সোমবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০০৭

বেসিক্যালি ... ... সংগীত শিল্পী

বুড়ো হয়ে যাচ্ছি নাকি আমি?

আহেম, না, নতুন কোন কবিতার লাইন নয় এটা। এই কথা বলবার সময় আয়নায় তাকিয়ে নেই, তাই মাথার পাকা চুল দেখতে দেখতে এমনটা বলছি, তা-ও ঠিক নয়।
গত কদিন ইউটিউবে ঘুরতে ঘুরতে আমার মনে এই ভাবনার উদয় হলো, এই আধ-বুড়ো বয়েসেই আমি বোধহয় পুরোপুরি বুড়িয়ে যাচ্ছি।

ঘটনা কি?
তেমন কিছুই না। অরূপদার পোস্ট থেকে এই কাহিনীর সূত্রপাত। ওনার ঢাকার চিঠিতে খুঁজে পেলাম 'বেসিক্যালি নজরুল সংগীত শিল্পী' আনিলার কিছু গান। তো সেই গান শুনে কেমন লাগলো? হুমম, আনিলার গলা ভালোই, তবে ফুয়াদের কম্পোজিশান শুনে একেবারে বদহজম হবার জোগাড়।
তো এইসব গানই নাকি ইদানীং শুনছে সবাই।
কোনসব, তার একটা ধারণা নিতে ইউটিউবে ঘুরলাম দু'দিন। মাশাল্লাহ, আরও কিছু জিনিস পেয়ে গেলাম।
একজন হলেন মিলা। আনিলার তবু গানের গলাটা বেশ, কিন্তু মিলা যে ঠিক কি দিয়ে গান গায়, মানে, গলা দিয়ে যে নয় সেটা কনফার্ম, তবে গান আসে কেমনে, সেটাই বুঝছি না। তারউপর শুনলাম ইনিও নাকি সেই 'বেসিক্যালি নজরুল সংগীত শিল্পী।'
আহা, বেচারা নজরুল!

মিলার দুইখান ঝাকানাকা ভিডিও পেলাম ইউটিউবে।
১। বাবুরাম সাপুড়ে-


২। যাত্রাবালা-


---------
আইয়ুব বাচ্চুর 'কষ্ট' এলবাম বের হলো যখন, আমরা তখন কিশোর। দিন নেই রাত নেই পাগলের মত সেই গান শুনছি, মনে আছে। আমার বাবা বেশ কয়েকদিন আমার অত্যাচার সহ্য করলেন। তারপর একদিন বেশ খেপে টেপে গিয়ে বললেন, " এইগুলা কুনো গান হইলো? আরে ব্যাটা তুই কষ্ট পাছ পা, কিন্তু চিল্লা-পাল্লা কইরা এইসব জানাইতে হয়??"
আব্বার অনুভূতি শুনে বেশ 'কষ্ট' পেয়েছিলাম। এত ফাটাফাটি গানের মর্ম বুঝলো না! পরে অবশ্য নিজেকে স্বান্তনা দিয়েছিলাম, বুড়ো হয়ে গেলে বাবাদের এমনই হয়।

ভাবছি, মিলা-ফুয়াদের গান শুনে আমি যখন হাস-ফাঁস করছি, আমার ঘাড়ের পাশে কেউ বিড়বিড় করে বলছে কি না, "নাহ, কনফু ব্যাটা বুড়া হইয়া গ্যাছে! "

আর কেউ আছেন নাকি আমার মতন বুড়াদের দলে? কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান!

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০০৭

দুঃখিত, আমিও।



উপরের ছবিটা আজকের প্রথম আলো থেকে নেয়া। পাকিস্তানের ইসলামাবাদ প্রেসক্লাবের এক সমাবেশের পরে সেখানকার কিছু আইনজীবি ও সাংবাদিকদের দেখানো ব্যানার এটা।
এই ব্যানার দেখে মনের ভেতর অনেক কথা জমে উঠলো। খানিকটা ভালো লাগলো, একটা দেশের জনগণ আর সরকার সম্ভবত সবসময় এক অর্থ করে না, বুঝা গেলো সেটা। এরকমটা আগেও দেখেছি, সেই ৭১এ-ই। একদিকে পাকিস্তানের সহায়তা করেছিলো আমেরিকান সরকার, অন্যদিকে জর্জ হ্যারিসনদের মতন মানুষেরা বাংলাদেশের জন্যে অর্থ সংগ্রহ করছিলেন মরিয়া হয়ে।
পাকিস্তানের এই মানুষদের মনোভাবকে শ্রদ্ধা করি। আমাদেরকে সমবেদনা জানিয়েছেন তারা, ঠিক আছে।
কিন্তু আর কিছু না, মনের ভেতর কোন মুক্তিযোদ্ধা অথবা বীরাংগনার স্মৃতি না এনেই, আমাদের লক্ষ শহীদদের কথা একবারও মনে না করেই আমি শুধু ব্যানারের 'জেনোসাইড' শব্দটার দিকে তাকাচ্ছিলাম। বারবার। সত্যি, মনে হলো অদৃশ্য কোন লাল রঙে লেখা ঐ শব্দটার পাশে ঐ 'স্যরি' শব্দটাকে বড্ড বেশি হাল্কা মনে হচ্ছিলো, অনেকটা দায়সারা আর খেলো লাগছিলো! একটা জেনোসাইডের জন্যে শুধুই একটা স্যরি?

আমি জানি, তারা দুঃখ প্রকাশ না করলেই বা আমরা কি করতাম? কিচ্ছু করার ছিলো না। 'ক্ষমা চাইতেই হবে' এরকম চোখ রাঙানোর মতন মেরুদন্ড বাংলাদেশের এখনও নেই, ঠিক কবে যে সেরকম 'বড়' হয়ে উঠবো আমরা, জানি না।

দলছুট কিছু পাকিস্তানীকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু আমি আমার পূর্বপুরুষদের রক্তের গন্ধ শুঁকে বড় হয়েছি, আমাদের মায়েদের কান্নায় ভিজে ভিজে।
স্যরি, আপনাদের 'স্যরি'তে আমার মন ভরলো না।

সোমবার, ডিসেম্বর ১৭, ২০০৭

আর্থ আওয়ারঃ প্রিয় পৃথিবীর জন্যে একটি ঘন্টা


আর্থ আওয়ার-এর মূল ধারণাটা এরকমই। প্রিয় পৃথিবীর জন্যে একটা কিছু করা। আমাদের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই এমন কার্যকরী কোন পদক্ষেপ; যেটা আপাত দৃষ্টিতে খুব সামান্য হতে পারে, কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে এর অবদান হয়ে যাবে অনেক বড়।
পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হবে যে দেশগুলো, তাদের তালিকায় বাংলাদেশ যে অনেক উপরের দিকে, এটা আজকের নতুন কোন খবর নয়। কাগজ কলমের হিসাব অনুযায়ী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি আর এক মিটার বেড়ে যায়, তাহলে আমাদের ছোট্ট দেশটার পনের ভাগ এলাকাই ডুবে যাবে পানির নীচে। ঘরহারা হবে প্রায় ১৩ মিলিয়ন মানুষ। এই হিসাবের বাইরে এরকম দুর্যোগে আর কি কি হতে পারে, সিডরের পরের গত এক মাসে আমরা তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। মাঠের শস্য ভেসে যায় পানিতে,ক্রমশ বাড়তে থাকা মৃত মানুষের অংক আমাদের কাছে হয়ত কিছু সংখ্যা, কিন্তু অনেকের জন্যে তারাই তাদের আত্মীয়, আত্মার পরিজন।
তো, এই উষ্ণতা বাড়ার পেছনে কারা দায়ী? চোখবুজে আপনারা লাদেনকে দোষারোপ করতে পারেন, সাথে তার প্রিয় বন্ধু জর্জ ডব্লিউ বুশকেও। দুজনই পৃথিবী জুড়ে এত বেশি বিস্ফোরণ আর যুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছে, উষ্ণতা বাড়বার ক্ষেত্রে এই দুই মাথামোটার অবদানও কিন্তু কম নয়!
যাকগে, সিরিয়াস কথায় আসি। আমাদের সৌভাগ্য এই যে এই একটা ক্ষেত্রে আমরা নন্দ ঘোষ বলে বিবেচিত হই নি বাকি বিশ্বের কাছে। আমাদের গরিবী এখানে আমাদের দায় অল্প হলেও কমিয়েছে। কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়বার পেছনে সবচে বেশি কাজ করছে উন্নত বিশ্বের তাপ বা শক্তি উৎপাদনের উৎসগুলো। না, এই উৎসগুলো আলাদা কোন কাঠামো বা দালান কোঠা নয়, পুরো পরিবেশ, সমাজ বা দেশটাই এই উৎস হিসেবে কাজ করে। যেমন রাতের বেলা আলোর জন্যে জ্বালানো বাতি, অথবা গরমের দিনে চালানো এয়ার কুলার। সবসময় ব্যবহৃত হচ্ছে যেসব যন্ত্র সেগুলোও উষ্ণতার উৎস, যেমন রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটার, টিভি, এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় যে বাহন- গাড়ি!
এই সবগুলো জিনিসই মানুষের জীবনের সাথে এমন তীব্রভাবে জড়িয়ে গেছে যে এগুলো হুট করে পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু তাহলে গ্রীণ হাউজ এফেক্ট বন্ধের উপায় কি?
না, পুরোপুরি বন্ধের কোন কার্যকরী বা সুলভ উপায় পাওয়া যায় নি এখনো। তবে সেটা কমাবার কোন উপায় আছে কি না, এবং তাতে আমাদের মতন সাধারণ মানুষ কোনভাবে অংশগ্রহণ করতে পারতে কি না, এই চিন্তা থেকেই জন্ম নিয়েছে আর্থ আওয়ার-এর ধারণা।

শুরু করেছিলো সিডনীবাসীরা, আরেকটি সংগঠন WWF এর সাথে একাত্ম হয়ে। এ বছর, মানে ২০০৭ এর মার্চের শেষ দিনে সিডনী শহরের ২.২ মিলিয়ন মানুষ এবং প্রায় ২১০০ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাত সাড়ে সাতটা থেকে এক ঘন্টার জন্যে তাদের সমস্ত বাতি নিভিয়ে দিয়েছিলো। যারা ভাবছেন এতে আর এমন কি-ই বা হতে পারে, তাদের জন্যে তথ্যঃ ঐ এক ঘন্টা সময়ের ঐটুকু কাজের জন্যে সিডনির এনার্জি কনসাম্পশান তখন ১০.২% কমে গিয়েছিলো। এটা হচ্ছে প্রায় ৪৮,০০০ গাড়িকে রাস্তা থেকে এক ঘন্টার জন্যে সরিয়ে নেবার সমান! এই কাজে অংশগ্রহন করেছিলো সিডনীর প্রশাসনও, তাদের সহায়তায় আলো নিভিয়ে রেখেছিলো এমনকি হার্বার ব্রিজ এবং সিডনীর আরেক আইকন অপেরা হাউস।
সুন্দর একটা ভিডিও রয়েছে এ বিষয়ে, আর্থ আওয়ার-এর ওয়েব সাইটে।


এই বছর এই আর্থ আওয়ার ক্যাম্পেইনটি আরো বিস্তৃতি লাভ করেছে। বিশ্বের প্রায় ১২ টি বড় শহর ২০০৮ এর ২৯ মার্চ রাত আটটা থেকে এক ঘন্টার জন্যে তাদের সমস্ত বাতি নিভিয়ে দিবে। সিডনী, মেলবোর্ণ, ব্রিসবেন, শিকাগো, কোপেনহেগেন, টেল আভিভ, ম্যানিলা, টরোন্টো এবং আরো কিছু শহর রয়েছে এই তালিকায়।
বিশ্বের উষ্ণতা বাড়ার মোট পরিমাণের তুলনায় এই এক ঘন্টার উদ্যোগ হয়তো নিতান্তই ছোট, কিন্তু বিন্দু বিন্দু পানি জমেইতো মহাসাগর হয়।
আমাদের দেশ ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়, লোডশেডিং-এর কল্যাণে বেশিরভাগ সময়েই বাতি নিভিয়ে বসে থাকে। তবু যদি আলাদা করে বছরে একটি ঘন্টা প্রিয় পৃথিবীর জন্যে আর্থ আওয়ার কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে, তবে আসলেই খুব ভালো হয়।
আমরা নিজেরাও ব্যক্তি উদ্যোগে এই ক্যাম্পেইনটিকে সফল করতে পারি। তালিকার বাইরের যে বড় শহরগুলোয় আমাদের বসবাস, সেখানে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে পারি। আর্থ আওয়ার ওয়েবসাইটটি এ ব্যপারে সাহায্য করছে।
আমাদের প্রতিবেশী বা বন্ধুদেরও জানাতে পারি এ কার্যক্রম সম্পর্কে। নানারকম পরিকল্পনা করা যেতে পারে ঐ এক ঘন্টার জন্যে, হয়তো বন্ধুরা সবাই মিলে নিজেদের ঘরের বাতি নিভিয়ে চলে যাওয়া যেতে পারে কোন মুভি শো-তে। ঐ এক ঘন্টা বাতিহীন কাটানো কোন সমস্যাই নয় আসলে।
ঠিক করেছি, ২০০৮ এর ২৯ মার্চ, শনিবার রাতে এক ঘন্টার জন্যে বাতি নিভিয়ে আমি আর আমার বউ মোমের আলোয় একটা ক্যান্ডল-লাইট ডিনার সেরে ফেলবো!
আমাদের এই ছোট্ট নীল-সবুজ পৃথিবীর জন্যে আপনি কি করবেন, সেটা এক্ষুণি ঠিক করে ফেলুন!

বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০০৭

পরবাসে তাবলীগের বশে

ইউনিভার্সিটি হলগুলোয় পরিচিত এক দৃশ্য ছিলো, আমাদের স্বাভাবিক বহুল তরংগায়িত জীবনে আরেক তরংগ আর কি। সেটা হলো, দুপুরের খাবারের পরে হয়তো সবাই চুপচাপ, বেডে শুয়ে আরাম করছে, কোথাও কোন রুমে হয়তো চলছে আড্ডা, এরকম অবস্থায় হুট করেই পুরো ফ্লোরে ফিসফাস করে ছড়িয়ে পড়লো খবর, "ঐ আইছে, আইছে রে, ভাগ সবাই!"
ব্যস, সবাই শোয়া বসা ছেড়ে হুড়মুড় করে গায়ে শার্ট চাপিয়ে পড়িমড়ি করে দে ছূট।
তা কে সেই সুধীজন, যার আগমনে এই পলায়ন নাটিকা?
না,ক্যাডার বা ঐ গোত্রীয় কেউ নন, তারা হলেন তাবলীগী জামাতের মানুষ।
লাঞ্চের পরপরই মূলত তারা 'হামলা' চালাতেন। মুখে অমায়িক হাসি, কথার শুরুতেই হাত মিলানোর জন্যে হাত চেপে ধরেন, এবং অলৌকিক ভাবে সেই হাত ছাড়ার কথা পুরোপুরি ভুলে যান। একদম মাগরিবের নামাজের পরে আজকের জমায়াতে হাজির থাকবো- এইরকম একটা অদৃশ্য সনদে সম্মতিসূচক দস্তখত না করা পর্যন্ত মুক্তি মিলে না।
তাবলীগি জামাতের পেছনের মূল কাহিনিটা আমার জানা নেই। তবে ধারণা করতে পারি, বিপথে যাওয়া মুমিনদের যায়-যায়-ঈমানকে পাকাপোক্ত করতেই তারা নিজেদের নিয়োজিত করেছেন। আমার অবশ্য কোনই আপত্তি নেই তাতে। তবে বার তিনেক প্রায় একই ধরণের লম্বা লেকচারের মাঝে ঐ অমায়িক হাসিওয়ালা মানুষদের বিরক্ত করতে পারিনি বিধায় আমার টিউশানীর বাস ছুটে গেছিলো, তারপর থেকে আমিও সেই আতংকায়িত দলের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেলাম। সেই অমায়িক হাসি দেখলেই আমার পিলে চমকে যেত, রাত বিরেতে দুয়েকটা দুঃস্বপ্ন দেখে ফেলেছিলাম কি না মনে পড়ছে না, তবে রুমের দরজায় লাগানো হ্যাঙারে একটা তৈরি শার্ট সবসময়েই ঝুলতো। যেন তাহাদের আগমনী বার্তা কানে এলেই নাগাল সীমার বাইরে চলে যেতে পারি।
মনে আছে, বন্ধু রানা এইরকম ক্রিটিকাল সময়ে একবার শেষমুহুর্তে ওদের হাতে পাকড়াও হয়ে গিয়েছিলো। ওর উপস্থিত বুদ্ধি খুব ভাল, মুহুর্তেই মুখ করুণ করে বলেছিল, "আমি ভাই জগন্নাথ হলে থাকি,এমনিই এসেছিলাম এখানে!'
ব্যস, ইতিহাসে সম্ভবত ওর হাতই সবচে দ্রুত সেই নাগপাশ থেকে মুক্তি পেয়েছিলো!
--------------

ক'দিন আগে বিকেলে, কাজ নেই তাই বাসায় বসে আছি আরাম করে। দরজায় ঠকঠক। বউ উঠে গেলো দরজা খুলতে। গিয়েই সাথে সাথে ফিরে এলো। "তুই যা।" আমি চোখে মুখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ঝুলিয়ে গেলাম। গিয়ে দেখি মাথায় টুপি, লম্বা পাঞ্জাবী পরনে, শ্মশ্রুমন্ডিত দুইজন মানুষ। ঢাকা থেকে মেলবোর্ণ আসতে আসতে পরিবেশ আবহাওয়া আর মানুষের ধরণ ধারণ সবই বদলে গেছে, কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে সেই অমায়িক হাসি বদলায় নি। এতদিন বাদে সেই চিরচেনা হাসির ধরণ দেখেই চিনলাম, যদিও ঠিকঠাক বিশ্বাস হচ্ছিলো না আমার, এখানেও?!?
আমি তখন আমার সবচেয়ে প্রিয় পোশাক পরা, হাফপ্যান্ট আর টি-শার্ট। খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা আমার। দু'জনের মধ্যে একজনই কথা বললেন সব। কথা না বলে প্রশ্নবান চালালেন বলা চলে। বাংলায়। কি করি, পড়ি না পি আর, বাড়ি কই, কোথায় পড়েছি, স্কুল কলেজ, এখানে কোথায়, কি জব করি...। সর্বশেষ ভিসা ফরম বাদে নিজের সম্পর্কে এওসব ব্যাক্তিগত প্রশ্নের উত্তর আর কোথায় দিয়েছি আমার মনে পড়ে না!
ভদ্রলোক এখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। এটুকু শুনে বসতে বললাম ভেতরে। হাজার হোক, শিক্ষক মানুষ। আমাকে জানালেন তিনি বুয়েটে পড়েছেন, শিক্ষকতাও করেছেন সেখানে বেশ কয়েক বছর।
ঘরে ঢুকতেই টিভি-র সাথে লাগানো এক্সবক্স গেইম স্টেশান দেখে উনি বোধহয় আন্তরিক হতে চাইলেন একটু, জিজ্ঞেস করলেন, 'কার এটা, আপনার বাচ্চার?'
আমি বিষম খেলাম। ভূঁড়িটা বেড়েছে ইদানীং জানি, এবং খানিকটা গাট্টাগোট্টাও হয়ে গেছি, কিন্তু তাই বলে বাচ্চার বাপ!
হাসিমুখে জানালাম, না, ওটা আমারই। বাচ্চা কাচ্চা এখনো নেই।
তারপরে লম্বা আলাপ হলো। প্রায় বছর পাঁচেক আগে শোনা কথাগুলোর সাথে কোন তফাত নেই। পার্থক্য এই যে এইবারে টিউশানী ধরার তাড়া ছিলো না, তাই মুখে হাসি ধরে রেখে সব শুনলাম। তবে এখন আমিও অনেক বদলে গেছি, হাসিমুখে 'না' বলে দিতে পারি। স্পষ্ট করেই জানালাম যে আমি নিজের মত করেই ধর্মকর্ম করি, এবং এইরকম মজলিশে যাবার ব্যাপারে উৎসাহী নই।
আগের বারের গুলোর তুলনায় ইনি আসলেই নিতান্তই ভদ্রলোক। খানিক চেষ্টার পরে বুঝলেন, হবে না, তাই জোরও করলেন না আর। পাশের মানুষটা এতক্ষণ কোন কথা বলে নি, প্রতি কথায়ই শুধু হেসে হেসে মাথা নাড়ছিলো, তাই এতক্ষণ বুঝিই নি উনি বাংগালী নন। যাবার আগ মুহুর্তে ইংরেজীতে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আশপাশে পরিচিত কোন মুসলিম ব্রাদার আছে কি না?
তা আছেন বেশ ক'জন। তবে ঠিক কোনজনের বিকেলের আরাম মাটি করবো সেই সিদ্ধান্ত নিতে খানিকটা দেরি হলো, অবশেষে একজনের বাড়ির হদিশ দিয়ে বিদায় জানালাম।
বুঝতে পারছি না, এই অমায়িক হাসি কি এখন থেকে নিয়মিতই দেখতে হবে কি না!

শুক্রবার, নভেম্বর ৩০, ২০০৭

বেল পাকিলে কাকের কী?




দৃশ্যত কোন লাভ নেই, কিছু যায় ও আসে না, তবু বেল গাছে বাসা বেঁধেছি কদিনের জন্যে, তাই বেল পাকার খবর নিই আর কি!
ঘটনা হল এই, জন হাওয়ার্ড হেরে গেছে। লেবার পার্টির কেভিন রাড আজ থেকে অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী।

প্রায় মাস ছয়েকের বেশীদিন ধরে নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের সমাপ্তি ঘটলো আজ। আমি অবশ্য তেমন টের টুর পাই নি। আমাদের দেশের মতন নির্বাচনটা এখানে উৎসবে রূপান্তরিত হতে পারে নি। এ দেশের লোকজন নির্বাচন নিয়ে আদৌ কতটুকু সিরিয়াস, সেটা নিয়েও আমার কিঞ্চিত সন্দেহ আছে। আজ হাতে গুনে চারজন আমাকে এসে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, আশপাশে ভোট কোথায় নেয়া হচ্ছে বলতে পারো? আমার ভোটটা এখনো দেয়া হয় নি!

পত্রিকাগুলো অবশ্য আগেই ভবিষ্যৎবানী করেছিলো, কেভিন জিতে যাবে। নানা রকম জরিপ টরিপ করে তারপরেই এইসব আগাম ঘোষনা দেয়া হয়, তাই এসবের উপরে নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করা যায়। একেবারে শেষমুহুর্তে অবশ্য বেশ জমে উঠেছিলো। হাওয়ার্ডকে বুড়ো বলে বাতিলের চেষ্টা ছিলো শুরু থেকেই। লেবার পার্টি এই নিয়ে কম প্রচারণা চালায় নি। কেভিন সেদিক দিয়ে বেশ এগিয়ে ছিলো। অবশ্য অল্পকদিন আগে প্রচার পাওয়া একটা ভিডিও খানিকটা গোলমালে ফেলে দিয়েছিলো। বেশ আগের একটা ভিডিও ওটা, যেটার কোন এক অংশে দেখা যায়, প্রায় অস্পষ্ট কেভিন রাড বক্তৃতা শুনতে শুনতে আনমনে কানের ময়লা খুটে মুখে দিয়ে বসেছেন!

তো শেষমশষ হাওয়ার্ডের কপালে শিকে ছিড়লো না। আজকে রাতের খবরে শুনলাম, ভদ্রলোক নাকি নিজের আসনটিও হেরে বসেছেন প্রতিপক্ষের কাছে! এ কথা শুনেই আমার মুরালিধরণের কথা মনে পড়ে গেলো। ড্যারিল হার্পারের সাথে গলা মিলিয়ে স্টেডিয়ামের বাইরে থেকে মুরালিকে চাকার ডাকা লোকেদের মাঝে হাওয়ার্ডও ছিলো যে!

লোকজনের মাঝে এখনো মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখলাম। আধ-বুড়ো এক ভদ্রলোক বেশ বেজার মুখ করে আমাকে ইলেকশানের ফল জানালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তুমি খুশি নও? বললো, নাহ মাইট, একটা হ্যারি পটার আমাদের দেশটা চালাক, তুমি কি তাই চাও?
আমি একবার চোখ বুজে ভাবলাম, ঠিকই বলেছে, কেভিন রাডকে নিয়ে খানিকটা ক্যারিকেচার করলে পটারের মতই লাগবে বটে।
বুড়োর পাশেই দেখি এক ছিমছিমে রূপসী দাঁড়ানো, আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কি অবস্থা?
বুড়োর দিকে আড়চোখে একবার তাকিয়ে স্মিত হাসিতে জানালো, আমি খুব খুশি, তুমি?
আমি? আমি চিরকাল সুন্দরের পূজারী, তাঁকে দুঃখ দিই কেমনে? বেল আর কাকের প্রবাদ মুহুর্তেই ভুলে গিয়ে বললাম, ইয়াপ, আমিও খুশ!

মঙ্গলবার, নভেম্বর ২০, ২০০৭

প্রিয় সঞ্জীব চৌধুরী


তো যেরকমটা হয়, এভাবেই মৃত্যু এসে হাত ধরে ডেকে নিয়ে যায় জেলে নৌকার মাঝিদের।
আউলা চুলের কাঁধে গামছা মাঝি, চান্নি রাতে গলায় জোয়ার উঠে, আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিলো চাঁদ।
আমরা অন্ধ হই, নিঃস হই, বধির হই। আমাদেরই চোখের সামনে মৃত্যু এসে হাতছানি দেয়, মাঝি চলে যায়।
দোলে ভাটিয়ালি, এ নদী রূপালী, ঢেউয়ের তালে নৌকা বাজাও...
নদী দোলে, ঢেউ দোলে, ঢেউয়ের তালে আপনমনে দিগবিদিক নৌকা ভেসে যায়।
মাঝি নেই হায়, নৌকাও আর বাজে না।

সোমবার, নভেম্বর ১২, ২০০৭

না চাহিলে যারে পাওয়া যায়...

১।
আমায় এমন পাগল করে আকাশ থেকে মধ্য রাতে নামলে কেন,
নামলে যদি মধ্যরাতেই, চোখের দেখা না ফুরাতেই থামলে কেন?

মাঝরাতের ঝুম ঝুম বৃষ্টি নিয়ে দেখা যাচ্ছে বাংলা সাহিত্যের তিন দিকপালই নানা কিছু ভেবেছেন। এক হলেন আমাদের ট্যাগোর আংকেল, তিনি লিখে গেছেন, আমার নিশীথ রাতের বাদল ধারা, এসো হে গোপনে...। তারপরে আছেন ডাকাত-কবি, মানে নির্মলেন্দু গুণ, কি অসাধারণ সব পংক্তি, নামতে তোমায় কে বলেছে, মেঘে মেঘে মেঘ গলেছে, অন্ধকারে।
আর তৃতীয়জন হলাম এই আমি। এখনো কিছু লিখিনি অবশ্য, তবে ইদানিং রাত বিরেতের বৃষ্টিটাকে যে হারে মিস করা শুরু করেছি, খুব শীঘ্রই যে একটা কিছু লিখে ফেলবো, সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

২।
লাল কমলা আর গোলাপী, তিনটে রংকেই আমি লাল বলে চালিয়ে দিই। ফিরোজা, সবুজ, কলাপাতা অথবা লেবু- সবই আমার কাছে সবুজ। দুর্জনে আমাকে কালার-ব্লাইন্ড বললে দোষাই কেমনে?
আমি অবশ্য দাবি করি, কালার ব্লাইন্ড নয়, বড়জোর আমাকে কালার-ডাম্ব বলা যেতে পারে। রঙ টং যে চিনি না তাতো নয়। চিনি ঠিকঠাক, তবে বলবার কষ্টটুকু করতে ইচ্ছে করে না আর কি! সে জন্যে ব্লাইন্ড হতে রাজি নই, বড়জোর ডাম্ব হওয়া চলে!

৩।
ভেবে দেখলাম, এই পোড়ার দেশের লোকেরা একেবারে পাকাপাকি সিজন-ব্লাইন্ড!
খুব সুন্দর একটা আবহাওয়া এখন। খুব গরমও নয়, ঠান্ডাও নয়। আকাশটা ঠিক শরতের মতন ঝকঝকে থাকে সারাক্ষণ। মেলবোর্ণের ঠিক মাঝবরাবর 'ইয়ারা' নামে একটা ছোট্ট খাল বয়ে গেছে এধার ওধার। এটাকেই 'ও নদী রে...' বলে গলা কাঁপিয়ে ডাকাডাকি করে কতই না আদিখ্যেতা এদের। আমি দেখে ভাবি, ব্যাটা দেখে যা একবার আমাদের গোমতী, কিংবা ডাকাতিয়া নদীটারে, বুঝবি তবে নদীর মজা!
যেটা বলছিলাম, এই সুন্দর সময়টার জন্যে একটা সুন্দর ইংরেজি নামও আছে, অটাম। কিন্তু কই, এই নামে কেউ ডাকে নাতো এখানে! একদম গোয়ারের মতন ঘাড় বেঁকিয়ে শুধু দুটা জিনিসই জানে তারা, সামার আর উইন্টার। মাঝামাঝি আর কিছু না!
ছয়টি ঋতু ছয়টি পাখি হয়ে এই দেশে এসে শুধু দুইটি সুরেই ডাকাডাকি করে যেন। বাকি সুর সব ভুল হয়ে গেছে!

৪।
কার্জন হলে ক্লাশ শেষ করে যখন বের হতাম, ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের সিঁড়ি বেয়ে নামলেই একদম অট্টাশ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম। লাল লাল আগুনরঙা কৃষ্ণচূড়া দেখে লম্বা সময় নড়চড়ের কোন উপায় ছিল না একদম। চন্দ্রাহত অনেকেই হয় বলে শুনেছি, আমার ধারণা, খুঁজে দেখলে আমার মতন আরো দুয়েকজন কৃষ্ণচূড়াহতর খোঁজ পাওয়া মুশকিল হবে না।

৫।
গত কদিন ধরে ঐ ইয়ারা নদীর পাড়ে আমার আসা যাওয়া বেড়ে গেছে। শরতের আকাশ দেখে আশা জাগে মনে, দুয়েকটা কাশফুল কি চোখে পড়বে না? পড়ে না শেষমেষ।
কদিন আগে লংড্রাইভে ঘুরে আসা হলো অনেকদূর। চারপাশে গাছপালার জংগলের ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া, কিন্তু কোথাও শিমুল নেই, কৃষ্ণচূড়া নেই। তেপান্তরের সাইজের মাঠ একেকটা, কিন্তু তার কোনটাই ধানক্ষেত নয়, হলদে পাখির মতন সরিষা ক্ষেতও নয়।

রবীন্দ্রনাথ নেই, নির্মলেন্দু নেই, মাঝরাতের ক্ষণস্থায়ী বৃষ্টি নেই, নিশীথ রাতের বাদল ধারা নেই...। এত সব নেই-এর মাঝে আমি কি নিয়ে যে বেঁচে আছি, পান চিবুনো বুড়ো মানুষদের মতন বসে বসে আমি তা-ই এখন ভাবছি!

চুলোচুলি

প্রতিবার চুল কাটাতে গিয়ে যখন সেলুনের চেয়ারে বসি, হাসিমুখে প্রশ্ন শুনি, কিভাবে কাটাবেন? আমি তখন ভীষণ বিপদে পড়ে যাই।

আমি আলাভোলা মানুষ নই। যদিও রঙ চং পছন্দ করি না, শুধু খানিকটা পরিপাটী থাকি। তবে সেই পরিপাটীত্বের সিলেবাসে আমার চুল নেই। চুলের জন্যে এমনকি চিরুনিও একটা বিলাসিতা যেন আমার কাছে, গোসলের পরে দু হাতের দশটা আঙুল দিয়েই কাজ চলে যায়। আলাদা ভাবে কখনোই ভাবা হয় না তাই চুলের চেহারা বা নক্সা কেমন হবে। আর সে জন্যেই প্রতিবার চুল কাটাতে গেলে কিভাবে কাটাবো, এই বহু পুরাতন প্রশ্নে আমি বারবারই নতুন করে বিপদে পড়ি।

কপালের ওপরে চুলের শেষ সীমানায় আমার একটা লুকোনো ঘূর্ণি আছে। চুল ছোট রাখি বলে বুঝা যায় না। ব্যাপারটা জিনেটিক, সন্দেহ নাই, কারণ আমার বাবা আর ভাইয়ের মাথায় ঘূর্ণিগুলো স্পষ্ট। আমারো চুল খানিকটা বড় হলেই এই ঘূর্ণির কল্যাণে চুলে নানারকম ঢেউ খেলে যায়। এই ব্যাপারটা এড়ানোর জন্যে ছোটবেলা থেকেই সিঁথি করি ডানদিকে, ঐ ঘূর্ণির অনুকুলে। মাথায় চুল খানিকটা বড় হলেই আমার তাই অস্থির লাগা শুরু হয়। গত কদিন যেমন হচ্ছিল, ঘাড়ের কাছে আর কানের ওপরে চুলবুল করছিলো, বুঝছিলাম সময় ঘনিয়েছে। আরও নিশ্চিত হলাম যখন আমার সহকর্মী পাঞ্জাবী ছেলেটা অবলীলায় আমার আঁকাবাঁকা চুল দেখে ঘোষণা দিয়ে বসলো, তোমাকে একদম অমিতাভ-যুগের সিনেমাগুলোর ভিলেনের মত লাগছে!

আমি সেদিনই সেলুনে দৌড়ালাম। এবং গিয়ে সেই পরিচিত প্রশ্নের উত্তরে বললাম প্রায় দেড় যুগের অভ্যাসে তৈরি হওয়া উত্তর, পেছনে আর দু'পাশে অনেক ছোট, আর সামনে অল্প ছোট।
হু, এটাই আমার এক ও অদ্বিতীয় চুলের কাট।

আমার জন্যে অবশ্য এই অভ্যাসটা কখনোই কষ্টকর হয়ে ওঠে নি। বরং সেভেনে উঠে যখন হস্টেলে চলে গেলাম, সেখানে নিয়ম ছিলো, মাসে দু'বার মাথায় বাটি বসিয়ে চুল ছেটে ফেলা হবে। সত্যি সত্যিই বাটি বসানো হতো না অবশ্য। তবে কলেজ থেকে ঠিক করে দেয়া নাপিতদের হাতের দক্ষতা ছিলো ঈর্ষণীয়। বাটি না বসিয়েই তারা মাথার চারপাশে ঠিক সেরকম একটা ছাঁট করে দিতে পারতো।

জুনিয়র ক্লাশে থাকতে সেসব নিয়ে আমাদের আপত্তি ছিলো না, আপত্তির সুযোগও ছিলো না অবশ্য। তবে খানিকটা সিনিয়র হবার পরেই আমাদের মধ্যে চেষ্টা ছিলো, চুল কেমন করে খানিকটা বড় রাখা যায়। ছুটি শেষে কলেজে ফিরবার সময় কর্তৃপক্ষকে লুকিয়ে কিছু টাকা নেয়া হতো, তার একটা অংশ অবশ্যই বরাদ্দ থাকতো সেই নাপিতের জন্যে।
সরকারী কর্মচারীকে ঘুষ দেয়ার অভ্যাসটা অনেকে ছোটবেলায়ই রপ্ত করে ফেলেছিলাম আমরা!
মাঝে মাঝে টাকা পয়সার টানাটানি থাকলে শ্যাম্পুর বোতল অথবা আধ-ব্যবহৃত আফটার শেভ দিয়েও কাজ চলে যেত।

আরেকটু বড় ক্লাশে উঠার পরে আমরা আরো বেশি সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। আমাদের ক্লাশের দুজন কেমন করে যেন এক ছুটিতে বাসায় গিয়ে চুল কাটাবার ট্রেনিং নিয়ে এলো। ব্যস, তখন আর আমাদের পায় কে? লুকিয়ে চুরিয়ে একটা চুল কাটাবার মেশিনও চলে এলো। তারপর থেকে চুল কাটাবার সময় এলে আমরা নিজেরা আলাদা একটা রুমে ঐ দুই বন্ধুর হাতেই চুল কাটিয়ে ফেলতাম।

সবসময়েই যে পার পেয়ে যেতাম এমন নয়, তবে যে কবার যেতাম, সেটুকুই লাভ ছিলো!
ঐ ছয়বছরে আমাদের চুল কাটা নিয়ে হাজারখানেক আনন্দ বেদনার স্মৃতি, লিখতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে নির্ঘাৎ।

চুলের প্রতি অবহেলার অভ্যাসটা পাকাপোক্ত হয়ে উঠেছিলো সেই সময়েই। হোষ্টেলে যাবার সময় আর সব জিনিসের সাথে একটা চিরুনীও কিনতে হয়েছিলো মনে আছে, কিন্তু ছ'বছর শেষ করে যখন চলে আসি ওখান থেকে, তখনও সেই চিরুনী ছিলো নতুনের মতই ঝকঝকে!

চুল নিয়ে সর্বশেষ কান্ড ঘটলো বছরখানেক আগে।
এক সপ্তাহ পরেই আমার বিয়ে। হবু বউ চুল নিয়ে আমার উদাসীনতা বিষয়ে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। তাই বিবাহ-পূর্ব চুল কাটানোর যখন প্রয়োজন দেখা দিলো, আমি পাড়ার মোড়ের কোন সেলুনটা সবচেয়ে দ্রুত এই ঝামেলা শেষ করে সেই খোঁজ নেয়া শুরু করলাম, কিন্তু আমার হবু বউ জানালো, অসম্ভব, এবারের চুল কাটাতে হবে হাবিব পারসোনায়, এবং তার অত্বাবধায়নে থাকবেন কর্ত্রী স্বয়ং!
মূর্খ আমি, হাবিব শুনেই বুঝি এক হাবিবুল বাশার। সে বেচারার চুল কি রকম থাকে মনে করতে পারলাম না, তার নাম দিয়ে বানানো সেলুন কেমন হবে? কিন্তু এ কথা আর বাড়ানো গেল না, তার আগেই বউয়ের ঝাড়ির সহযোগে আমি জেনে গেলাম, এই হাবিব হাবিবুল নয়, আরো হাবিব আছে।
তো গেলাম চুল কাটাতে। ওদের ঝকমকি চেহারা দেখেই বুঝে গেছি, লম্বা সময় আমাকে নাপিতের ছুরির নিচে মাথা পেতে রাখতে হবে। দীর্ঘশ্বাস গোপন রেখে অবশেষে বসলাম চেয়ারে। আর তারপরে শুনলাম সেই অমোঘ প্রশ্ন, কিভাবে কাটাবেন?
আমি আমতা আমতা করে কিছু বলবার আগেই দেখি আমার বউ এসে হাজির। উনি আধা-গম্ভীর আধা-হাসি মুখে যেই নির্দেশনা দিলেন, তাতে আমার আক্কেলগুড়ুম! কোথায় কিভাবে কেমন কাট হবে, তার উপসংহার টানা হলো এভাবে, ' মানে, স্বদেশ সিনেমায় শাহরুখ খানের যেমন কাট ছিলো, সেরকম আর কি!'

আমি লজ্জায় চেয়ারের সাথে মিশে গেলাম প্রায়। কিন্তু আমার বউ দেখি একেবারে নির্লিপ্ত, এমনকি ওই নাপিত সাহেবও। বুঝলাম, এইরকম উচ্চাভিলাসী নির্দেশ তারা গরবিনী হবু-বউদের কাছ থেকে নিয়মিতই পান।
চুল কাটা শুরু হলো। এত ধীর তার গতি আর এত মোলায়েম স্পর্শ যে অচিরেই আমি ঝিমুনিতে আক্রান্ত হলাম। লম্বা সময় বাদে যখন একটা প্রায় সফল ঘুম শেষ করে এনেছি, তখন জানলাম আমার চুল কাটাও শেষ। নাপিত আর হবু বউয়ের মুখের বিস্তৃত হাসি দেখেই বুঝলাম ব্যাপারটা তাদের একদম মন মত হয়েছে। তাই হোক, আমার এত মাথাব্যাথা নেই, শেষ হলেই আমি খুশি।
আয়নার দিকে আমার কেমন জানি একটু সন্দেহ হলো। না, ঠিকই আছে, পুরোনো সিনেমার ভিলেন থেকে আমি রাতারাতি শাহরুখ খান হয়ে যাই নি, তবে কোথাও কি যেন গোলমাল আছে। ঠিক ধরতে পারছি না।
ভালো করে তাকাতেই হঠাৎ টের পেলাম, কি সাঙ্ঘাতিক, ব্যাটা আমার সিঁথি বদলে দিয়েছে!! ডানের বদলে বাম দিকে জ্বলজ্বল করছে সিঁথি!
আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। এটা কোন কথা? আরে একবার আমাকে জিজ্ঞেসতো করবি?
আমি কড়া গলায় জানালাম, কেন এরকম হলো? নাপিত সাহেব মিনমিন করে কি যেন বললেন, আমার কানে গেলো না। আমি রাগে ফুঁসছি। বউ অবশ্য খুশি, চুলের নকশা তার পছন্দ হয়েছে, সে-ই আমাকে টেনে নিয়ে এলো।

লিফটে করে নীচে নামা পর্যন্ত দাঁত মুখ খিচে অপেক্ষা করলাম। সিএনজি ট্যাক্সি ডাকতে ডাকতে যেটুকু সময় লাগে, ওটায় চড়ে বসে আর দেরি করলাম না। 'ধ্যুত্তোর নিকুচি করি' - এই বলে দুহাতের আঙুল ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে চালিয়ে প্রায় ঘন্টাখানেকের শিল্পের বারোটা বাজিয়ে দিলাম। দশ সেকেন্ডের চেষ্টায়ই আমার চির অনুগত চুল কথা শুনলো, সিঁথি ডানদিকে চলে এলো নিমেষেই!
পাশে বসা আমার হবু বউ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে, তার চোখে কিং খানকে হারানোর বেদনা!
'আমি নিজেও খুব দুঃখিত'- মুখে এরকম একটা ভাব এনে তাকে বোঝাতে বোঝাতে চললাম। আর খানিক বাদে বাদেই আড়চোখে ট্যাক্সির রিয়ার ভিউ মিররের দিকে তাকিয়ে সেই চিরচেনা ডান দিকে সিঁথিওয়ালা আমাকে দেখতে পেয়ে মনে মনে বলছিলাম, আহ, কি শান্তি!

মঙ্গলবার, নভেম্বর ০৬, ২০০৭

এখানে একা নাকি?



একলা নারীরা পৃথিবীর কোথাও নিরাপদ নয়।
হোক সেটা ঢাকা, কি মেলবোর্ণ।

অথবা হোক সেটা সত্যিকারের রমণী, অথবা তার ছবি, এমনকি কাঠের বুকে খোদাই করা কোন নারী-মূর্তি!

এবারের ঈদের দিন তোলা ছবি। মূল শহর থেকে অনেক দূরের একটা বন আর গাছ-গাছালি ঘেরা পিকনিক স্পটে ঘুরতে গিয়েছিলাম।
সেখানের নির্জন একটা জায়গায় এই টয়লেট সাইন খুঁজে পেলাম। পাশের পুরুষ মূর্তির তীব্র চাহনিকে উপেক্ষা করেই বেচারীর ওপর অত্যাচার চালানো হয়েছে।

আমি অবশ্য অবাক হয়েছি পুরুষ মুর্তিটির গায়ে একটাও আচড়ের দাগ না দেখে! ব্যাটা নির্ঘাৎ কাপুরুষ, সঙ্গিনীকে একবারও নিশ্চয় বাঁচাতে যায় নি!
সেলুকাস!

রবিবার, নভেম্বর ০৪, ২০০৭

খাবি দাবি কলকলাবি

পেট দেখে ইদানীং আমাকে পেটুক বলে চেনা গেলেও, ছেলেবেলায় কিন্তু আমি এরকম ছিলাম না। এরকম, মানে যে পেটুক ছিলাম না, ব্যাপারটা তা নয়। সেটা ছিলাম ঠিকই, তবে পেটের আকৃতি তখনো দ্রষ্টব্য কিছু হয়ে ওঠে নি আমার।

বাসায় আমার যন্ত্রণায় বিস্কুট চানাচুর ঠিক জায়গায় রাখবার উপায় ছিলো না। নানা জায়গায় লুকিয়ে রাখতে হতো। তবে কিছুতেই আমাকে দমিয়ে রাখা যেত না। আমি খুঁজে টুজে বের করে, তাদের সবচেয়ে সঠিক জায়গায়, মানে আমার পেটের ভেতরে নির্দ্বিধায় চালান করে দিতাম। মাঝে মাঝে দু'এক পদের বিস্কুট যদিওবা লুকিয়ে রাখতে পারতো, কিন্তু আমিও তক্কে তক্কে থাকতাম। মেহমান বাসায় এলেই আমি খুশিতে বাগডুম। এ বারতো লুকোনো বিস্কুট বের করতে হবেই! এবং তাই হতো। মেহমানদের দেবার জন্যে লুকোনো ভান্ডার থেকে বের করা হতো সেসব। আর আমি শুধু ঘড়ি দেখতাম কখন তারা বিদায় নেবে। এবং যখন সত্যিই ওরা চলে যেত, বিস্কুট চানাচুর আবারো লুকোবার আগেই আক্ষরিক অর্থেই ঝাপিয়ে পড়তাম সেসবের উপরে।

এই খাদ্যপ্রীতি যে কেবল নিজের বাসায় বলবৎ ছিলো তা নয়। পরিচিত আত্মীয়দের বাসায় যাবার ব্যাপারেও আমি বাছ-বিচার চালাতাম। কোন বাসায় গেলে কোন মানের বিস্কুট খেতে দিবে, মনে মনে সে বিষয়ে আমার জরিপ চালানো হয়ে গিয়েছিলো বহু আগেই। তাই বেড়াতে যাওয়ার কথা শুনলে আমি আগে সেটা মিলিয়ে নিতাম, পূর্ব ইতিহাস সন্তোষজনক হলেই কেবল 'যাবো' বলে মত দিতাম। নইলে, আমাকে ধরে বেঁধেও কেউ ওখানে নিয়ে যেতে পারতো না!

সেই সময় সুপার বিস্কুট নামের একপ্রকার বিস্কুটের খুব প্রচলন ছিলো। আকারে ছোট, গোল গোল, স্বাদে মাঝামাঝি, সর্বোপরি দাম কম এবং প্লেটে রাখলে একসাথে 'অনেক' বিস্কুটের একটা দৃষ্টিঘটিত আবেদন ছিল তার, কিন্তু আমার খেতে একদমই ভাল লাগতো না।
তো ঘটনা হচ্ছে, আমাদের আত্মীয় পরিধির একটা বাসায় এই বিস্কুটের খুব চল ছিলো। ছোট ছিলাম বিধায় নানুর সাথে তাঁর আঙুল ধরে আমাকে আত্মীয়দের বাসায় বিচরণ করতে হতো। নানা স্বাদের নানা বিস্কুটের অমোঘ আকর্ষণে আমার সেসব বাসায় যেতে খারাপ লাগতো না অবশ্যই। কিন্তু সেই সুপার বিস্কুট-অলা বাসার প্রতি আমার খানিকটা বিরাগ ছিলো। একদিন বা দুদিন নয়, এরকম বেশ কয়েকদিন হলো যে ওখানে গেলাম আর আমাকে খেতে দেয়া হলো সুপার বিস্কুট। আমি সেগুলোর ওপরে বিষদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বসে থাকি। সেই আত্মীয়দের নিদারুন নির্মমতায় আমি অবাক আর পীড়িত হই, খানিকটা ভাল মানের বিস্কিটও এরা আনতে পারে না!

তেমনি একদিন, সেই সুপার বিস্কুট-অলা বাসায় অনেকক্ষণ কাটিয়ে দেবার পর, আমার মন ততক্ষণে তিতিবিরক্ত। বেশ কয়েকবার নানুর হাত ধরে ঝাঁকুনি দেয়ার পরে বিদায় নিবো যখন, তখন সে বাড়ির লোকজন বিদায় সম্ভাষন জানালো আমাদের। পিচ্চি ছিলাম বিধায়, কেউ একজন আমার থুতনিতে আদর করে বললো, আবার এসো আমাদের বাসায়।
এই কথা শুনে আমার মনের ভেতর জমা অভিমান খানিকটা উস্কে উঠলো। আমি কি ভেবে সরোষে বলে উঠলাম, নাহ, আপনাদের বাসায় আর আসবো না।
নানু অবাক। এবং ওই বাসার বাকি সবাইও। জিজ্ঞেস করলো, কেন কেন?
আমি তৎক্ষনাৎ বোম ফাটালাম, কেন আসবো? এলেই খালি সুপার বিস্কুট খেতে দ্যান! ভাল বিস্কুট দিতে পারেন না?

পরবর্তী সময়ে কি হয়েছিল জানি না। অপ্রস্তুত ভঙিতে খানিকটা হাসাহাসির কথা মনে পড়ে। কিন্তু আমার সেই অগ্নুৎপাত সেই বাড়ির বহুদিনের সুপার বিস্কুটীয় ঐতিহ্য ভাঙতে পেরেছিলো কিনা এতদিন পরে আজ আর সে কথা মনে নেই।

অবশেষে...

তাই হচ্ছে। একদম পার পেয়ে যাচ্ছে না বোধহয় ব্যাটারা।
মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডাররা একসাথে হয়েছেন। দেশের সবচেয়ে জরুরি মুহুর্তে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এখন আবার সেই সময় এসেছে।
ডিসেম্বরের ৩ তারিখে মিটিং ডাকা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
সব মিলিয়ে দীর্ঘ প্রস্তুতির ব্যাপার।
সবকিছু ভালোয় ভালোয় হলেই হলো।

সোমবার, অক্টোবর ২৯, ২০০৭

নাটকঃ মরটিন, মশা অথবা হাত

দৃশ্য-১
পর্দা উঠবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মশার পিন পিন শব্দ।
মঞ্চের মাঝখানে একটা বিছানা, তাতে গোলাপী রঙের মশারী টানানো।
পাশেই চেয়ার, সেখানে রমিজ আলী বসে থাকবেন। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জী, চোখে চশমা। ভুরু কুচকে পত্রিকা পড়বেন।
ডানপাশের কোনা থেকে একটা ফুটলাইট জ্বলবে। আলো পড়বে রমিজ আলীর গায়ের উপরে। পেছনের দেয়ালে তার ছায়া দেখা যাবে।

দৃশ্য-২
আলো বদল। এবার মাঝের ফুটলাইট জ্বলে উঠবে। আগের বাতি নিভবে না।
রমিজ আলী পত্রিকা পড়তে পড়তে মাথা দোলাবেন। এপাশ ওপাশ। হতাশা সূচক। পত্রিকার এ পাশটায় নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের ছবি দেখা যাবে। দুজন টুপিওয়ালা থাকবে সে ছবিতে, একজনের লালচে দাঁড়ি। ব্যাকগ্রাউন্ডে মশার পিন পিন অব্যাহত।

দৃশ্য-৩
মাথার ওপরের বাতি জ্বলে উঠবে। আলো রমিজ আলীর ওপর।
রমিজ আলী উঠে দাঁড়াবেন। পত্রিকা চেয়ারে রেখে দু'হাত প্রসারিত করে হাই তুলবেন। তারপরে মশারির ভেতরে ঢুকে যাবেন।

দৃশ্য-৪
মশারির পাশের ফুটলাইট জ্বলে উঠবে। মশার পিন পিন আওয়াজ একটু বেড়ে যাবে।
রমিজ আলী দু হাতের চাপড়ে দু একটা মশা মারার চেষ্টা করবেন। তারপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বেন বিছানায়।
আলো কমে আসবে।
খানিকপর রমিজ আলীর ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাবে। মশার শব্দ নেই।
এক মিনিট পনের সেকেন্ড এভাবে কেটে যাবে।

দৃশ্য-৫
আলো খানিকটা বাড়বে। মশার শব্দ শোনা যাবে ব্যাকগ্রাউন্ডে। তীব্র হয়ে উঠবে ক্রমশ।
রমিজ আলী দু'বার এ'পাশ ওপাশ করবেন। অস্থিরতা প্রকাশ পাবে।
মশার শব্দ আরেকটু তীব্র হয়ে উঠবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদুস্বরে বাজবে সাঈদীর ওয়াজ।
রমিজ আলীর অস্থিরতা বাড়বে।
নাক দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করবেন একটা।
মশার আওয়াজ বেড়ে যাবে আরো।
রমিজ আলী ঠাস করে নিজের পশ্চাদ্দেশে খুব জোরে একটা চাপড় দিবেন।
রমিজ আলীঃ শালা মুজাহিদ!

সাঈদীর ওয়াজ থেমে যাবে। আলো কমতে থাকবে। মশার শব্দ থেমে যাবে। রমিজ আলীর ভারি নিঃশ্বাস শোনা যাবে।
আলো নিভে যাবে। পর্দা পড়ে যাবে।

আমি গাইবো বিজয়েরই গান...

মানুষের মানসিক গঠনটাই আসলে এরকম, বিশেষ করে অপরাধী মন যাদের। নিজের অপরাধ ঢাকবার জন্যে আপন মনেই নিজেকে প্রবোধ দেয়, নিজের কৃতকর্মকে অস্বীকার করে। একটা পর্যায়ে এসে ঐ প্রবোধটাই বিশ্বাস বনে যায় আপনাতেই।
জামাতে ইসলামী নামে ঘৃণ্যতম রাজনৈতিক দলটির কুখ্যাত নেতা, একাত্তরের স্বীকৃত রাজাকার আলী আহসান মুজাহিদ ঠিক এরকম কোন বিশ্বাস থেকেই মন্তব্য করেছিলো, ' বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই।'
কতখানি ঔদ্ধত্য পেয়ে বসলে মানুষ এরকম বলতে পারে এটুকু কল্পনার কোন অবকাশ আর নেই এখন। ঠিক যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার জন্মকে, আমার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মতন তীব্রতর জ্বালা ধরানো কোন অনুভূতির জন্ম হয় মনে এই কথা শুনে।
জামাতী নেতা ও তাদের সমর্থকদের নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টার কোন কমতি ছিলো না এতদিন। কিন্তু এরকম করে পুরো ইতিহাসকে অস্বীকার করার মতন স্পর্ধা এর আগে দেখা যায় নি।
মুজাহিদের বক্তব্য নিয়ে পুরো দেশে যখন আলোড়ন হচ্ছে, তখন পর্দায় হাজির হলেন আরেক গোপাল ভাঁড়, জনান শাহ আব্দুল হান্নান। ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত, কিন্তু জামাতে ইসলামীর অনুগত পরামর্শক হিসেবে নিজের জায়গা করেছেন অনেক আগেই।
একুশে টিভির এক টক শোতে তিনি আমাদের সামনে নতুন অনেক তত্ব ও তথ্য হাজির করলেন। তারমধ্যে অন্যতম হলো, মুক্তিযুদ্ধ আসলে ছিলো একটা সিভিল ওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের নিহত শহীদের সংখ্যা তিরিশ লক্ষ কিনা সেটা উনি 'জানেন না', তবে হামিদুর কমিশনের ছাব্বিশ হাজারের তত্বকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেন না!!
ভেবে পাই না, বাংলাদেশ সংবিধানের মূলস্তম্ভ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, সেটাকে অস্বীকার করে এই লোকটা কেমন করে বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয়ের মতন এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো এতগুলো বছর?

আরিফুর রহমানের নির্দোষ কৌতুকের মধ্যে মহানবীর অবমাননার গন্ধ খুঁজে পেয়ে কিন্তু উম্মত্ত মোল্লা জুম্মার নামাজের পরে কয়েক কপি প্রথম আলো পুড়িয়ে সারা দেশে জিহাদ ঘটিয়ে দিলো। কিন্তু আলী আহসান মুজাহিদ আর শাহ আব্দুল হান্নানের এমন সব মন্তব্যের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। জনগণের কাছ থেকেও না, সরকারের কাছ থেকেও না।
এই নির্লিপ্ততা বড় কষ্টকর। বড় হতাশার।

শুক্রবার, অক্টোবর ২৬, ২০০৭

বাতের ব্যথা

কোন একটা অসুখকে আগে বড়লোকদের অসুখ বলে জানতাম, কী যে সেটা, ভুলে গেছি। যেমন জানতাম 'বাতের ব্যথা' হলো খাস গরিবী অসুখ।
অসুখের খোঁজ খবর নিচ্ছি, তার একটা অগভীর কারণ আছে। ইদানীং কিছুই লেখা হচ্ছে না। দু'তিনটে গল্প সিনেমার মত করে অনবরত মাথার ভেতর পুনঃপ্রচারিত হয়ে চলছে। বিচ্ছিন্ন কিছু কিছু কবিতার লাইন মাথার ভেতর কাঠঠোকরার মতন ঠোকর মেরে মেরে যায়। মুশকিল হলো, এগুলোকে খাতার ভেতরে স্থায়ীভাবে বেঁধে ফেলাটাই হচ্ছে না।
এইরকম একটা অবস্থাকে বড়লোক লেখকেরা বলেন 'রাইটারস ব্লক'। কিন্তু এই শব্দ আমার বেলায় খাটবে না, আমি তো আর বড়লোক লেখক নই। আমি হলাম হত-দরিদ্র কলমবাজ। এখন তাই আমাকে কলম্বাসের মতই রাইটার্স ব্লকের সমার্থক বাতের ব্যথা জাতীয় নতুন কোন গরিবী শব্দ আবিষ্কার করতে হবে।
কি মুশকিল!

শুক্রবার, অক্টোবর ১৯, ২০০৭

প্রিয় সেগুন বাগান

খুব সিরিয়াসলি সত্যজিৎ রায় হতে চাইবার আগে আমি তারচেয়ে সিরিয়াসলি হতে চেয়েছি ম্যাকগাইভার কিংবা মিঠুন চক্রবর্তী। এই দুইয়ের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বন্ধুদের নিয়ে গোয়েন্দা দল বানিয়ে আমি প্রায় হয়েই গিয়েছিলাম কিশোর পাশা। গোয়েন্দা রাজু খুব বেশিদিন আমার সহচর ছিলো না। কাকাবাবু বা ফেলুদা পড়েছি, তবে হতে চাই নি কোনদিন। এখন এই আধাযুবক বয়সেও ছেলেবেলার যে হিরোর আবেদন একটুও কমেনি আমার কাছে, সেই দুর্দান্ত ছোকরার নাম 'মাসুদ রানা'। হু, ইনি তিনিই, যে 'টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।'
এইরকম স্বার্থপর একটা বর্ণনাই বোধকরি আমাদের মাসুদ রানার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলো। আরো অনেক কারণও ছিলো। সদ্য কিশোর তখন আমরা, এরকম একটা সময়ে প্রতিবার বিপদে পড়া বাংলাদেশকে বাঁচাতে, অথবা কোন বন্ধুরাষ্ট্রকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে যখন কাঁচা পাকা ভুরুর মেজর জেনারেল রাহাত খান অফিসে ডেকে পাঠাতেন মাসুদ রানা-কে, আমরা সেই সময় আরো একটি চমৎকার স্পাই থ্রিলারের আশায় বসের সামনে বসা মাসুদ রানার কানের পাশে সমানে ফিসফিস করে বলে যেতাম, 'রাজি হয়ে যা ব্যাটা, রাজি হয়ে যা।'
সোহানা চৌধুরির আদুরে ভালোবাসার লোভ ছিলো হামেশাই। সেই সাথে প্রতি পর্বে নতুন কোন স্বর্ণকেশিনীর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াটাতো অনিবার্য। এইরকম গল্প গুলোই তখন আমাদের কাছে সোনামাখা স্বপ্ন হয়ে দেখা দিতো।

এইবার দেশে গিয়ে নিজেকে সাংসারিক সকল বাঁধনে জড়ানোর ব্যবস্থা করার ফাঁকে ফাঁকেও বেশ মনে হচ্ছিলো এই 'কোনদিন বাঁধনে না জড়ানো' যুবকের কথা। আমার ফেলে আসা পুরনো বইগুলোর ভীড় থেকে টেনে বের করি মাসুদ রানা সিরিজের আমার খুব পছন্দের একটি বই 'মুক্ত বিহংগ'। এই গল্পের আর দুটি প্রধান চরিত্রও আমার ভীষন পছন্দের ছিলো, মাইকেল সেভারস আর এনি উইসপার।

ঠাকুমার ঝুলি দিয়ে হাতে খড়ি হবার পর, আমার পুরো ছেলেবেলাটাই কেটেছে সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে।
অনেকেরই দেখি সেবা প্রকাশনীর বইগুলো নিয়ে নাক উঁচু একটা ভাব রয়েছে। খুব প্রিয় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও একবার এরকম কিছু বলেছিলেন, সেবা প্রকাশনীর সস্তা বইগুলো পড়ে নাকি আমাদের ছেলেমেয়েরা গোল্লায় যাচ্ছে। এটা পড়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি নিজের ও আমার বন্ধুদের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সেবা প্রকাশনীর ঐ সস্তা ও অগভীর থ্রিলার বইগুলোই আমাদের দেশের কিশোরদের বই-পড়ুয়া হিসেবে বড় হতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। একেকটা স্বপ্নের রাজ্যের দরোজা খুলে দিত সেইসব অবাস্তব ফিকশানগুলোই। আমি নিজের কথা বলতে পারি, ঐ বয়সে সেবা'র বই না হলে পড়বার অভ্যাসটাই হয়তো ঠিকমতন গড়ে উঠতো না। আর সেটা না হলে বিশ্বসাহিত্যের অন্য সব বইগুলোও আমার ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যেত নিশ্চিত। তাই সুরুচির পতাকাধারীদের ভুরু বেঁকে গেলে যাক, আমার রুচির ফিল্টারে বিশাল বিশাল ফাঁক। তা দিয়ে পটেমকিন জাহাজ যেমন করে বেরিয়ে যায়, তেমনি যায় ক্যাসিনো রয়্যালও। আবার সে ভাবেই গোর্কী আর কাজীদা সেখানে পাশাপাশি চলেন।

রকিব হাসান নিজেই তখন আবু সাঈদ নামে লিখতেন গোয়েন্দা রাজু। জাফর চৌধুরিও কি ওনারই ছদ্মনাম ছিলো? মনে নেই সেটা, তবে রেজা-সুজার সেই রোমহর্ষক সিরিজও পড়তাম ভালই। কুয়াশা সিরিজ মোটামুটি লাগতো, আর তিন গোয়েন্দা ছিলো অসাধারণ। তারপর বয়সের দাবী অনুযায়ীই হাতে চলে এল গরমাগরম মাসুদ রানা। শেখ আব্দুল হাকিম আর খন্দকার মাজহারুল করিমের রোমান্টিক বইগুলোও লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। কিশোর ও রহস্যপত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম অনেকদিন।

ক্লাশের তাড়াহুড়া না থাকলে দুপুরের দিকে ঘুম ভাঙ্গে আমার। আজ কেমন করে জানি খানিকটা ব্যতিক্রম হলো, কাক নেই, তাই তার ডাকও শোনা যায় না এখানে, তবে আমার জন্যে সেটা কাক-ডাকা ভোরই আসলে। কি ভেবে আধ-পড়া ইলিয়াস আর মানিক বন্দ্যো-র মাঝখান থেকে টেনে নিলাম মুক্ত বিহংগটাকেই। বহুদিন পরে আবার একটা সকাল বেশ ঝলমলে হয়ে গেল। ছাপোষা জীবনে অভ্যস্ত আমার হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো আফ্রিকার গহীন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চারটে ট্যাংকের বিশাল বহরকে চালিয়ে নিয়ে যেতে।
এই কৈশোরিক আনন্দে ভরা চপল সুন্দর সকালটুকুর জন্যে তাই কৃতজ্ঞতা জানাই কাজী আনোয়ার হোসেন ও তার সেগুন বাগান প্রকাশনীকে। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের কাজীদা, এক স্বপ্নবাজ কিশোরের ছেলেবেলাকে বাঁধনে জড়িয়ে নেবার জন্যে।

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০০৭

ডাম্পিং: যদি সুখী হতে চান-

ডাম্প অথবা ডাম্পিং শব্দটা আগেও জানা ছিল বটে, তবে ঠিকঠাক চেনা ছিলো না।
পুরোনো কাপড় চোপড় জমে গেলে বাসা থেকে খানিকদুরে সরকারের বেঁধে দেয়া জায়গায় গিয়ে ফেলে দিয়ে আসি। এই দেশে ইহাকেই ডাম্পিং বলে। তালিকায় আরো থাকে পুরোনো টেলিভিশান, ফ্রীজ, মাইক্রোওয়েভ, বাইসাইকেল থেকে শুরু করে আরো নানান হাবিজাবি। মোটের ওপর, যে কোন অবাঞ্চিত যন্ত্রণা থেকে সহজেই মুক্তি দেয় এই ডাম্পিং।

এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন দেখে অনেকটা চমকে উঠেছিলাম অল্প কিছুদিন আগে। ঘটনা বেশ গুরুতর।
মা দিবসের ভোরবেলায় মেলবোর্ণ হাসপাতালের বাইরে কোন এক মা তার সদ্যোজাত শিশুকে বাক্সের ভেতরে কাপড়ে মুড়ে ফেলে রেখে চলে যান। বাংলাদেশের সুনাগরিক হিসেবে এই সব সহজলভ্য খবরে চমকানোটা আমাদের জন্যে রীতিমতন লজ্জার বিষয়। তবু যে চমকালাম, তার কারণ পত্রিকার ভাষা। সরল ইংরেজীতে তারা হেডলাইন করেছে, " বেবী ডাম্পড অন মাদার্স ডে"
ও হরি, জলজ্যান্ত মানুষের বাচ্চাও যে 'ডাম্প' করা যায়, এটা জানা ছিলো না!

এই লেখাটা এখন পর্যন্ত হাল্কা চালে লিখে যেতে পারছি, তার কারণ, এই ঘটনার শেষটা মধুরেণ সমাপয়েত।
নিজের আগ্রহেই পরের কিছুদিন পত্রিকা ঘেঁটেছি, ক্যাথেরিন নামের এই ছোট্ট মেয়েটার কপালে কি আছে দেখবার জন্যে। দেখেছি আর অবাক হয়েছি, এবং খুশীও। সবাইই খোঁজ রাখছিলো বাচ্চাটার। পত্রিকা রেডিও টিভি সবখানেই নিয়মিত ক্যাথেরিনের অজানা মা-কে অনুরোধ করা হচ্ছিলো যেন তার মেয়েকে ফিরিয়ে নেন তিনি।
কোন একজন মাল্টিমিলিওনিয়ার ক্যাথেরিনের আঠারো বছর বয়েস পর্যন্ত সব খরচ দিবেন বলে অঙ্গীকার করলেন। আরেকজন বললেন, ফিরিয়ে নিলে শান্তিতে বসবাসের জন্যে মা আর মেয়েকে একটা বাড়ি কিনে দিবেন তিনি
এইসবের গুণেই কিনা জানি না, তবে শেষমেষ ক্যাথেরিনের আসল মা আড়াল থেকে যোগাযোগ করেছিলো।
পত্রিকায় এলো গোপন অবস্থান থেকে কন্সালটেন্টের সাথে সদ্য-মা হওয়া মেয়েটির কথোপকথন। পড়লাম, এক ফাঁকে কনসাল্টেন্ট জিজ্ঞেস করলেন, ''তুমি নিজে ভালো আছো তো? মাত্রই বাচ্চার জন্ম দিয়েছ, তোমার নিজেরও তো মেডিক্যাল কেয়ারে থাকা প্রয়োজন।'' এই পড়ে আমি ভীষণ অবাক হলাম। ভাগ্যিস, এই মহিলা আমাদের দেশে জন্মায় নি!
ডাম্পড হওয়া বাচ্চাটি মায়ের কাছেই ফিরেছে কিনা জানি না, তবে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল শেষ মেষ, দেখে আমারও ভাল লেগেছিলো।
-----------------

যেটা বুঝলাম, আমাদের আধুনিক জীবনে সুখী হওয়ার বেশ কার্যকরী ফর্মূলা এই ডাম্পিং।
পান-বিড়ি-তামুক কোনটাই এখন আর খাই না আমি, 'জীবন থেকে জটিলতা কমাই'- এমনটাই বলতাম আগে। এখন থেকে ভাবছি বলবো, ওগুলো কবেই ডাম্পড করে দিয়েছি!
চট্টগ্রামের ভূমিধ্বসে তিন অংকের মানুষ মারা গেলো, ছবি আর নিউজ দেখে নার্ভে চাপ পড়তো, সহ্য হতো না।
পরে লম্বা সময় দেশের পত্রিকা পড়ি নি, ইচ্ছে করেই কদিনের জন্যে ডাম্প করে গেছিলাম সেসব খবর।
এই যে ডাম্পিং নিয়ে মজা করে এত এত বাক্য লিখলাম, পুরোটা সময় ভুলে থেকেছি আমাদের দেশের ডাস্টবিনগুলোতে ফেলে দেয়া মানব-শিশুদের কথা। বাবা মা'র কাছে অনাকাংক্ষিত তারা, তাই কপালে লেখা ছিলো ডাম্পড হওয়া।
মরে গিয়ে যারা বেঁচে যেত, সৌভাগ্যবান তারা, যারা বেঁচে থাকতো তারপরেও, তাদের কি হতো?
ভৈরবের সেই ক্লিনিকের কথাও ভুলে থেকেছি ইচ্ছে করেই, যেখানে মায়ের পেটের ভেতরে মেরে ফেলা হতো শিশুদের, গর্ভপাতের রেট বেশি ক্লিনিকে, সেই অল্প বেশী কিছু টাকা কামানোর লোভে। কি হবে এসব মনে রেখে?

বুঝতে পারছি আমার মন নিজে থেকেই সভ্য ও সুশীল হয়ে উঠছে দিন দিন। সুখী হবার ফর্মূলা জেনে গেছে সে। শিখে গেছে কেমন করে বেছে বেছে ভালো আর হ্যাপি-এণ্ডিং খবরগুলোকে মনে রাখতে হয়, আর আমাদের দেশের অসুখী খবরগুলোকে তলিয়ে দিতে হয় মনের অতল গহবরে।
অজি বাংলায় যাকে বলে কি না- ডাম্পিং!

------

বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০০৭

প্রতিবাদ জানাই-

প্রতিবাদের সঠিক ভাষা জানা নেই, ঠিক কোন দরজায় ঠক ঠকালে ঠিক জায়গায় আমার কণ্ঠস্বর পৌঁছাবে জানি না, তবু তীব্র প্রতিবাদ জানাই বিশ বছর বয়েসী কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানকে গ্রেপ্তারের!
সেই সাথে তীব্র ঘৃণা বরাদ্দ রইলো প্রথম আলো নামের পত্রিকার ও তার সম্পাদক মতিউর রহমানের প্রতি। নিজেদের গা বাঁচানোর তাগিদে যারা সত্য প্রকাশের দায়িত্বজ্ঞানকে কাঁচকলা দেখালো।
আর করুণা রইলো এক দূর্ভাগা দেশের অপরিপক্ক সরকারের জন্যেও।
বড় হও দাদাঠাকুর!

সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০০৭

পৌনঃপুনিক

প্রায়শই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ভাবি, নাহ, আজ থেকে প্রতিদিন অন্তত এক পাতা হলেও কিছু লিখব।
তারপর দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে দিন শুরু করি। বেলা বাড়তে থাকতে, সূর্য্যের আগে আগে আমি ছুটে চলি নানা কাজে। ওপেনটি বাইস্কোপ, নাইন টেন ..., নাকি নাইন ইলাভেন এখন? সে যাকগে, চুলটানা বিবিয়ানা, আর আমার বৈঠকখানা রংবেরঙের বায়োস্কোপে ভরে ওঠে। তার থেকে বেছে বেছে কিছু নিয়ে আমি রংধনু বানাই।
পৃথিবী তার আহ্নিক সারে। আমি মাঝামাঝি ক্লান্ত হয়ে এবং অনেকই রেগে মেগে লাগাম টেনে ধরি। ওরে বুবু সরে দাঁড়া, আসছে আমার পাগলা ঘোড়া।
আমি বাড়ি ফিরবার অনেক আগেই দেখি সূর্য্য বাড়ি ফিরে গেছে, সারাদিনের শোধ তুলে নিয়ে অট্টহাসি দেয় যেন। তো দিক না! সেই তো আন-বাড়িতে ডিউটি তার এখন। আমার মতন সুখ সুখ সুখ কই পাবে সে?
তো, সুখী হই, হয়ে আমি জাল টেনে বসি। আনাচে কানাচে কত আঁকাআঁকি, কত লেখাজোকা- সবগুলোর ভাঁজ খুলে খুলে রঙে ভেসে যাই, ডুবে ডুবে যাই।
আর ডুবতে ডুবতে চোখ বুজে ভাবি, নাহ, কাল থেকে প্রতিদিন অন্তত এক পাতা হলেও কিছু লিখব।

বুধবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০০৭

DownloadKSTNH

কাঠের সেনাপতির ই-বুক ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন নিচের যে কোন লিংকে।
Download the book from here.
১/ কাঠের সেনাপতি- ইপাব ফরম্যাট
২/ কাঠের সেনাপতি- মোবি ফরম্যাট
৩/ কাঠের সেনাপতি- পিডিএফ ফরম্যাট
ফাইল সাইজ যথাক্রমে ৭১০ কিলোবাইট, ৩৬১ কিলোবাইট ও ১.০৫৫ মেগাবাইট।

শুক্রবার, আগস্ট ৩১, ২০০৭

ফাজিল সংক্রান্ত আলাপ সালাপ

এ কথা প্রমাণিত সত্য যে, আমাদের দেশের জনপ্রিয় লেখকদের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট সময়ের পরে ভীমরতি দেখা যায়। তারা আবঝাব যা খুশি মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখে যেতে থাকেন, লিখে টিখে আয়েশের ঢেকুর তুলে ভাবেন, পাঠক নেহাতই বোকাসোকা শ্রেণীর প্রাণী, যা-ই খাওয়াবেন, তাই খাবে। ভাবনাটা অবশ্য ভুল নয়। বোকাসোকা না হলেও আমার মতন অনেক সর্বভূক শ্রেণীর পাঠক যারা সব ধরণের লেখাই পড়েন, তাদেরকে ঐ সমস্ত আবঝাবও খেতে হয়।
তবে, কথা হচ্ছে, খেলেই যে সেটা পেটে চলে গেল, ব্যাপারটা তা নয়, কিছু কিছু আবার বমি হিসেবে ফেরতও চলে আসে!
ঠিক সম্প্রতি আমাকে এ ধরণের বিবমিষায় পেয়ে বসেছিল, যখন আমি 'লেখক আনিসুল হক'-এর 'ফাজিল' নামক বইটি পড়ছিলাম।
আনিসুল হক-এর নাটকগুলো আমার কাছে বেশ ভালো লাগে, বিশেষ করে ফারুকীর বানানো যেগুলো। মনে আছে, পরিচালকের নাম দেখে দেখে বাংলা নাটক দেখার অভ্যাস আমার প্রথম গড়ে ওঠে 'প্রতি চুনিয়া' নাটকটি দেখার পরে। কাহিনী ও নির্মাণ, দুটোই এত চমৎকার ছিল যে এ জুটির ভক্ত হয়ে গেছিলাম।
ফাজিল নামক বইটি পড়া শুরুর আগেও খানিকটা সুখস্মৃতি ছিল, আনিসুল হক- এর আরেকটি বই পড়েছিলাম অনেক আগে, তোর জন্যে প্রিয়তা, ঐ বইটা পড়ে মনে আছে, গড়িয়ে পড়া দু'এক ফোঁটা কান্না লুকোবার জন্যে আমাকে বেশ কসরত করতে হয়েছিলো।

বলতে দুঃখ হচ্ছে, ফাজিল বইটি পড়ার পরে প্রতি চুনিয়া অথবা তোর জন্যে প্রিয়তা-র সম্পর্কিত সকল আনন্দকে পূর্বজন্মের স্মৃতি বলে ভ্রম হচ্ছে।

কয়েকটি ছোটগল্পের সংকলন ফাজিল। প্রথম গল্পের নামেই বইয়ের নামকরণ। আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম, যখন দেখি একটি পত্রিকা অফিসের গল্প সেটা। সংলাপে ভরপুর। এবং লাইনের পর লাইন দেখে কেন যেন সন্দেহ হলো, ভবিষ্যতে এটিকে নাট্যরূপ দিবার কোন গভীর ইচ্ছা বোধহয় লেখকের মনে বাসা বেঁধেছিলো। কাহিনীতে কোন চমক নেই। পড়তে গিয়ে মনে হলো, এটা সম্ভবত একটা হাসির গল্প, এবং আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও দুঃখ এই যে আমি একবারো হাসতে পারি নি। বরং শেষ করবার পরে মনে হলো এরকম বিরক্তিকর গল্প আমি বহুদিন পড়ি নি।

পরের গল্পের নাম মুক্তি। এবং পুরো গল্পে ভালো লাগার মতন একটিই বিষয় সেটি হল এই নামটি। মুক্তিযুদ্ধকে আশ্রয় করে লেখা এর চেয়ে দূর্বল গল্প আমি আর কখনো পড়েছি কি না মনে করতে পারছি না। প্রার্থণা করি, আমাদের লেখকেরা বিষয় বাছাইয়ের আগে যেন দয়া করে নিজের সামর্থ্য যাচাই করে নেন।
এই দুটো ব্যর্থ গল্প পড়ার পরেও কি ভেবে যে তৃতীয় গল্পটা পড়া শুরু করেছিলাম জানি না। কিন্তু অচিরেই আমাকে থেমে যেতে হলো। একটা প্যারা কোট না করলে নিজের প্রতি অন্যায় করা হবে।
" বাক বাকুম শব্দে আঙিনাটা সরগরম। একটা মুরগি কট কট কটাস বলে ডেকে উঠলো। মনে হয়, ডিম পাড়লো এখনই। মুরগি ডিম পাড়লে নিজেই ডাকে, আর মানুষ বাচ্চা দিলে বাচ্চা কাঁদে আর ছেলের বাবা আযান দেয়। "
এই প্যারা পড়ার পরে আর এগুতে পারলামনা। ফাজিল বইটি পড়ার এইখানেই সমাপ্তি টানলাম।

অনেক বড় লেখকদেরই শেষ বয়সের ছাইপাশ দেখে 'লেখকদেরও অবসর নেয়া উচিৎ কি না' এরকম একটি বিতর্ক মাঝে সাঝেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। আনিসুল হক এখনও তরুন, তার জন্যে অবসর একটু কঠিনই হয়ে যাবে, কিন্তু লেখা থেকে বেশ কিছুদিনের জন্যে লম্বা বিশ্রামের প্রেসক্রিপশানটা তিনি নিজেই ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখতে পারেন।
অন্তত আমরা মানে বেচারা পাঠকেরা কিছুদিনের জন্যে বদহজমের যাতনা থেকে রক্ষা পাই!

শনিবার, আগস্ট ২৫, ২০০৭

আমি আগের ঠিকানায় নেই-

কুনোব্যাঙ আর আমি আগের জন্মে নির্ঘাৎ মামাতো ভাই ছিলাম।
আমার ঘরকুনো স্বভাবটা যারা জানে, তারা সেটা একবাক্যে স্বীকার করবে। একটা ঘর পেলে তার কোনাকানিতে জীবন কাটিয়ে দিতে পারি আমি, কিন্তু কি আশ্চর্য, কোন খুঁজে নেবার ঘরটাকেই পালটাতে হয় আমাকে বারবার।
সম্প্রতি আমার আবারো ঠিকানা পাল্টেছে। এবারের পালটানো, আগেরগুলোর মত বিষাদময় নয়। তেপান্তরের চেয়েও লম্বা সাগর পাড়ি দিয়ে বউ এসেছে আমার কাছে। দুই রূমের ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে বাসা বেঁধেছি আমরা। প্রতিদিন দু'হাত ভরে সংসারের যাবতীয় সামগ্রী কিনে বাড়ি ফিরি, ভাবি এই বোধহয় শেষ, আর কিছুই কেনা বাকি নেই। পরদিন আবার বাজারে যাই, দুয়ে দুয়ে চার হাত ভরে যায়, তবু পরের দিনের স্বপ্ন কেনা বাকি থেকে যায়।

বাড়ির সাথে সাথে, আধুনিক নাগরিকের মতন পাল্টেছে আমার ফোন নাম্বার। আর..., আর পাল্টেছে, আইপি এড্রেস। এটুকু পাল্টাতে অবশ্য একটু সময় লেগে গেল। আজকে বাসায় নেট-এর সংযোগ লাগার সাথে সাথেই টের পেলাম, আমার এই নতুন ঘরেও একটা ছোট্ট সুন্দর কোনা রয়েছে।
পূর্বজন্মের সেই মামাতো ভাইয়ের মতন আজ থেকে আমিও তবে ঘরকুনো হয়ে যাবো!


শনিবার, জুলাই ২১, ২০০৭

মননে কবিতার আনাগোণা-

মাঝে মাঝে ভাবি, ভাগ্যিস, মানসিক পরিপক্কতা আসার পরে বিনয় মজুমদারের কবিতার সাথে পরিচয় হয়েছে। নইলে নির্ঘাৎ খুব খারাপ হোত। যেরকম হয়েছে সুধীন দত্তের বেলায়। সেই বালক বয়সেই কি মনে করে যে পড়েছিলাম একবার, ঠিকঠাক মাথায় বসে নি, এবং তারপরে আজ অবদি আমি সুধীন দত্ত পড়ে উঠতে পারি নি। বিনয় মজুমদারের বেলায় এরকমটা হলে আরো বেশি দুঃখ পেতাম, কত দুরন্ত সব কবিতা আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেত!

ঠিক সময়ে ঠিক জিনিসটা পড়ার প্রয়োজন সাংঘাতিক। আমি অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই এরকম কোন সিঁড়ি মানি নি, সারাটাজীবনই উই পোকার মতন পড়ে গেছি, এলেবেলে, যা কিছু হাতে পাই। এবং এই সত্যটা ভেবে পরে মনে হয়, এরকম ওলোটপালোটের পরেও মনের ভেতরে কেমন করে জানি সত্যিই একটা সিঁড়ি ডিংগানোর মতন ব্যাপার আপনা থেকেই দাঁড়িয়ে গেছে।
গানের ব্যাপারে এই কথাটা আমার বারংবারই মনে হয়, বিশেষত নজরুল গীতির বেলায়। বাবা শুনতেন, আমি বরাবরই এড়িয়ে যেতাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন যখন কি মনে করে শুনতে শুরু করলাম নজরুল, এবং অবধারিত ভাবেই টের পেলাম এর কাছে টাকিলার নেশাও কিছুই নয়। হু, এমনকি লেবু-লবণ ছাড়াই! এবং আমার তাই দৃঢ মনে হয়, নজরুল মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের গীতিকার।

কথায় কথা বাড়ে। বলছিলাম বিনয় মজুমদারের কথা।
গত সপ্তাখানেক বিনয় মজুমদারে ডুবে আছি। পড়তে পড়তেই কিছু কিছু শব্দ, কিছু কিছু লাইন মাথার ভেতরে যেন চকমকি পাথর ঘষে দেয়। তাঁর ঈর্ষনীয় ক্ষমতা দেখে বরাবরই অবাক হই, শব্দরা কি নিদারূন ভৃত্যের মতনই না তাঁর আজ্ঞাবহ থেকে গেছে চিরকাল।
নানা সময়ে নানা কবিতা মাথায় জায়গা করে নেয়। সাম্প্রতিক খুব পছন্দের একটা কবিতা...

যেন প্রজাপতি ধরা- প্রত্যক্ষ হাতের অতর্কিত
আক্রমণ করে ব্যর্থ, পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের
অবকাশে ফুটে ওঠা পিপাসার্ত তারাদের মতো,
অন্যান্য সকলে আছো, অথচ আমি তো নিরূপায়।
ক্ষুধিত বাঘের পক্ষে শূন্যে দিক পরিবর্তনের
মতন অসাধ্য কোন প্রচেষ্টার সারবত্তা নেই।
তোমাদেরি নীতি নেই, সে এখনো আসতে পারে।
কিছুটা সময় দিলে তবে দুধে সর ভেসে ওঠে।

- ২০ জুলাই, ১৯৬১;
বিনয় মজুমদার; ফিরে এসো চাকা।


শুক্রবার, জুলাই ২০, ২০০৭

টুকরো টাকরা

আমার সহকর্মী, বেশ ভালমতন বাচ্চা একটা ছেলে। ইন্ডিয়ান, পাঞ্জাবী।
পঁচিশ পার হবার পর থেকে নিজেকে বুড়ো ভাবা শুরু করেছি, তার ওপারের যে কাউকেই বাচ্চা মনে হয়!
কাল ওর গার্লফ্রেন্ডের গল্প করছিলো আমার সাথে।
স্প্যানিশ মেয়ে, খুব নাকি ভালো, অনেক কেয়ার করে। ওর বাবা-মারও নাকি খুব পছন্দ। ভারতীয় কালচার ধরে ফেলছে খুব দ্রুত।
ছেলেটার আলোমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে ভালো লাগলো। স্বপ্নালু চোখ, গার্লফ্রেন্ডের সাথে একটা বাড়ি শেয়ার করছে, কত কত সুবিধা সেখানে জানালো আমাকে। আমিও মজা পেলাম।

হঠাৎ কি মনে হতেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো, তোমার গার্লফ্রেন্ড নেই? আমি হাসতে হাসতে দু'পাশে মাথা নাড়ালাম, না, নেই।
একটু মনে হয় দুঃখ পেল সে। মনে হলো, হয়ত স্বান্তনাসুচকই হবে, কিছু একটা বলতে যাবে, আমি থামিয়ে দিলাম। তারপর হেসে বললাম, ... বাট, আই হ্যাভ আ ওয়াইফ, নো ওয়ারিজ!


ঢেঁকি


শেল-এর সার্ভিস স্টেশানে পার্টটাইম জব করি।
সেদিন গিয়ে, রাতে, কাউন্টারে দাঁড়াতেই খুব ব্যস্ত হয়ে গেলাম। পরিচিত এক ক্রেতা এসে নিয়ম-মাফিক শুভেচ্ছা বিনিময়ের পরেই জিজ্ঞেস করলো, আজকে ডাকাত আসে নি তো? কুশল জিজ্ঞাসার এই পর্বগুলোর সাথে এখন পরিচিত আমি, হেসে বলি, না, এখনো নয়।

একজন, দুইজন, তিনজন। চতুর্থ ক্রেতা একই ভাবে ডাকাতের কথা বলায় আমি ভাবলাম, কোথাও নির্ঘাৎ গন্ডগোল আছে। বললাম, আজ সবাই ডাকাতের কথা জিজ্ঞেস করছো কেন বলো তো?
ও অবাক! তুমি জানো না?
জানলাম। দু'দিন আগে, রাতে, এখানে ডাকাতি হয়ে গেছে! বিশাল একটা কিচেন-চাক্কু নিয়ে এসে ক্যাশ টাকা নিয়ে গেছে ডাকাত।

নির্ঘাৎ ড্রাগি বা জাংকিজ-গুলো হবে। তবু স্টোরে একা হতেই খানিকটা ভয়-ভয় করলো। ডায়রি খুলে দেখি, কোথাও ডাকাতির উল্লেখও নেই! কি আশ্চর্য, কেউ আমাকে কিছু জানালো না কেন?
বিশাল রেগে মেগে ডায়রিতে বড়সড় একটা নোট রাখবো, ভাবতেই ভাবতেই ম্যানেজার ফোন করলো। এ কথা সে কথার পরে বললো, ডাকাতির কথা। আমাকে সাহস জোগালো। আমি বললাম, ঠিকাছে। আমি ভীত নই।

শেষমেষ এলো আসল কথায়।
যে ছেলেটা ছিলো ডাকাতির দিন, ও নাকি একটু ডিপ্রেশানে ভুগছে, কাজ করতে পারবে না কিছুদিন, আমি যদি ওর শিফটগুলো করি, তবে খুব ভাল হয়।
একদম ইচ্ছে হলো না। রাতে কাজ ভালো লাগে না, তারউপর এই সব, মানা করলাম, পারবো না বললাম, তবু ম্যানেজার দেখি নাছোড়বান্দা, সেই একই কথা বলেই যাচ্ছে বলেই যাচ্ছে।
অনুরোধে ঢেঁকি গিলবার ব্যাপারে সুনাম আছে আমার, অবশেষে মনে হলো, অনুরোধে এবার ডাকাতও গিলতে হবে।

লেয়ার কেইক



২০০৪ এ বের হওয়া মুভি 'লেয়ার কেইক', এতদিনেও দেখি নি। অবশ্য আমি একাই নাকি আমার সাথে পুরো পৃথিবীবাসী, এই তর্কে ইচ্ছে করলেই খানিকটা সময় খরচ করা যায়। কারণ- নতুন বন্ড ক্যাসিনো রয়াল বের হবার আগে ড্যানিয়েল ক্রেইগের এই মুভিটি ভিডিও ক্লাবের কোন শেলফের শোভাও বাড়াচ্ছিলো না।
দেখে ভাল লাগলো। ক্রেইগের নাম নেই এই ছবিতে, মানে আছে আর কি একটা, মিষ্টার এক্স। ড্রাগ ডিলার, বড় মাপের। এ ধরণের ছবিগুলোকে কি ধরনের জেনরে ফেলে? খুঁজে দেখি, তিনটা কথা বলা আছে। ক্রাইম, ড্রামা, থ্রিলার। নতুন কোন শব্দের আসলেই প্রয়োজন নেই। বরং এই তিনটেই কোনটা কাকে ফেলে টপকে গেছে সেটা বরং চিন্তার বিষয় হতে পারে।
দেখতে দেখতে আমার আরো একটা সিনেমার কথা মনে হচ্ছিলো, লর্ড অব ওয়ার, নিকোলাস কেইজের। ওখানে কেইজ থাকে আর্মস ডিলার। দু'টি সিনেমার মধ্যে আরেকটা বিষয়ে খুব মিল, দুর্দান্ত সব ডায়লগ দুটাতেই।

ক্রেইগের আরো খানিকটা ভক্ত হলাম। সেই সাথে দু'টা নাম মুখস্থ করে নিলাম, ম্যাথু ভন, আর এন্ড্রু নিকোল। দুই পরিচালকের। এদের আরো ছবি পেলে দেখতে হবে!

বুধবার, জুলাই ১৮, ২০০৭

মন খারাপের দিন-

কদিন ধরে তুমুল বৃষ্টি। সারাদিন আকাশ জুড়ে মেঘ, মেলবোর্ণের মুখ কালো, নাকি মন খারাপ?
জানি না ঠিক। তবে এরকম অবিরাম টানা বৃষ্টি এই শহরে খুব বেশি দেখি নি আমি।

একটা টিনের চালা পেলে খুব ভাল হোত, তারউপরে বৃষ্টির ফোঁটা পড়লে শোনা যেত ঝমঝম ঝম। দিনে রাতে, একদম সমান ঠান্ডা। চারপাশের সব ভুলে গিয়ে গায়ে কম্বল টেনে শুয়ে থাকি। সব কি ভুলে থাকা যায়? যেতে পারলে বেশ হতো। এই রোদ, ঝড়, বৃষ্টি, এই শহর, শহরের মানুষ, মানুষেদের সাথে আমার বন্ধুতা, আমি সব কিছু ভুলে থাকতে চাই, অন্তত, অল্প ক'টা দিন।

নাহ, আকাশের মন খারাপ, তাতে কি? আমার মন খারাপ নয়।
আমি চিরসুখী মানুষ, আমার কখনো মন খারাপ হতে নেই।

বুধবার, জুলাই ১১, ২০০৭

নতুন বন্ড



ক্যাসিনো রয়াল দেখা শুরু করার সময় চোখ মুখ শক্ত করে বসেছিলাম।
ব্রসন্যানকে রিপ্লেস করছে যেই ব্যাটা, তাকে কিছুতেই ভাল লাগা চলবে না, মোটামুটি এইরকম মারদাঙ্গা টাইপ ছিলো আমার মনোভাব। পিয়ার্স ব্রসন্যানের পরে অনেকেই শ্যন কনারিকে সবচেয়ে মানানসই বন্ড বলে থাকেন। আমার কিন্তু বুড়া কনারিকেই বেশি স্মার্ট লাগে, বন্ড কনারির চেয়ে। তার চেয়ে বরং রজার মুর অনেক বেশি 'ঠিকাছে'।

তো, সিনেমা শুরুর পর থেকে দেখি আমার মন খানিকটা গলতে শুরু করেছে। তারপর ছবির মাঝামাঝি এসে টের পাই, ড্যানিয়েল ক্রেইগকে আর ততটা 'খারাপ লাগছে না'। এবং আরো কিছুক্ষণ পর যখন গুন্ডাদের মার টার খেয়ে নায়কসাহেব রীতিমতন নাস্তানাবুদ, এবং এতক্ষণের পারফরমেন্সের কল্যাণে তিনি অতিমানবদের কাতার থেকে সরে এসে আমাদেরই চেনা জানা পাশের বাড়ির মাসুদ রানার পর্যায়ে এলেন, সেই মুহুর্তগুলোয়, খুব আরামপ্রদ একটা অনুভূতি হল মনে, আর মনে হল, এই বেড়াল চোখা পাথুরে চেহারার শক্ত-পোক্ত ক্রেইগের মুখেই আসলে মানায় সেই চিরন্তন সংলাপ- মাই নেম'জ বন্ড। জেমস বন্ড।

ক্যাসিনো রয়্যালের জটিলস্য প্লট এবং মাঝে মাঝেই ধীর গতির কারণে খানিকটা উশখুশের পরেও এই মনুষ্য-বন্ডকে দেখে অন্তত এই ভেবে আশাবাদী হয়েছি, আরো কিছু বছর হয়ত আমরা এর কাছ থেকে আরো কিছু ভাল বন্ড-মুভি দেখার আশা করতে পারি।
সেই সুবাদেই, ড্যানিয়েল ক্রেইগকে স্বাগতম জানাই।
ওয়েলকাম টু আওয়ার নিউ মি. বন্ড। ওয়েলকাম।

শনিবার, জুলাই ০৭, ২০০৭

পৃথিবী কিন্তু তত বড় নয়!

আজকের তাজা খবর!
মাত্র পাঁচ বছর আগেও যেমনটা ভাবা হয়েছিলো, পৃথিবী কিন্তু সত্যি সত্যি ততটা বড় নয়।
আজকের পত্রিকায় পড়লাম, বন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডক্টর এক্সেল নথনাজেল বের করেছেন, আসলে যতটা ভাবা হয়, পৃথিবীর ব্যাস তারচেয়ে পাক্কা ৫ মিলিমিটার কম! ভাবা যায়!

এইটুকু পড়ে আমি অবশ্য হেসে ফেলেছিলাম। কেউ কেউ শুনে হাসবে, এরকমটা বোধহয় ডক্টর এক্সেল আগেই অনুমান করেছিলেন। আমার মতন অকালকুষ্মান্ডদের জন্যে তিনি তাই বলে রেখেছেন, যতটা খেলো মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আসলে তত সহজ নয়। একদম সঠিক মাপ জানার দরকার ছিলো আমাদের, বিশেষ করে আবহাওয়া সংক্রান্ত খোঁজখবর দেয় যেসব উপগ্রহগুলো, তাদের সঠিক পজিশনিং-এর জন্যে।

গুরুত্ব বুঝে টুঝে আমি অবশ্য খানিকটা গম্ভীর ভাব ধরে আছি। তবে সমস্যা হলো, থেকে থেকেই খিক খিক করে হাসি পাচ্ছে!
কি মুশকিল!

মঙ্গলবার, জুলাই ০৩, ২০০৭

চাঁদে বাঁধি ঘর

চাঁদে জমি বিক্রি হয়, জানতাম। কিন্তু এর চেয়ে অপ্রয়োজনীয় কিছু আছে বলে জানি না। অথবা, অনেকের প্রয়োজন থাকতেও পারে, কিন্তু আমি জাস্ট- নট ইন্টারেস্টেড!
একই অনুভূতি- ওয়েবস্পেসের ব্যাপারেও। চাঁদের জমির মতন এই জিনিসেরও আমার আসলে কোন প্রয়োজন ছিল না। ব্লগস্পট নিয়েই আমি পূর্ণমাত্রায় খুশি। গুগল মহাশয় দিন দিন ওটাকে আরো বেশি নতুনত্ব এনে দিচ্ছে, আমার মতন সাদাসিধে ব্লগারদের জন্যে এইই যথেষ্ঠ।
কিন্তু কেউ যদি আমাকে চাঁদে একখন্ড জমি কিনে দেয়? তবে? ওখানে বাড়ি বানানোর একটা দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করতে আর বাঁধা কোথায়?
ঘুরেফিরে তাই হলো। আমরা গোটা আষ্টেক বাল্যবন্ধু। একই শহরে হুটোপুটি করতে করতে বেড়ে উঠেছি, সময়ের প্রয়োজনে এখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে গিয়ে বাসা বেঁধেছি। সবাইকে এক জায়গায় আনবার জন্যে একেবারেই নিজেদের একটা 'প্রাইভেট' ফোরাম নিয়ে জল্পনা অনেকদিনের। ঠিক কোনটা যে সেট করবো বুঝছিলাম না। পানবিবি, পিহেইচপিবিবি, ওয়ার্ডপ্রেস এইসব ঘুরে ঘুরে শেষমেষ মন ঠিক করে ফেলেছিলাম, জুমলা দিয়েই বানিয়ে ফেলবো ফোরাম।
ঠিক তখুনি অরূপদা সচলায়তন বানালেন ড্রুপাল দিয়ে।
এই জিনিস এতদিন আমার চোখে পড়ে নি! এখন দেখি, এরকম দারূন কাজের জিনিস আর খুব বেশি নেই। সুতরাং খানিক গুতোগুতির পরে টেস্ট সাইট বানালাম ড্রুপাল দিয়ে। বন্ধুরা কেউই ব্লগিং ব্যাপারটায় অভ্যস্ত নয়, তাই অল্প কদিনেই নানারকম অভিযোগ পেয়ে শেষমেষ পানবিবি দিয়েই আমাদের ফোরামের টেস্ট সারলাম।
কিন্তু ড্রুপালের মোহ কাটছিলো না আমার। তাই যখন ফোরাম সেটআপের জন্যে জায়গা কিনতে হলো, অনেক ভেবে চিন্তে ডোমেইনও কিনে ফেললাম একটা। ওটারই একটা অংশে পানবিবি দিয়ে হলো আমাদের ফোরাম। আর মূল অংশে ড্রুপাল দিয়ে তৈরি হলো পৃথিবীর সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় ওয়েবসাইট কনফুসিয়াস ডট কম!

চাঁদের জমিতে বানানো বাড়ি, যাওয়া হবে না হয়তো তেমন, থাকাও হবে না, তবু খাঁটি গেরস্থ বলে কথা, সাজানো গুছানোর কিছু ব্যাপার থেকে যায়।
ওখানে তাই এখনো ঝাড়পোছ চলছে। চলবে আরো কিছুদিন।

বৃহস্পতিবার, জুন ২৮, ২০০৭

নোটিশ বা ঐ ধরণের কিছু একটা-


অনেকে অল্প স্বল্প জানতে চাইছেন, সামহোয়্যার ইনে কেন এখন ব্লগাই না।
তাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, তেমন কোন বড় সড় কারণ নেই।
এর আগেও মাঝে সাঝেই ওখান থেকে ব্রেক নিয়েছি, কোনটাই যদিও এবারের মতন দীর্ঘ ছিল না।
এই মুহুর্তে সামহোয়্যারে কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না, এটাই মূল কারণ।
ইচ্ছেটা ফিরে এলে আমিও আবার লিখতে শুরু করবো হয়তো।

তার আগ পর্যন্ত ব্লগস্পট, আর সচলায়তন নিয়ে- এই বেশ ভাল আছি।

রবিবার, জুন ২৪, ২০০৭

প্যারিস হিলটন আর আমাদের রাজনীতিবিদেরা-

শেষমেষ প্যারিস হিলটন জেলে গেলো। যাবার আগে সানডে হেরাল্ডের পুরো পাতা জুড়ে নিজের কান্না ভরা মুখ উপহার দিয়ে গেলো।
কদিন ধরেই এই নিয়ে অনেক গালগল্প পড়লাম। আমি প্রতিদিন পড়তাম আর ভাবতাম, এই সব মিডিয়া পারেও বটে। যে কোন পর্যায়েই রীতিমত বখে যাওয়া এক মেয়ে, শুধু মাত্র সেলিব্রেটি হবার কারণে কি কাভারেজটাই না পেলো! হানিমুনে নয়, শ্বশুর বাড়িও নয়, যাচ্ছে কোথায়? জেলে! তাই নিয়েও কত কাহিনী। প্রতিদিন গাদা গাদা রিপোর্ট, পত্রিকার তরফ থেকেই চলল কাউন্ট ডাউন, প্যারিসের জেলে যাওয়ার আর এতদিন বাকি! মস্করা আর কি!!
আর সাথে ডিটেইলে বর্ণিত হলো - আজ প্যারিস এখানে চা, ওখানে কফি আর ঐযে ঐখানে হাওয়া খেতে গেলেন।
প্যারিসের প্রস্তুতিও দেখার মতই ছিলো। যাবার আগে কোন পার্লারে গিয়ে যেন বিদায়ী ফেসিয়াল করালেন।

যাগগে, আমরা বঙ্গদেশের ক্রিমিনাল শ্রেণীর মানুষ, এইরকম জেলে যাওয়া আমরা উঠতে বসতে কত দেখি! মুরগী মিলন, কানা লিটনদের পরে আমাদের ভূতপূর্ব রাজনীতিকগণ এখন লম্বা কিউ-এ দাঁড়িয়ে আছেন, কার পরে কে জেলে যাবেন এই অপেক্ষায়।
আমাদের মনেও মায়াদয়া কমে গেছে। বৈদেশী প্যারিসের জন্যে যাওবা দুস্কু দুস্কু একটা ভাব এলো মনে, কিন্তু স্বদেশীদের জন্যে কিছুই হলো না।

আরেকটা রঙ্গ দেখেও মজা পেলাম ভালই। প্যারিস নাকি সাথে করে খাতা কলম নিয়ে যাচ্ছেন, জেলে গিয়ে তিনি 'ডিয়ার ডায়রি' নামে আত্মজৈবনিক কোন উপন্যাস রচনা করতে পারেন, এই আশায়। এইটুকুতে আপত্তি নেই, করিওনি, মুশকিল হয় তখুনি যখন শুনি, সেই ডায়রি কিনবার জন্যে ইতিমধ্যেই প্রকাশকদের মধ্যে লড়াই শুরু হয়ে গেছে, দামও হাঁকা হয়ে গেছে মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত। কোন একটা পত্রিকা নাকি এর মধ্যে প্যারিসের এজেন্টের সাথে চুক্তি করে ফেলেছে, জেল থেকে বেরুবার পরে তাদের পত্রিকায়ই প্যারিস প্রথম সাক্ষাৎকার দিবেন। এবং তার জন্যে কত টাকা পাবে বলুনতো? খুব বেশি না, মাত্র ১.১ মিলিয়ন ডলার!

এইবেলা অবশ্য একটু ভাবনা চিন্তার খোরাক আছে। আমাদের রাজনীতিকরা সারা জীবনই টাকার পেছনে ছুটলেন, সরকারী কোষাগার থেকে শুরু করে এমনকি ত্রাণের টিন পর্যন্ত বাদ যায় নি তাদের থাবা থেকে। তো, এই যে জেলে ঢুকছেন, সেখানে গিয়ে প্যারিসের মতন লাভবান হবার একটা বুদ্ধি তারা করলেই তো পারেন!
আপনাদের কথা জানি না, আমি কিন্তু মিস্টার টেন পার্সেন্ট অথবা স্পাইক-বাবর কীসের কল্যাণে তাদের সমস্ত অতি-বৈধ সম্পত্তির খবর জানিয়ে দিলেন, অথবা ট্রাম্প কার্ড জলিল হঠাৎ কোন বাতাসের ধাক্কার তাদের নেত্রীর গোপন কাহিনী ফাঁস করলেন, এইসব পড়তে ভীষণ ভাবে ইচ্ছুক।
কিন্তু হায়, আমাদের দেশের প্রকাশকেরা এতটা রসিক বোধহয় এখনো হয়ে ওঠেন নি।

বুধবার, জুন ২০, ২০০৭

দন্ত-কাহিনি


মিষ্টিপ্রীতি আছে তীব্র রকমের। জিভ সামলাতে পারি না দেখলে,হাতও না। অবশ্য সামলানোর ইচ্ছেও মনের মধ্যে তেমন একটা জোরালো নয়।দেশে থাকার সময় ইচ্ছেমতন খেতাম। কুমিল্লা গেলেই মাতৃভান্ডারের রসমালাই আর জলযোগের স্পঞ্জ নিয়ে বসে যেতাম বন্ধুরা গোল হয়ে, আয়েশ করে খেতাম। আমরা অবশ্য খাওয়া বলতাম না, বলতাম সাধনা করা।

তো যা হয়, পরবাসী হবার পরে সেই সাধনায় ব্যাঘাত ঘটলো। এখানে এসে টিন কেটে মিষ্টি খেতে জুত পাই না। তাই বলে খাওয়া কমেছে সেটাও ঠিক নয়। পেলেই খাই, এরকম অবস্থা। শুটকো পটকা অবস্থা থেকে দেহের হাল এখন এমন হয়েছে যে লোকে ইদানীং আমাকে দেখিয়ে উদাহরণ দেয়, 'আমি ভাই ঠিক আপনার মতন মোটা ছিলাম ক'দিন আগেও, ইদানীং শুকিয়েছি।'' নিজের পাশে বসে থাকা মর্তমান হিমালয়সম বউকে রেখে আমাকে দিয়ে মোটা মানুষের উদাহরণ কেন টানা, ভদ্রতার খাতিরে আমি এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাই। সে যাকগে। এই দুঃখের গল্প আরেকদিন।

তো যা বলছিলাম। মিষ্টি খাই, সাথে বেশি পাই না এই দুঃখে জাত-বেজাতের চকোলেটও সাবাড় করি নিয়মিত। এই করে করে দাঁতের তেরটা বেজে গেছে আমার। আজ সকালে মাজতে গিয়ে দেখি কমপক্ষে তিনটা দাঁতের গোড়া ফাঁকা হয়ে গেছে, একটার অর্ধেক নেই। এভাবে চলতে থাকলে মধ্য তিরিশেই ফোকলা বুড়ো হয়ে যাব কি না সেই দুশ্চিন্তায় পড়েছি।

দন্ত-সেবায় মনোযোগী হতে হবে মনে হচ্ছে আরো। মাজন বদলাই নিয়মিত, সাথে চলে সবচেয়ে দামী পেস্ট। বন্ধুরা বুদ্ধি দিয়েছিলো ব্যাটারিওয়ালা অটোমেটিক মাজন ব্যবহার করতে। কিন্তু মুখের ভেতর জিভ বাদে আর কোন কিছু স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে কিলবিল করে নড়ছে, ভাবতেই গা-টা কেমন শিউরে উঠলো! তাই সেটা নাকচ করে দিলাম।

দাঁতের কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল পুরনো গল্প।
সে অনেককাল আগের কথা। ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। কার্জন হলের গ্যালারিতে ক্লাস করি। একবার ক্লাশের ফাঁকে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছি। সবাই কিছু না কিছু খাচ্ছে, আমি খাচ্ছিলাম পেয়ারা। আমার নীচের পাটির ঠিক মাঝখানের দাঁত দুটো একটু আজিব কিছিমের। বাকি সবার থেকে আলাদা হয়ে এরা খানিকটা বাঁকা হয়ে বেড়ে উঠেছে। দেখতে অনেকটা ইংরেজী অক্ষর 'এম' বা 'ডব্লিউ'র মতো দেখায়। তো, সেদিন পেয়ারা খেতে খেতে আমি হঠাৎ তাকিয়ে দেখি, প্রতিবার কামড় দিলেই পেয়ারার গায়ে সুন্দর করে 'ডব্লিউ' ভেসে উঠছে! কি চমৎকার দৃশ্য। আমি নিজেই মুগ্ধ হয়ে যাই। পাশে বসে ছিল একজন সহপাঠিনী, এলিজা নাম। সহজ সরল বলে খ্যাতি ছিল মেয়েটির। ওকে আগ্রহ নিয়ে দেখিয়ে বললাম, 'দেখ দেখ এলিজা, আমি কামড় দিলেই কেমন 'ডব্লিউ'র মতো হয়ে যায়। দেখেছিস!''

ও চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো ভালো করে। তারপরে কি বুঝলো কে জানে, মুখ চোখ লাল হয়ে গেল ওর, আর আমাকে বলে উঠলো, 'ছি ছি কনফু, তুই এতো অসভ্য! ছি!''

পেয়ারা হাতে আমি বেকুব হয়ে গেলাম! লে বাবা! আমি আবার কি অসভ্যতা করলাম!
যত্ন সহকারে আমি তো পেয়ারাই কামড়েছিলাম শুধু, আর কিছু তো নয়!



মঙ্গলবার, জুন ১৯, ২০০৭

তারেক মাসুদ-এর অন্তর্যাত্রা


এখানকার বাংলাদেশী দোকান থেকে অনেকদিন আগেই কিনে এনেছিলাম সিডি-টা। কিন্তু এতদিন সময় করে উঠতে পারি নি। অবশেষে গত পরশু দেখে ফেললাম তারেক মাসুদ-এর অন্তর্যাত্রা।

সিনেমার শুরুতে যখন এ ছবির ইংরেজী নাম দেখালো 'হোমল্যান্ড'- অর্থটা বুঝি নি ভাল করে। কিন্তু পুরোটা দেখবার পরে মনে হলো, এর চেয়ে সুন্দর নাম আর হয় না।

গল্পটা অনেক সুন্দর। একদম সুলভ (নাকি সহজলভ্য) কোন কাহিনি নয় এটা, তবে সেরকম অনেকগুলো কাহিনিকে জোড়া দিয়ে বানানো বলা চলে। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছে এ ছবির পাত্র-পাত্রীরা। আমি সিলেটী ভালো বুঝি না, তারপরেও যখন কারো সংলাপ বুঝতেই কোন কষ্ট হয় নি, ভাবছিলাম, আসল সিলেটী কথাবার্তা এরকমই তো ? নাকি সিনেমার খাতিরে খানিকটা প্রমিতকরণ করা হয়েছে?

সিনেমাটা, এককথায়, সাবলীল নয়। দৃশ্যান্তরে যাবার সময়গুলোকে প্রায়শই জাম্প-কাট মনে হয়েছে। ঘড়ি দেখি নি, কিন্তু খুব বেশি লম্বা নয় বোধহয় দৈর্ঘ্যে, শেষ হতে তাই সময় লাগলো না বেশি। এবং হয়তো একারণেই শেষ হবার পর মনে হচ্ছিলো, শেষ করার তাড়াহুড়ায় ছিলেন না তো পরিচালক?

কোন চরিত্রই পূর্ণতা পাবার সুযোগ পায় নি যেন, এবং পুরো সিনেমার প্রতিটি চরিত্রের পেছনে যে নিজস্ব গল্প থাকে, তার কোনটাই স্পষ্ট হয় নি এখানে, কোনটা শেষও হয় নি। বাড়ির ভৃত্য লক্ষণকে দেখে মনে হয়েছিলো একটা কিছু গল্প আছে এখানে, খানিক বাদে তাঁকে আর পাওয়া গেল না। খুব অল্প সময় পর্দায় ছিলেন জয়ন্ত, এখানেও একটা গল্পের জন্যে মন উৎসুক হবার আগেই নিভে গেল। এরকম আরো আছে, জয়ন্ত-র স্ত্রীর চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন, আমি গল্প খুঁজেছিলাম সেখানেও, অথবা প্রাচী ও তার ছোট্ট মিষ্টি মেয়েটা, সবাই কেমন করে যেন দূর থেকে বুড়ি ছুয়ে গেল, ভাল করে স্পর্শ করার আগেই।

তবু শেষমেষ ভাল লেগেছে, মনোলগের মত করে সারা যাকের, ও তাঁর ছেলের ভাবনাগুলো জানতে পেরেছি বলে। কোন কোন মৃত্যু মানুষকে কাছে টেনে আনে, নাকি বিচ্ছেদে পোড়ায়, এই জিজ্ঞাসাটুকু মনে জমে ওঠে। রামের জন্মস্থান অযোধ্যা নয় জানি, কবির মনভূমেই, তবু নিজেকে রামের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যখন চমকে যাই, তখন হোমল্যান্ড আর তার ভেতরে আমাদের অন্তর্যাত্রা একাকার হয়ে যায়। কোথাও এতটুকু স্পর্শ না করেও তবু সেটা গভীর কোন দাগ রেখে যায়।


শনিবার, জুন ১৬, ২০০৭

জলদস্যুদের দেখে ফিরে-


কি জানি, একদিন হয়তো লোকে জনি ডেপকেও ভুলে যাবে, কিন্তু মনে রাখবে ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো-কে। যারা রাখবে তাদের মধ্যে আমার নাম থাকবে এক নম্বরে, অথবা তারও আগে।

ক্যারিবিয়ান পাইরেটসদের তিন নম্বর পর্বটা দেখলাম, থিয়েটারে আসার দু'দিন বাদেই। এবং মুগ্ধ হলাম। টানা তিন পর্বে একই আমেজ বজার রাখা সহজ কথা নয়। ম্যাট্রিক্স পারে নি, টার্মিনেটরও ঝুলে গেছে, কিন্তু পাইরেটস অব দ্যা ক্যারিবিয়ান- অ্যাট ওয়ার্ল্ডস এন্ড, একেবারে হাই ডিস্টিংশান সহ পাশ!

এবারে কাহিনি জটিল হয়েছে অনেক। আগের গুলোর মত শুধু চোখ বুলিয়েই রস পাওয়া যাবে না। এবারে মাথা খাটাতে হয়েছে, মনটাকে আরেকটু বেশি মনোযোগী করতে হয়েছে।

শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও এতটুকু বোরিং লাগে নি। পাইরেট ম্যুভি হতে যা যা লাগে, সবই ছিলো এখানে। আগের পর্বে যেগুলো বাদ পড়েছিলো- যেমন- জাহাজে জাহাজে যুদ্ধ- এবারে সেগুলো এসেছে, এবং বলাই বাহুল্য, স্পেশাল ইফেক্টের কারিগরিতে সেগুলোও হয়েছে দেখবার মতন!

কিয়েরা নাইটলিকে এবারে আরেকটু মোহময়ী লেগেছে। সেরকম আবেদন আনার চেষ্টাও ছিল অবশ্য। ডেভি জোন্সএর প্রেমিকা ক্যালিপসো, এটা আবিষ্কার করে অবাক হয়েছি, এরকম সম্ভাবনার কথা একবারও মাথায় আসে নি!

চৌ ইয়ুন-ফ্যাটকে দেখে খুশি হয়েছি। পাইরেট লর্ডদের আলোচনা সভায় জনি ডেপের কীর্তিকলাপগুলো, যদি সম্ভব হতো- ফ্রেম করে বাঁধিয়ে রাখতাম!

আগের যে কোন পর্বের চেয়ে একশান এসেছে অনেক বেশি, তবু, পুরো ছবির রসবোধে কোথাও এতটুকু ঘাটতি পড়ে নি। এই মুহুর্তে যখন আমি জাহাজ উলটে পৃথিবীর অপর প্রান্তে চলে যাবার জন্য শিঁড়দাড়া সোজা করে বসে আছি, পরের মুহুর্তেই তলোয়ার চালাতে চালাতে অরল্যান্ডো ব্লুমের 'উইল ইউ ম্যারি মি' শুনে হাসতে হাসতে চমক কাটাচ্ছি!
শেষটুকুও চমৎকার হয়েছে। একটা দুঃখ ভরা আমেজ, অনেক শান্তির সমাপ্তি, তবু কিছু অপ্রাপ্তি
থেকে যাওয়া। ঠিক যেন বড় দৈর্ঘ্যের কোন ছোট গল্প!

সব মিলিয়ে দুর্দান্ত একটা ছবি। তিন পর্বের মধ্যে সর্বোত্তম বললেও অত্যুক্তি হবে না।
আপাতত ডিভিডিতে আরেকবার দেখার জন্যে অপেক্ষায় আছি। ক্যাপ্টেন জ্যাক স্প্যারো-কে নিজের ঘরে বসে আরেকবার সেলাম না ঠুকতে পারলে বুকের ভেতর আফসোস রয়ে যাবে!
হেইল পাইরেটস!

শুক্রবার, জুন ১৫, ২০০৭

হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ-


এই গানটা কার লেখা মাঝে মাঝেই ভাবি। ভদ্রলোকের জীবন স্বার্থক! এক গান দিয়েই সারা পৃথিবীর সব মানুষের কাছে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন, আর কিছু না লিখলেও চলবে।
তিনি, মানে গীতিকার, মনে হচ্ছে বিজ্ঞাপনপ্রিয়ও নন। নইলে ''সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক''-এর আদলে ''সর্বাধিক গাওয়া গান'' বলে নিঃসন্দেহে বিজ্ঞাপন দেয়া যেত। বছরের ৩৬৫ দিনই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও গাওয়া হচ্ছে এই গান। যেহেতু সব জায়গায় একসাথে রাত ১২ টা বাজে না, তারমানে প্রায় প্রতিটি বারোটা বাজার মুহুর্তেই এই গান গাচ্ছে কেউ না কেউ!
আরেকটা কথাও মনে হয়, সম্ভবত এই গানের কাছ থেকেই লিনাক্স বা অন্য ওপেন সফটওয়্যার উদ্ভাবকরা যে কোন কিছুই 'ওপেন' সোর্স করে দেবার আইডিয়া পেয়েছেন। যেমন দেখুন, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ দুইবার গেয়ে তারপরে যে গায় হ্যাপি বার্থ ডে টু ডিয়ার ড্যাশ ড্যাশ- এখানে ড্যাশের জায়গায় বাড্ডে বালক-বালিকাদের নাম বসিয়ে কি সুন্দর করেই না সবাই মনের খুশি মতন ব্যবহার করে! ওপেন সোর্সের এর চেয়ে ভাল উদাহরণ আর কে কোথায় পাবে বলেন?
তারপরে ধরুন গানের সুরটা...।
আচ্ছা, গান নিয়ে বেশি কথা বলে ফেলছি না কি? হুম, তাই তো মনে হচ্ছে। আচ্ছা, প্যাচাল বাদ দিই। নইলে আসল কথাটাই বলতে ভুলে যাবো পরে।
কাহিনি হচ্ছে, বসে বসে বারোটা বাজার অপেক্ষা করছিলাম। অপেক্ষার সময়টায় ভাবলাম একটু গলা সেধে নিই, গলা সাধতে গিয়ে মনে হলো গানের গুণগান করি কিছুক্ষণ, করতে করতে দেখি সময় হয়ে গেছে।
তো, শেষমেষ হেড়ে গলায় গেয়েই ফেলি-
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ,
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ,
হ্যাপি বার্থ ডে টু ডিয়ার 'বউ '!
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।

বৃহস্পতিবার, জুন ১৪, ২০০৭

সহজ উপায়ে ইউনিকোড বশীকরণ-

১।
মাত্র মাসছয়েক আগেও কম্পুকে ইউনিকোড কম্পাটিবল করতে প্রচুর মারামারি করতে হোত৷ ব্যাপারটা একসময় সহজ হবে জানতাম, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে সেটা ভাবি নি৷ সেই জন্যে সবার আগে ওমিক্রোনল্যাবকে সেলাম জানাই৷

এখন মোটামুটি দু'তিনটে সহজ স্টেপেই কম্পুতে ইউনিকোড বাবাজিকে ধরে রাখা যায়৷

আপনি যদি উইন্ডোজ এক্সপি ইউজার হন, তাহলে ঝটপট নীচের লিংক থেকে 'কমপ্লেক্স' নামক সফটো টা নামিয়ে ফেলুন৷
লিংক= কমপ্লেক্স

ওটা ডেস্কটপে রেখে ডাবল ক্লিক করে ইন্সটল করে ফেলুন৷
কাজ শেষে কম্পু রিস্টার্ট হতে চাইবে, করে ফেলুন৷ নতুন করে যখন চালু হবে, তখন আপনার কম্পুতে ইউনিকোড বাসা বেঁধেছে!

২। এইবারে আসুন কেমন করে ইউনিকোডে লিখবেন৷
এখান থেকে নামিয়ে ফেলুন অভ্রো সফটো৷
এটা ইন্সটল করে লেখ শুরু করে দিতে পারেন৷ অভ্র-র যে মেনুবারটি দেখবেন, ওখানেই হেল্প সেকশান আছে, ওগুলোয় একটু খানি উঁকি ঝুকি দিলেই আর কোন সমস্যা থাকার কথা না৷

৩।
অভ্র ইন্সটলের সাথে সাথেই নিজে থেকে অনেকগুলো ইউনিকোড ফন্ট ইন্সটল হয়ে যায়৷
সেসব যদি কোন কারণে মনে না ধরে, তাহলে এখান থেকে পছন্দসই একটা ফন্ট খুঁজে নিতে পারেন ৷
ফন্টের ব্যাপারে এই মুহুর্তে সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট দিচ্ছে দুইটা ফন্ট৷
ক৷ সিয়াম রুপালি,
খ৷ অপনা লোহিত৷

পাওয়া যাবে আগের লিংকেই৷

৪।
ফন্ট আর অভ্র রেডি৷ এখন কোন ফন্টে লিখবেন? মজিলা ব্যবহার করলে সেখানে ফন্ট সেটাপ করতে হবে, আই-ই করলে সেখানেও৷ অথবা এম এস ওয়ার্ডে ...
শুনে অনেক গ্যান্জাম মনে হচ্ছে? অগে আসলে তা-ই ছিল৷ কিন্তু এখন এই সব কিছু করে ফেলা যায় এক ক্লিকে!
এখান থেকে নামিয়ে ফেলুন ফন্ট ফিক্সার৷
ইন্সটল করতে হবে না৷ জাস্ট রান ডাবল ক্লিক করুন, তারপরে লিষ্টি থেকে পছন্দের ফন্ট সিলেক্ট করে সেট করে দিন৷
ব্যস, কম্ম সাবার৷
এখন যেখানেই ইউনিকোড পাবেন ওখানেই ঐ পছন্দের ফন্টে লেখা দেখবেন৷


আপনার কম্পু এখন রেডি৷

৫।
এইবারে আরো কিছু খবর দেয়া যায়৷ ধরুন আপনি অভ্র-তে লিখে অভ্যস্ত৷ কিন্তু অফিসে অভ্র নেই, বা কোন বন্ধুর বাসায়, অথবা সাইবার ক্যাফে, যার কোনটাতেই আপনি ইচ্ছে থাকলেও অভ্র ইন্সটল করতে পারবেন না, তাদের জন্যে এসে গেছে- অভ্র পোর্টেবল!
একটা পেন ড্রাইভ (ভদ্রজনেরা ইহাকে ইউএসবি বলে থাকেন) সাথে রাখলেই হলো, ওখানে অভ্র পোর্টেবল কপি করে রেখে দিন৷ যে কোন পিসিতে ঢুকিয়ে এক্সট্রাক্ট করে অভ্র দিয়ে ইউনিকোডে লেখা শুরু করে দিন!

পাবেন এইখানেঃ অভ্র পোর্টেবল।

৬।
অভ্র পোর্টেবল এর মতই আরেকটা হ্যান্ডি টুল হলো banglasavvy !
যে কম্পুতে ইউনিকোডের লেশমাত্র নেই, অভ্র নেই, অভ্র পোর্টেবলও আপনার সাথে নেই, ওখানে ইউনিকোডের লেখা পড়বার জন্যে এটা নামিয়ে ফেলুন এখানে ক্লিক করে।
ইন্সটল করতে হয় না, তাই এডমিন এক্সেস লাগে না৷ এটা অনেকটা ভার্চুয়াল ফন্টের মতন৷ শুধু রান করালেই ইউনিকোডের লেখা পড়া যায়!

-----------

ব্যস, কাহিনি খতম!

-----------
ওহ, অরেকটু আছে৷
যাদের এক্সপি নেই, ২০০০ আছে, তারা কি করবেন?
তাদের জন্যে ইন্সট্রাকশান আছে এইখানে।

পড়ে দেখুন৷ করে ফেলুন৷ হয়ে যাবে৷
যদি খুব কঠিন মনে হয়, তাহলে খুব সহজ একটা বুদ্ধি আছে,
এক্সপি কিনে ফেলুন!

-----------

দি এন্ড, মানে, গল্প শ্যাষ।

প্রিয় চট্টগ্রাম-


ভূমিধ্বসের এরকম ভয়াবহতা নিজের চোখে দেখা হয় নি খুব বেশি।
গত কয়েকদিন ধরে দেশের পত্রিকাগুলো পড়ছি না। আমার খুব প্রিয় শহর চট্টগ্রাম, তার সম্পর্কিত সব রকম খবরের কাছ থেকে পালাতে চাইছি ইচ্ছে করেই। তবু এর মাঝেই জানতে হলো আমাকে মৃতের সংখ্যা সর্বমোট ১০৮ জন।
১০৮ সংখ্যাটা আমাদের জন্যে একেবারেই বেশি কিছু নয়। হ্যা, এমনকি সেটা পাহাড় ধসে পড়ে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা হলেও!
আপাতত থেমেছে আশা করি। 'আরো এক বা দুজনের পরে সংখ্যাটা আর বাড়বেনা হু হু করে'। শান্তি খুঁজে নিতে এরকম ভাবনারই মুখাপেক্ষী হতে হচ্ছে এখন আমাকে।
ছবি খুঁজতে গিয়ে দেখি, ছোট্ট একটা তিন চার বছরের বাচ্চাকে মাটি খুঁড়ে তুলে আনা হচ্ছে। ভঙ্গিটা এরকম- গুটিশুটি মেরে মায়ের কোলে শুয়ে আছে যেন সে।
থাকুক শুয়ে, ছোট্ট বাবু। সেটাকে এখানে এই জনারন্যে টেনে এনে ওর ঘুম ভাঙ্গাতে ইচ্ছে করলো না আর।
ঘুমাক।



------------
১। ডোনেশানের জন্যে পে পাল একাউন্ট
২। আরো কিছু ছবি
৩। আরো লেখা

শুক্রবার, জুন ০১, ২০০৭

আইনস্টাইন কোট অব দ্য ডে-


গুগলের হোমপেজের আইডিয়াটা আমার খুবই পছন্দ হয়েছে।
যদিও এরকমটা প্রথম শুরু করেছিলাম পেজফ্লেক্স দিয়ে, কিন্তু একইসাথে জিমেইল, অর্কুট, ব্লগস্পট, গুগলটক, গুগল-বুকমার্ক এবং সর্বশেষ গুগল-রিডার ব্যবহার শুরু করায় ওটা ছেড়ে দিলাম। এখন শর্টকাটের যুগ, এক লগইনে যদি সব হয়ে যায়, তাহলে কেই বা যাবে আরেকটা নতুন সাইট ওপেন করতে? তাছাড়া গুগলের প্রতি খানিকটা দূর্বলতা তো আছেই।
গুগলের হোমপেজে দারুন সব টুলস বসানো যাচ্ছে। আমি মোটামুটি মুগ্ধ সেসবে। প্রথম খেলনা পাওয়ার পর বাচ্চারা যেমন করে খেলে, আমি সেরকম করে সময় কাটাচ্ছি।
উপরের ছবিটা পেলাম 'আর্ট অব দ্য ডে' থেকে। একই পাতায় গ্যারফিল্ডের কার্টুন পড়তে পারছি, আছে ক্যালভিন ও হবস! আমি পাংখা!
অর্কুট বলছে, আজ আমি নতুন কিছু কাপড়চোপড় পেতে যাচ্ছি! যদিও তেমন কোন লক্ষণ নেই এখনো।
তবে সবচে' মজা পেয়েছি আজকের 'আইন্সটাইন কোট' পড়ে। বলছে- 'মানুষের প্রেমে পড়ার জন্যে মাধ্যাকর্ষন শক্তি দায়ী নয়!' হা হা হা!
জটিল! জয়তু গুগল!



বৃহস্পতিবার, মে ৩১, ২০০৭

লোপা এলেন, লোপা গেলেন-



কিন্তু যাবার আগে জয় করতে পারলেন কি না, সেটা আমি বাদে অডিটরিয়মে উপস্থিত বাকি সব দর্শক শ্রোতারা জানেন।
আমি জানি না, কারণ বহু আগেই তিনি আমাকে জয় করে ফেলেছেন। অন্য সবাই যখন তাই ফুলগুলো বুকপকেটে লুকিয়ে এনেছিলো, যদি পছন্দ হয়, তবেই তাঁকে পরাবেন ভেবে, আমি তখন ঢাকঢোল সহ লাল গালিচা নিয়ে উপস্থিত সেখানে!
তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক থাকতে পারি নি শুনে। বাকি সবার সাথে তাই প্রায়শই চেঁচিয়ে উঠেছি, আরেকবার হবে, ওয়ান মোর!
তো গাইলেন লোপামুদ্রা, পুরো শরীর আর মন দিয়ে, আমিও দেখলাম তাঁকে, শুনলাম মাত্র পনের গজ সামনে বসে। পনের গজ অনেক দূর ভাবছেন নাকি? উঁহু, ভুলে যাবেন না, ক্রিকেট পিচের দৈর্ঘ্যও মিনিমাম বাইশ গজ। তারই দু'প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুই ব্যাটসম্যানের মধ্যে কতই না আন্ডারস্ট্যান্ডিং! পনের তার চেয়ে কম হলো না?!?
মেলবোর্ণের মূল শহর থেকে দূরে, কোন একটা খটোমটো নামের অডিটরিয়ামে দাঁড়িয়ে, তিনি সর্বমোট বিশ বা বাইশটি গান গাইলেন। গানের পছন্দগুলো এলোমেলো ছিল না। সেটা বুঝলাম যখন দর্শকদের নিজস্ব পছন্দ জানবার পরেও তিনি পুরোটা সময়েই তাঁর মত করে নিজের সিরিয়ালেই গান গাইলেন। এর ফলে যেটা হলো, সারাক্ষণই একটা উত্তেজনা ছিলো- এর পরে কোনটা গাইবেন!
পছন্দের প্রায় সব গানই গাইলেন, যাও পাখি, আমার দেশ, হল্লা রাজা...। অসাধারণ কিছু রবীন্দ্রসঙীতও গাইলেন তিনি- গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ, আমারো পরাণ যাহা চায়...।
বেণীমাধব গাইলেন অনেক পরে। আর জানালেন, লোপামুদ্রা আর বেণীমাধব আলাদা কেউ নয়, একসময় লোকে লোপামুদ্রাকে চিনতো না, চিনতো বেণীমাধবকেই।
তবে নিজের গান বাছাই করতে গিয়ে পপুলারিটি দেখেন নি তিনি। বেশ কিছু স্বল্পপরিচিত গানও গেয়েছেন। যে কোন কনসার্ট বা এ জাতীয় অনুষ্ঠানে এ ব্যাপারটা একটু রিস্কি হয়ে দাঁড়ায়, শ্রোতাদের মনোযোগ হারানোর একটা আশংকা থাকে, কিন্তু লোপামুদ্রা দিব্যি উৎরে গেলেন!
বেশ মজা করতে পারেন তিনি। দর্শকদের সাথে কথা বলছিলেন গানের ফাঁকে ফাঁকে। পাশে দাঁড়িয়ে গীটার বাজানো ওঁর স্বামী জয় সরকারকে গান গাইবার অনুরোধ করতেই চটুল গলায় বলে উঠলেন-, কেন বলুনতো? আমি একটু গান গেয়ে পেট চালাই, এটা আপনারা চান না বুঝি!
তারচেয়ে জমলো যখন একজন প্রবীণ ভদ্রলোক জিজ্ঞেস, ' নজরুল গীতির কি অবস্থা?'' লোপা কাঁচুমাচু মুখ করে জানালেন, ' অবস্থা তো বেশি ভালো না!'' সবার সে কি হো হো হাসি!
দর্শকদের অনুরোধ ছিলো অনেক, সেকারণেই তার বেশিরভাগই গাইলেন না তিনি। এমনিতে এ রকম জায়গায় আমি চুপ মেরেই থাকি, তবু সেদিন জড়তা ভেঙে গলায় অনেকটুকু জোর এনে বেশ কয়েকবার জানান দিয়েছিলাম আমার পছন্দ- ' সহে না যাতনা' শুনতে চাই। তিনি সেটা শুনেওছিলেন, বুঝলাম যখন কথাটা পুনরাবৃত্তি করলেন, কিন্তু শেষমেষ লোপা গাইলেন না সেটা! যদিও শুধু এই গানটা শুনবার জন্যে কাজ বাদ দিয়ে দেড় ঘন্টা ড্রাইভ করে অনুষ্ঠানে এসেছিলাম বলা যায়!
প্রায় তিন ঘন্টার এক জাদুকরী মুগ্ধতার পরে অনুষ্ঠান শেষ হলো। কেন শেষ হলো, এই অনুযোগটা যে কার কাছে করবো বুঝতে পারছিলাম না!
লোপা নেমে এলেন মঞ্চ থেকে। অনেকেই এগিয়ে গিয়ে কথা বললেন তাঁর সাথে। সুন্দর হেসে জবাব দিলেন সবার কথার। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো, কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে জড়তা কাটছিলো না।
তবু শেষমেষ এগিয়ে গেলাম। বেশ খানিকক্ষণ দোনমনার পরে শুধু বললাম, ''খুব ভাল লাগলো।'' তিনি হাসলেন। ''সহেনা যাতনা গাইলেন না কেন?'' শুধু এটুকুই বলতে পারলাম। তিনি বললেন, ''আসলে অনেকগুলো রবীন্দ্রসঙীতের অনুরোধ ছিলো, সব কি আর গাওয়া যায়! ''
''তা যায়না, কিন্তু এ গানটা আপনার চেয়ে ভাল আর কেউ গাইতে পারে না যে! '' নাহ, মুখ ফুটে বলতে পারি নি সেটা। মনে মনেই বললাম শুধু।
তার পর কয়েক সেকেন্ড বিরতির পরে 'ভাল থাকবেন' বলে চলে এলাম।
ঐ কয়েক সেকেন্ড কেউ কোন কথা বলি নি। কেন বলি নি, সেটা নিয়ে আজ অনেকক্ষণ ভাবতেই মনে হলো, আসলে এরকমই হয়, দু'জন গ্রেট মানুষ এরকম সামনা সামনি এলে কথা হারিয়ে ফেলতেই পারে!
এ আর নতুন কি! :-))


বুধবার, মে ৩০, ২০০৭

গলাগলি আর গালাগালি-


গলাগলি আর গালাগালি।
না না। ইহারা দুই ভাতৃদ্বয় নহেন। সেরম কিছু হইবার সম্ভাবনা কস্মিনকালেও নাই, তবে এই নামে দুইখানা নৌকার স্যাংশান হইবে বলিয়া শুনিয়াছি।
বাজারে গিয়া দেখিলাম সেই নিমিত্তে জোরে শোরে বৃক্ষ কর্তন চলিতেছে। আমি সব দেখিয়া শুনিয়া খুঁজিয়া পাতিয়া তিনখানা জবরদস্ত পেরেক কিনিয়া আনিলাম।
দুইখানার যে কোন এক নৌকায় উঠিতেই হইবে, এমনটা আমার বোধ হইলো না। থাকুক তাহারা তাহাদের বৃহৎ তরণী লইয়া। আমি ক্ষুদ্র মনিষ্যি, কাহারো বোঝা বাড়াইতে চাহি না।
আমি তাই আরামসে পেরেক ঠুকিয়া ঠুকিয়া আমার পুরানা ডিঙিখানা বেশ অনেকখানি সময় লইয়া মেরামত করিলাম।
অতঃপর তাহাতেই চড়িয়া বসিয়া একেলা মাঝি নদী বাহিয়া যাই,
কেউ শুনে বা না শুনে বেসুরা গলায় দেশেরই গান গাই!

শনিবার, মে ২৬, ২০০৭

ব্লগের আবার জাত কীয়ের-


কথাটা শুনতে ভাল শোনায়, কিন্তু বাস্তব তার উল্টা। সকল ব্লগ মূলত ভাই ভাই নয়। দুঃখজনক ভাবে ব্লগীয় উম্মাহ নামে কোন বৃত্তের অস্তিত্বও নেই, যার বাউন্ডারির ভেতরে 'সব ব্লগই সমান' স্লোগান নিয়ে ব্লগেরা বেঁচে থাকবে।
ব্লগের ভেতর খুব স্পষ্টভাবেই জাতপাত বিদ্যমান। ভাল ব্লগ বা খারাপ ব্লগ বলছি না। লেখার মানের উপর নির্ভর করে যে বিভাজন, সেটা হবেই, ভালো মানুষ বা খারাপ মানুষের মতন। আমি বলছি উঁচু জাতের ব্লগ, আর নীচু জাতের ব্লগের কথা, আশরাফ আর আতরাফ ব্লগ।
বাংলাদেশী ব্লগারদের কথা যদি ধরি, তাহলে সবচেয়ে উঁচু জাতের ব্লগার হলেন তারা যারা ইংলিশে ব্লগান। আন্তর্জাতিকতার বিবেচনা করলে অবশ্য ঠিকই আছে, সবচেয়ে বেশি ব্লগারদের কাছে পৌঁছবার জন্যে ইংলিশই ভালো। সুতরাং ইংরেজি ব্লগারদের জাত উঁচু হয়ে যাওয়াটায় কারো কোন হাত নেই। বাংলা ব্লগাররা তাই দূর থেকে ঈর্ষান্বিত চোখে তাদের দিকে তাকানো ছাড়া বেশি কিছু করতে পারবেন না।
জাত-পাত আছে বাংলা ব্লগগুলোর মধ্যেও।
এ ক্ষেত্রে উঁচু জাত হচ্ছে- যারা খানিকটা গম্ভীর বিষয়ে লিখেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি - এইসব ব্যাপারগুলো নিয়ে। অপেক্ষাকৃত মাঝারি জাতে পড়েন টেকনিক্যাল বিষয়ে ব্লগিং করেন যারা, মানে ভাইটিদের যারা আইটি শেখানোর অপচেষ্টা চালান। আর একেবারে নীচু জাতে পড়েন সেইসব ব্লগাররা, যারা ওয়েবলগ লিখেন। বুঝাতে পারলাম? মানে কি খাইলাম কি করলাম, অথবা আজকের আকাশ কেবলই কর্দমাক্ত, এই সব হাবিজাবি মনের কথা লিখেন যারা।
কবিতা বা গল্প লেখকরা আদৌ কোন জাতে পড়েন কি না, সেই বিষয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ আছে!

এই জাত্যাভিমান চিরস্থায়ী কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ, তবে উত্তর আপাতত 'হ্যা'। আমাদের সামাজিক মানসিকতাটুকু আমরা পকেটে লুকিয়ে ব্লগে আসি না, তাই এখানেও সেই একই রকম দৃষ্টিভঙ্গী আসাটাই 'স্বাভাবিক'।
এই জাত-বিজাতের ভাল মন্দ বলেও সুস্পষ্ট কোন আউটপুট আসলে নেই। এটা কেবলই আমাদের মনে হওয়া, উঁচু জাতের ব্লগাররা এইসব ভেবে মানসিক আনন্দ লাভ করতে পারেন, আর নীচু জাতের ব্লগাররা এটা টের পেয়ে 'কী আসে যায়' টাইপ একটা ভাব মেরে সময় কাটিয়ে দিতে পারেন।
কারো লাভ বা ক্ষতি বৃদ্ধি তাতে হচ্ছে বলে মনে হয় না।

সুতরাং বহু প্রাচীণ কাল পূর্বে কবি যদিও বলেছিলেন, নহে আশরাফ আছে শুধু যার বংশ পরিচয়, বেচারা কবি জানতেন না, মানবসমাজ তো বটেই, এমনকি ব্লগসমাজেও তার এই কবিতা খুব বেশি পাত্তা পাবে না। জাত-পাতের ব্যবধান সেখানেও সগর্বে রয়ে যাবে!


------------
ডিসক্লেইমারঃ
১। এতক্ষণ যা কিছু হাবি জাবি বললাম, বলাই বাহুল্য এটা আমার মনের কথা নয়। সম্প্রতি ব্লগ বিষয়ক নানা জ্ঞানী ব্যক্তিদের আলোচনা-সমালোচনা পড়ে আমার এইরূপ ধারণা হলো, তাই মনে হলো এই বিষয়ে ভুল-ভাল বকে পোষ্টের সংখ্যা আরো একটা বাড়াই।
২। এই পোষ্টের নামের জন্যে চোর-এর প্রোফাইলের কাছে শতভাগ ঋণী, তার কাছে তাই অসীম কৃতজ্ঞতা!

শুক্রবার, মে ২৫, ২০০৭

হেলাল হাফিজঃ বাইসাইকেল থিফঃ ভ্যালেরি এ টেইলর




প্রায়শই নির্জনে বসে ভাবি, সম্ভবত আমার ভেতরে কোথাও নীরবে নিভৃতে একজন হেলাল হাফিজ বাস করেন। অথবা হয়তো আমার নয়, আমাদের সবারই, আমাদের মানে-, আমরা যারা কবিতা ভাবি, হয়ত বা লিখি না সবসময় কিন্তু কবিতায়ই বসবাস করি। সেই কবিতাজীবি আমাদের সবার ভেতরেই আছেন একজন হেলাল হাফিজ।
একজন প্রেমিক ও সৈনিক হেলাল হাফিজ, যিনি সভ্যতাকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করেন, 'অশ্লীল সভ্যতা, নিউট্রন বোমা বোঝ, মানুষ বোঝ না!' যিনি আমাদের কানে কানে মন্ত্র পড়ে শোনান, 'এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।' আবার তিনিই যখন হাতের পাঁচটি আঙুলকে নিরাশ্রয়ীর ছদ্মবেশ দিয়ে প্রিয়তমাকে স্পর্শ করার ষড়যন্ত্র করেন, আমরা পুলকিত হই। জলের আগুনে জ্বলে পুড়েন যিনি, সেই হেলাল হাফিজ যখন লিখেন-
'মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক হবে
এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো
আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ
শুধু যদি নারীকে সাজাই। ''

-আমি তখন মুগ্ধ হয়ে পড়ি। প্রায় নিরুপদ্রব জীবনের কোন এক অবসর মুহূর্তে যখন আমি এ কবিতাটি পড়ি, মাথার ভেতরে কিছু ভাবনা কিলবিল করে ওঠে। ঠিক এমন করে জীবন পার করে দেয়াটা উচিৎ হচ্ছে কি? আমার তো একটা কিছু করার কথা ছিলো।
মানব জন্মের নামে আমারও কলঙ্ক হচ্ছে না তো?

------------------------------

প্রায় বছরকয়েক আগে, সম্ভবত গ্যোথে ইনস্টিটিউটের কোন এক হল রূমে বসে, ঢাবি-র চলচ্চিত্র পরিষদের সদস্য হিসেবে দেখছিলাম 'বাইসাইকেল থিফ' সিনেমাটি।
সাদাকালো সিনেমা, অনেক বছর আগের, প্রিন্ট ভাল ছিল না তবু তারই ফাঁকফোকরে একজন অভাবী বাবা ও তাঁর সন্তানের আকুতি পড়তে একটুও অসুবিধে হয় নি। বেকার বাবা অবশেষে চাকরি পায়। শহরের দেয়ালে দেয়ালে পোষ্টার লাগাতে হবে তাকে। কিছুই প্রয়োজন নেই, শুধু দরকার একটা বাইসাইকেল। পরিবারের সম্বল বিক্রি করে সেটা সে কিনেও ফেলে। কিন্তু কাজের প্রথম দিনেই সেটা চুরি হয়ে যায়। তারপরে পিতা পুত্র বিষন্ন চেহারায় ঘুরে ফিরে এখানে সেখানে। আবারো অনাহারের দুশ্চিন্তা মাথায় তাদের।
ঠিক এমনি সময়ে তারা দেখে অনেকগুলো সাইকেল একসাথে রাখা, সম্ভবত কোন অফিস ছিলো সেটা, অথবা রেস্তোরাঁ, ভুলে গেছি। খানিকটা দোনোমনা করে বাবা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, এখান থেকে একটা সাইকেল চুরি করবে সে, করতেই হবে। কিন্তু সাইকেল চুরি করে নিয়ে দৌড় শুরু করতেই ধরা পড়ে যায় সে! চারপাশের লোকেরা ছুটে আসে, ছেলের সামনেই চলে নির্দয় প্রহার! প্রচন্ড আক্রোশে তারা মারতে থাকে ধরা পড়া সাইকেল চোরকে।
সিনেমাটা বোধহয় এখানেই শেষ হয়েছিল। ভাল মনে নেই। তবে মনে আছে, শেষ হবার পরেও বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তি ঘুরপাক খাচ্ছিলো যেন। অনেকক্ষণ, কি যে সেটা বুঝতে পারছিলাম না, শুধু মনে হচ্ছিলো, এক্ষুণি একটা কিছু করা দরকার আমার! ঠিক এক্ষুণি!
ছবি শেষের ঘোর কাটবার আগেই মাইক হাতে উঠে এলো সহপাঠী আশা, মৃদু স্বরে বললো, 'আমি জানি, এ ছবি দেখার পরে আমাদের সবার ভেতরে একটা প্রচন্ড ইচ্ছা জাগছে...।' আর, তখুনি, আশা বলে দিতেই, আমি চমকে উঠে ভাবি, তাইতো! আমার তো সত্যিই এখন ইচ্ছে করছে এক ছুটে বেরিয়ে গিয়ে কোথাও থেকে একটা সাইকেল চুরি করে আনি! ঠিক এক্ষুণি!

-----------------------------

আজ অনেকদিন পরে আবার সেই অনুভূতি ফিরে এলো মনে।
অলস বিকেলে সময় কাটাতেই ব্লগে ঢুকলাম। তারপরে এক এক করে পড়লাম ভ্যালেরিকে নিয়ে লেখা জেবতিক আরিফের পোষ্ট, আগেই পড়া ছিলো, তবু আবারো পড়লাম জানালা-র পোষ্টটাও।
আর তারপর থেকেই আমার বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তি দানা বেঁধে আছে। কেবলই মনে হচ্ছে, একটা কিছু করা দরকার আমার, আমাদের সবার। কি সেটা জানি না, বুঝে উঠতেও পারছি না ভাল করে, শুধু বুকের গভীরে কোথাও মনে হচ্ছে, উত্তর পুরুষে আমরাও ভীরু কাপুরুষের উপমা হচ্ছি না তো?

....................
সম্পর্কিত আরো কিছু লিংকঃ
১। সাপ্তাহিক ২০০০ এর রিপোর্ট।
২। সি আর পি ওয়েবসাইট।
৩। জেবতিক আরিফের পোষ্ট
৪। জানালা-র পোষ্ট।


যদি আপনি হন এ প্রজন্মেরই কেউ-

যদি হন আপনি, এ প্রজন্মেরই কেউ, আর প্রায় অবুঝ চেহারা নিয়ে যদি আপনি, প্রায়শই বলে ওঠেন-'' না তো, জন্মযুদ্ধ দেখি নি আমি, জানি না তো কি হয়েছিলো তখন; কে বা কারা, কি করেছিলো!''

আমরা- বোকাসোকা কিছু মানুষ-, যদি তখন, আদর করে গল্প শোনাই আপনাকে-, কেমন করে অনেক অনেক দিন ধরে আমাদের মায়েদের অশ্রু ভিজিয়েছিলো এ মাটি; অথবা, কেমন করে আমাদের ভাইয়েদের রক্তে এ সবুজ পতাকা হয়েছিলো লাল; কেমন করে তিরিশ লক্ষ বোকা মানুষ, মৃত্যুর বিনিময়ে এনে দিয়েছিলো স্বাধীনতা...।

সব দেখে এবং শুনে, এইবার, খানিকটা বুঝদার চেহারার আপনি যদি বলেন, ' হুমম, কিন্তু সংখ্যাটা যে শুনেছিলাম- তিন লক্ষ! আর মুজিব, হু হু, তিনি কিন্তু স্বাধীনতা চান নি, আপনারা জানেন না?''

অথবা, যদি বলে ওঠেন, ' গোলাম আযম- তিনি তো অপরাধী নন, আর রাজাকারেরা, ভেবে দেখুন, তারা তো নিজের দেশ ভাংতে চায় নি শুধু, ওরাইতো সাচ্চা দেশ প্রেমিক!''

আমরা- বোকাসোকা কিছু মানুষেরা-, একটুও না রেগে তখন, অনেকগুলো বধ্যভূমি খুঁজে, গুনে গুনে ... হয়ত আপনার হাতে তুলে এনে দিবো তিরিশ লক্ষ মৃতের তালিকা। হয়ত কোন সন্তানহারা মা, আপনাকে বলে যাবে হত্যাকারী অগণিত রাজাকারের নাম...।

তবু, হ্যা, তবুও যদি আপনি বলেন, '' থাক না..., এত বছর বাদে, কেনই বা এসবের টানাটানি, আসুন তারচেয়ে, কাঁধ মিলিয়ে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই, ভাইয়েরা আসুন আমরা, কাতার সোজা করে দাঁড়াই। ''

একটুও না রেগে, বিশ্বাস করুন, কাতার ভেঙ্গে, বাবার কফিন বয়ে ভারী হয়ে ওঠা আমাদের কাঁধ টেনে নিয়ে এসে, আমরা- কিছু বোকা মানুষেরা, প্রায় একবারও আপনাকে 'ছাগল' না ডেকে, আয়নাটা নিয়ে এসে আপনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবো, ' ভালো করে দেখুনতো চেয়ে, মাথার উপরে দু'খানা বাঁকানো শিং দেখা যায় কি না আপনার, অথবা চারখানি লিকলিকে ছাগুলে ঠ্যাং? ''

অথবা, হয়তো, কে জানে, আমরা, আপনাকে শুধু, রোজ সকালে এক হাঁড়ি ভাতের মাড়, আর এক মুঠো লবণ মিশিয়ে, ভর পেট খেতে বলবো।
না না, স্যালাইন ভেবে নয়।

আমাদের পূর্বপূরুষদের দেখেছি- গোয়ালে বেঁধে রাখা অকাট বলদগুলোকে তাঁরা-
এভাবেই খাবার খাওয়াতেন।।

রবিবার, মে ২০, ২০০৭

আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন-


কদিন ধরেই এ শহরে তুমুল বৃষ্টি! দিন নেই রাত নেই সারাক্ষণ ঝুম ঝুম ঝুম।
দেশে হলে এর মাঝেই দৌড়ে নেমে যেতাম ভিজতে। কিন্তু এখানে, আমার ভাল লাগে না। দু'একবার যে চেষ্টা করি নি তা নয়। কিন্তু, দেশে যেমন, আকাশ থেকে একগাদা দূষিত রাসায়নিকের সাথে সাথে ভালোবাসাও ঝরে পড়ে বৃষ্টি হয়ে, এখানে একেবারেই তা নয়। উলটো কেমন গা বাঁচিয়ে চলতে ইচ্ছে করে আমার বৃষ্টি দেখলেই।

কিন্তু, সম্ভবত আমি বাদে, মেলবোর্ণের সবাই খুবই খুশি। মাত্র ক'দিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম, রিজার্ভয়ারে পানির পরিমাণ গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন সীমায় গিয়ে ঠেকেছে। কাঠা ফাটা রোদে কোন একটা চাষী জমির ছবি দিয়েছিলো তার সাথে, ঠিক যেন আশী বছরের কোন বুড়োর কুচকানো গালের চামড়া! দেখলেই শিউরে উঠতে হয়!
এ শহরের সবাই কিছুদিনের জন্যে তাই চাতক পাখীর সঙী হয়ে উঠেছিলো। সৌভাগ্যবান চাতক, এতগুলো মানুষের কল্যানে অবশেষে তারও অদৃষ্টে জল এলো!
এ কয়দিনের রিমঝিমের পরে আজকের পত্রিকায় তাই অন্যরকম ছবি! মাঠের মাঝে খেলছে ছোট্ট এক কৃষক কন্যা, তার বাবার সাথে। কি যে ভাল লাগলো দেখে!

মাঝের পাতায় আরেকটা ছোট্ট ছেলের ছবি ছাপা হয়েছে। রেইনকোট গায়ে হাসিমুখে খেলছে সে বৃষ্টিতে। প্রথম বৃষ্টি দেখে সে নাকি অবাক হয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলো-, ''মাম, হু টার্নড দ্য শাওয়ার অন? ''

এইটুকু পড়ে হেসে ফেলতেই এ বছরের বৃষ্টিকে আমারও ভালো লাগা শুরু হলো।

সোমবার, মে ১৪, ২০০৭

বিবাহনামা-

[ বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এই পোষ্ট কেবলমাত্র বিবাহিতদের জন্যে। যুবক ও অবিবাহিত ভাইয়েরা শত হস্ত দূরে থাকুন। তবে... কথা আছে, সদ্য বিবাহিতরা পড়িতে পারেন। আপনাদের জন্যে জরুরী অবস্থা আপাতত শিথিল:-) ]

জানুয়ারির কোন এক রাত। সদ্য দেশ থেকে ফিরেছি, বিবাহ করে মোটামুটি যুদ্ধ জয়ী সেনাপতির মতন নূরানী হাসি সারাক্ষণ আমার চোখে মুখে। কারো সাথে দেখা হলেই খানিক কথাবার্তার পর পেটের মধ্যে ভুটভাট শুরু হয়ে যায়, কেবলই উশখুশ করতে থাকি কি করে নিজের বিয়ের গল্প বলা যায়। হাওয়া অনুকূল দেখলে শেষ মেষ গলা খাঁকারী দিয়ে বলেই ফেলি, ' তা শুনেছেন নাকি, কাহিনি তো একটা ঘটিয়ে ফেলেছি!' শ্রোতা তখন আগ্রহী হয়ে বলেন, তাই নাকি? কি করেছেন?
আমি তখন প্রসন্ন হাসি দিয়ে বলি, 'আর বইলেন না, বিয়ে করে ফেলছি!'
তারপরে শুরু হয় আমার প্যাচাল। এর আগে বহুবার বলে বলে আমি যেটাতে বিশাল দক্ষতা অর্জন করে বসে আছি। আমার সেই প্রাঞ্জল বর্ণনায় শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে যান, আমিও গল্প শেষে আয়েসী ভঙ্গিতে একটা ঢেকুর তুলি।

তো, তেমনি একদিন, আলাপের কেউ নেই, তাই ইয়াহু চ্যাটে লগইন করে বসে আছি, এমন সময়ে অনলাইনে এলো আমার কলেজের এক বছরের জুনিয়ার এক ছোট ভাই। ও কানাডায় থাকে, অনেকদিন ধরে, পড়ছে, প্রেম করে ইউএস এ থাকা এক মেয়ের সাথে।
আমি তো তারে দেখে মহা খুশি। নক করে নানা কথা বার্তা বললাম, তারপরে আস্তে ধীরে রসিয়ে রসিয়ে বললাম, 'তা, শুনছো নাকি? কান্ড তো একটা ঘটাইয়া ফেলছি!'
সেই ছোট ভাই আমাকে বলে, 'আপনেরটা পরে শুনমু, আমি যে একটা কান্ড ঘটাইছি সেইটা জানেন নাকি?'
আমি একটু থমকে গেলাম। আলাপটা এগোলনা! :-(
জিজ্ঞেস করলাম, 'তাই নাকি? কি করছো?'
ও অতি উৎসাহে বলে, 'আর বইলেন না ভাই, লাস্ট সামারে ইউ এস গেছিলাম, ঐখানে গিয়া তো ওরে বিয়া করে ফেলছি!'
আমি চুপসে গেলাম। বলে কি! এইটা তো দেখি আমার চেয়ে বড় কাহিনি! বললাম, 'খাইসে! গ্রেট ব্যাপার! কেমনে কি হইলো?'
ও খুব মজাসে নিজের কাহিনি বলা শুরু করলো। মেয়ের বাবা কেমন করে বাগড়া দিচ্ছিলো প্রেমে, কিন্তু কেমন করে সে মা-কে ম্যানেজ করে তাদের বাসায় হাজির হয়। অতঃপর ওখানে একা একাই পুরা ফ্যামিলিকে ম্যানেজ করে বিয়ে করে ফেলে!
আমি নিজের কাহিনি গেলাম ভুলে, ওর কাহিনি শুনে নিজেই টাসকি খেয়ে বসে আছি! বলি, 'ভাল ভাল, খুব ভাল। এখন কি অবস্থা? কেমন আছো?'
ও বলে, 'এখন কঠিন অবস্থা! খুব মজা করছি দুইজনে। ক্যান ইউ ইমাজিন ম্যান দুইজনে টানা দুই সপ্তাহ একসাথে ছিলাম! এক রুমে!'

আমি একটু গলা খাঁকারি দিলাম। ছেলে বলে কি! তারপরে আমতা আমতা করে বলি, 'না না, তাতো হবেই। বিয়ে করছো..., এখন তো একসাথেই...।'
কীয়ের কি! আমারে পাত্তাই দিলো না। এক নাগাড়ে বলতে থাকলো, 'এখন বস ভাল কইরা আপনার লাইগা দোয়া করেন!'
আমার তো জান শুকিয়ে গেলো! ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ক্যান, আমি আবার কি করলাম!?'
ও মুহাহাহা টাইপ একটা ভিলেনের হাসি দিয়া কইলো, 'আরে না, আপনে কি করবেন? করছি তো আমি! এখন মনে প্রাণে দোয়া করেন এত অল্প বয়সে আপনি আবার চাচা-কাকা না হইয়া যান!'

আমি বিরাট এক ঢোঁক গিললাম। আস্তে ধীরে লিখতে থাকলাম, 'ছি ছি, তোমরা আজকালকার বৈজ্ঞানিক যুগের পোলাপান, কী সব যে বলো না... ।'
ওর উচ্ছাসের ঠেলায় আমার এইসব কথাবার্তা মেসেঞ্জারের কোন চিপায় যে হারাইয়া গেলো, পরবর্তী কয়েক দিবস-রজনীও তাহাদের খুঁজিয়া পাইলাম না!

রবিবার, মে ১৩, ২০০৭

দূরালাপনী-

কাল কি জানি কি হলো, রাতে ঘুমুবার আগে খু-উ-ব মন কেমন করে উঠলো!
বালিশের তলায়, বিছানার নীচে- আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজি, কিন্তু কোথাও পেলাম না আমার কেন মন খারাপ!
বাইরের মাঠে, ঘাসের ডগার আড়ালেও খুঁজলাম অনেকক্ষণ। কি মুশকিল! সেখানেও নেই নেই নেই।
মুখ তুলে তাকাতেই দেখি ঘাসফড়িং, তাঁকে দেখে যেই না লুকাবো, ও মা, সে দেখি আমার দিকে চেয়ে ফিক ফিক হাসে! আমি তার ডানা ধার নিয়ে উড়ে উড়ে উড়ে সো-জা- মেঘের ওপরে! ওখান থেকে উঁকি দিয়ে দেখি, না তো, সেই নদীটার গায়েও লেখা নেই কেন আমার মন খারাপ।
এমনকি ওই বদমাশ পাহাড়টাও জানে না!
আমি ধ্যুত্তোরি বলে রাগ দেখালাম। তারপরে রংধনু বেয়ে নেমে এলাম ঘরের ভেতর। বিছানার কাছটায় এসে মনে পড়লো- আরে, চাঁদকে তো জিজ্ঞেস করি নি! জানালা খুলে যেই না ডাকতে যাবো, ওমনি ব্যাটা আমার ঘরে এসে হাজির। আর কি নির্লজ্জ! বসলো গিয়ে ঠিক তোর মাথার কাছটাতে। আমি চোখ রাঙিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলি, চুপ! শব্দ কোরো না! ঘুমাচ্ছে তো! তারপর জোছনার আলো সরিয়ে চাদরটা তোর গায়ে টেনে দিতে দিতে হঠাৎই মনে পড়লো, তাই তো! কাল যে তুই আমাকে গুড নাইট না বলেই ঘুমিয়ে গেলি!
আমার মন খারাপ হবে না বল?

বুধবার, মে ০৯, ২০০৭

রঙীন 'একটি ফুলে দুইটি ভ্রমর'-


সোজা সাপ্টা কাহিনি। দুই নায়ক, এক নায়িকা। নায়কদের একজনের বাবা নিজে নিজে খুন হন, ঘটনাচক্রে সন্দেহ গিয়ে পড়ে মূল নায়কের উপর। এদিকে নায়ক নায়িকার মাঝখানে চলে আসে আরেক প্রায়-নায়িকা। আমাদের নায়ক লোকসম্মুখে চুমু খান সেই নবাগতা নায়িকাকে- তাও আবার অনেককাল আগে মূল নায়িকাকে যেই ইশটাইলে খান, ঠিক সেই ইশটাইলে। এই না দেখে নায়িকার অভিমান ভেঙে পড়ে। ওদিকে বাবার খুনী সন্দেহ করায় নায়কদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। কাহিনিতে চলে আসেন ভিলেন। সেই কিন্তু আবার ভালো মানুষ, পুরোপুরি ভিলেন না। মেয়ের চিকিৎসার খরচ তোলার জন্যে তিনি ভিলেনের রোল করছেন।
তো এইরকম গোলমালের মাঝখানে সিনেমার শেষপ্রান্ত হাজির হয়ে যায়। নায়িকাকে কিডন্যাপ করে ফেলে ভালো মানুষ-ভিলেন, আর সহযোগী ভিলেন। ওখানে তুমুল মারামারি, নিজেদের মধ্যকার ভুল বুঝাবুঝি ভেঙে দুই নায়ক 'বুকে বুক মিলিয়ে' যুদ্ধ করে ভিলেনদের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যায়ে ভিলেন ছুরি হাতে এগিয়ে আসে নায়ককে মারতে, আর বন্ধুকে বাঁচাতে সেই ছুরির সামনে পিঠ পেতে দেন অন্য নায়ক। লাভের মধ্যে লাভ- নায়িকার কোলে মাথা রেখে মৃত্যু হয় তাঁর। শেষমেষ নায়ক নায়িকার মিলন ঘটে। সিনেমারও শেষ হয়।
এতক্ষণের কাহিনি পড়ে যদি ভাবেন, এই সিনেমার নাম রঙীন একটি ফুলে দুইটি ভ্রমর, তবে পাঠক, আপনার দোষ দিব না। বিশ্বাস করুন- সিনেমার শুরুতে যদি স্ক্রীনে না দেখাতো, তারচেয়ে বড় কথা- সাথের টিকেটের গায়ে যদি স্পষ্টাক্ষরে লেখা না থাকতো- আমি বিশ্বাসই করতাম না এই মাত্র যেই ছবিটা দেখলাম, সেটার নাম- স্পাইডার ম্যান-থ্রি!
হায়, সেলুকাস! হলিউডের পরিচালকেরা যে ইদানীং মনোযোগ দিয়ে বাংলা সিনেমা দেখা শুরু করেছেন, সিনেমার শেষে ক্রেডিট ডিসপ্লেতে এই তথ্যটাও যোগ করা দরকার ছিলো।
যারা এখনো দেখেন নি, তারা বেঁচে গেছেন। আর যারা বাঁচতে পারেন নি,আসেন ভাইয়েরা, আমরা গলা ছাইড়া কান্দি! :-((