ন নিয়ে করেছে মিউজিকের কাজ, বেশ বোঝা যায় সেটা। লোকেশান বাছাই অপূর্ব ছিল। বিশেষ করে নদী-পাড়ের কিছু দৃশ্য, সাথে মাছ ধরার জাল, এরকম অতুলনীয় কিছু ছবি এখনও মাথায় গেঁথে আছে। 

তৌকির, মৌসুমি, শর্মীমালা, মিতালি দাশ এরা প্রত্যেকেই অসাধারণ অভিনয় করেছেন। মোশাররফ করিম যদি তার নিজস্ব অভিনয়ধারা থেকে বেরিয়ে এসে গল্পের সাথে আরেকটু মিশে যেতে পারতেন, তবে আরও ভালো হতো। মিরাজের শ্যালকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যিনি, আমি সম্ভব হলে তাকেই পুরস্কৃত করতাম। এরকম দুলাভাই ভক্ত শ্যালক পাওয়া দুষ্কর। ছবিটি দেখতে দেখতেই মনে মনে ইমনকে বাহবা দিয়েছি এই চরিত্রটি নিয়ে আসার জন্যে। তেমনি করে বিভিন্ন রঙের হাঁস কিংবা ঘরভর্তি গাছপালা-র ডিটেইল পরিচালকের প্রতি মুগ্ধতা বাড়িয়েই দেয় কেবল। 

একটা চমৎকার গল্পের সাফল্য নির্ভর করে তার সমাপ্তির ওপরে। শুধু এইটুকু বলি, এর শেষটার জন্যেই জালালের গল্প-কে মনে থাকবে অনেক অনেক দিন। ব্রাভো ইমন! 

যতদূর শুনলাম, জালালের গল্প- ইতিমধ্যেই দিগ্বিজয়ী বীরের ভূমিকা নিয়ে ফেলেছে। ভারতের সপ্তম জয়পুর চলচ্চিত্র উৎসবে এটি আবু শাহেদ ইমন-কে এনে দিয়েছে সেরা নবাগত নির্মাতার পুরস্কার। পর্তুগালের আভাঙ্কা উৎসবে এটি একেবারে সেরা ছবি-র পুরস্কারই জিতে নেয়। ওর ছবি নিয়ে ইমন ইতিমধ্যেই জার্মানির পথে রয়েছে শুনলাম, সেখানকার বিভিন্ন উৎসবে ছবিটির প্রদর্শনী হবে। এবং সবচেয়ে দুর্দান্ত খবর হল, এবারের অস্কারেও বাংলাদেশ থেকে অংশ নিতে যাচ্ছে এই ‘জালালের গল্প’ই, এর চেয়ে দারুণ খবর আর কীইবা হতে পারে! 

চার বছর আগের লেখাটি শেষ করেছিলাম ইমনের জন্যে শুভকামনা দিয়ে, আজকে তার সাথে রইলো উঠে দাঁড়িয়ে ওর জন্যে একটা জোরসে করতালি! বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবু শাহেদ ইমনদের হাত ধরে আরও পরিণত হয়ে উঠুক, বিশ্ব-চলচ্চিত্রে মাথা উঁচু করে থাকুক, এটাই প্রত্যাশা আমাদের। 

তারেক নুরুল হাসান
মেলবোর্ন, ২০/১০/২০১৫