শনিবার, জানুয়ারী ২৭, ২০০৭

নাটকের গান

যখন শুধু একটাই চ্যানেল ছিলো, সবেধন নীলমণি আমাদের বিটিভি, তখন অখন্ড মনোযোগে সেটায় প্রাচারিত প্রায় সব নাটকই দেখা হতো। এখনো ভালো নাটক নিয়ে কথা বলতে চাইলে বুড়ো মানুষদের মতো স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি, একে একে মনে আসে ছোটবেলায় দেখা নাটকগুলোর কথা।
আজ আনমনে ভাবতে গিয়ে অনেক আগে দেখা অনেকগুলো নাটকের বিচ্ছিন্ন কিছু দৃশ্য, সংলাপ আর গানের কথা মনে আসছিলো এক এক করে।
সংশপ্তকের ডায়ালগ মনে পড়ে, টাকা আমার চাই, নইলে জমি! মধু পাগলা, হুরমতী আর কানকাটা রমজানের কথাই বা ভুলি কেমনে?
সম্ভবত বারো রকম মানুষ নাটকের একটা বহুল প্রচলিত সংলাপ ছিলো- ছিটগ্রস্ত বালিকা। রূপনগরের খালেদ খানের মুখে- ছি ছি, তুমি এত খারাপ- সেই ছোটবেলায়ও বলতাম বন্ধুদের।
রূদ্্েরর লেখা গান- ভালো আছি ভালো থেকো- প্রথম শুনেছিলাম কোন একটা নাটকে। নাম ভুলে গেছি, কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে- শংকর সাঁওজাল ছিলেন সেই নাটকে।
নাটকের গান কথা ভাবলেই আমার সবচে বেশি মনে পড়ে অয়োময়ের কথা। বেশ কিছু সুন্দর গান ছিলো তাতে, যেমন,

-> আউলা চুলে নাচোরে,
বাউলা গলায় গাও,
নাচিতে নাচিতে বন্ধু-
এদিক ওদিক চাও।

এটা মনে হয় আবুল হায়াতের গলায় চিত্রিত হয়েছিলো। তাই কি?
আরো একটা গানের খন্ডাংশ মনে পড়ে-

->
আমারে লইয়া চলো রহমত চাচার বাড়িতে,
রহমত চাচা বইসা আছে আমড়া কাঠের পিড়িতে।

আরেকটা গান মনে আছে। মোবারক যখন পাখিকে গোসলের জন্যে নদীতে নিয়ে যায়, তখন একটা গান গাইছিলো-

-> দুনিয়া চলে চমৎকার,
চলে দুনিয়া চমৎকার,
আমি এই দেখি চান্দের আলো,
এই দেখি অন্ধকার।

তবে, অয়োময়ে প্রচারিত আমার সবচে পছন্দের গান হলো-
-> আসমান ভাইঙ্গা জোসনা পড়ে,
আসমান ভাই-ঙ্গা-া-া জোসনা পড়ে,
আমার ঘরে জোসনা কই?
আমার ঘরে এক হাঁটু জল পানিতে থই থই।

খুব মন খারাপ হলে, যখন নিজেকে প্রতারিত মনে হয়, অথবা অবহেলিত, নিজে নিজে এই গান গেয়ে উঠি।
আরেকটা গানের এক লাইনও আমার ভীষন প্রিয়-
“ আমার মরণ চান্নি পহর রাইতে যেন হয়...।''

নাটকের গান নিয়ে ভাবতে বসে আরেকটা গানের কথাও মনে পড়ছে- শুভ্র দেবের গাওয়া নাকি গলার গান-
-> জীবনের ছোট ছোট ঢেউ,
অভিমানে, আবেগে, নিয়ে যায় কোথায়,
জানে না কেউ। জানে না কেউ।

শুভ্র-র গান আমার খুব ভালো লাগে না। তবু মনে পড়লো দেখে লিখলাম।

আরেকটা গানও আমার খুব পছন্দের ছিলো। কোন নাটক, কার গলায় চিত্রায়িত মনে নেই, আফসানা মিমি, বা শান্তা ইসলাম হবে হয়তো, গানটা এরকম-
-> থেকে থেকে কোকিল ডাকে ,
মন যে কেমন করে লো,
চারিধারে জোসনা ঝরে,
আমি একা ঘরে লো!

অতীব চমৎকার গান। গানের শেষে, আরেকটা জটিল ডায়ালগ আছে, “আহারে, মইরা যামু গা!''

প্রশান্ত জলাশয় কত দূরে আর কত দূরে- বলে একটা গানের কথাও মনে পড়ছে খুব। এই একটা লাইনই জানি, সেটাই গুনগুনাই মাঝে মাঝে।

লিখতে লিখতে অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে- আপাতত শেষ করি আমার খুব প্রিয় একটা দৃশ্যের কথা বলে।
অয়োময় নাটকে, আবুল হায়াত তার সবচে ছোট মেয়েকে কোলে তুলে গলা জরিয়ে গান গাইছেন,
আগে চলে দাসী বান্দি
পিছে সখিনা, ও ময়না পিছে সখিনা,
তাহার মুখটা না দেখিলে, প্রাণে বাঁচতাম না!
গাওয়া শেষে কি একটা কথার পরে হায়াত পিচ্চি মেয়েটাকে বলছেন, “ জলে কুমির ডাঙ্গায় বাঘ, বলো তো মা কই যাই?''
ঐটুকুন মেয়ে চটপট করে বলে, “ বাজান, তুমি গাছে ওঠো!''

এখনো মনে পড়লে প্রাণ খুলে হেসে উঠি, জীবনের সরলতায় মন ভেজাই।

---------------!!!----------------

বউ


বউ
--------------

তোকে প্রথম ডেকেছিলাম “তুমি''-
তুই হেসে করেছিলি দুষ্টুমী-
তারপর হঠাৎ কখন “তুই'' বলে-
কত্ত কাছে এলাম দু'জন চলে।।

এখন আবার ডাক বদলের পালা-
কিন্তু ভাবি, কি বলে যে ডাকি-
আচ্ছা যদি ডাকি “বউ'' বলে-
তুই সত্যিই সায় দিবি নাকি!!


-----------------------------
ডিসক্লেইমার: যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বই মিথ্যা বলিবো না। :-)

তিতলি- ২


তিতলি-
-----------

আমি একটা স্বপ্ন আঁকি বসে,
পেন্সিলেতে- মনের ক্যানভাসে-।।
আঁকা শেষে তাকিয়ে দেখি সেথা,
কোথায় যেন কীসের অপূর্ণতা।

ঠিক তখুনি রঙের বাকসো হাতে,
তুই এসে বসলি ছবিটাতে।
রঙের ছোঁয়ায় করলি তাকে পূর্ণ,
-তুই আর আমি, এই আমাদের স্বপ্ন।


--------------------------
ডিসক্লেইমার ১: ঘটনা ও চরিত্র পুরাপুরি কাল্পনিক।
ডিসক্লেইমার ২: কাল্পনিক না হইলেই বা আপনের কি?

মঙ্গলবার, জানুয়ারী ২৩, ২০০৭

গল্পঃ সমান্তরাল


১।
মাঝে মাঝে এমন হয় যে, গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে চোখ দুটো না খুলেই যখন অন্ধকারের গায়ে কান পাতি, নিস্তব্ধ রাতের ভেতরের কোন একটা উৎস থেকে খুব মৃদু ভাবে তবলার বোলের মত শব্দ ভেসে আসতে থাকে। একটা বা দুটো আঙুল দিয়ে খুব আদুরে ভঙ্গিতে যদি বাজানো হয় - সেটা ঠিক তেরে কেটে ধিন হয় না, বদ্ধ ঘরের দরজার এপাশ থেকে ভেতরের গুম-গুম শব্দ শুনতে পেলে যেমন লাগে, অনেকটা সেরকম।
প্রথম প্রথম হৃৎপিন্ডের শব্দ ভেবে ভুল করতাম; পরে বুঝেছি, ওটা আসলে রাতেরই নিজস্ব শব্দ। দেয়ালের গায়ে অবিচল বসে থাকা টিকটিকি যেমন শুধু রাত হলেই টিকটিক করে উঠে; অথবা দেয়াল ঘড়িটা, সারাদিন চুপচাপ অবিরাম ঘুরে যায়, শুধু রাত গভীর হলেই যেন সেটাও টিকটিকির সাথে গলা মেলায়, তেমনি করে কেবল রাত হলেই যেন অন্ধকারের শব্দ শুনতে পাই আমি।
এখন যদিও বিকেল, আকাশে মেঘ তাই সন্ধ্যে বলে ভুল হয়। অবিরাম ঝিরঝির বৃষ্টি হচ্ছে- থামবার লক্ষণ নেই দেখে খানিকটা অপেক্ষা করার পর হাল্কা পায়ে দৌড়ে আমরা ক'জন প্রায় ধ্যানমগ্ন মানুষ এই গাছটার তলায় এসে আশ্রয় নিয়েছি। সামনে তাকালে কেবলই বৃষ্টি, চেয়ে থাকার কোন মানে হয় না, তবুও আমরা সবাই সেদিকে তাকিয়ে থাকি। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকায় হঠাৎ করেই বৃষ্টির ফোঁটাগুলো খুব বড় মনে হয়। আমার এমনও মনে হতে থাকে, যেন অনেক ওপর থেকে আমি বিশেষ কোন একটা ফোঁটাকে চোখে চোখে রেখে নীচে নামতে দেখছি, খানিকপর সেটা মাটিতে পড়ে ছিটকে উঠছে যেন। আমি ঠিক এমন করেই অনেক- অনেকগুলো বৃষ্টির ফোঁটাকে অনুসরণ করতে থাকি, এবং এমনটা করতে করতে যেন এর মাঝেও সেই নিস্তব্ধ রাতের তবলার বোলের শব্দের যে ছন্দ, আমি সেটা খুঁজে পাই।
আমি আনমনে, বৃষ্টি বাঁচিয়ে ঠোঁটে একটা সিগারেট গুঁজে দেই, তারপর লাইটারটা বের করার জন্যে পকেট হাতড়াই। ঠিক সেই সময় আমার বন্ধু দীপু হঠাৎ করে আমার কাঁধে হাত রাখে। কখন যে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, কোন ফাঁকে, আমি টেরই পাইনি। ওর মাথায় একটা লাল টুকটুকে রুমাল বাঁধা। আমি একটু থমকে যাই। লাইটার হাতে নিয়ে বৃষ্টি বাঁচিয়ে আমি যে মুহুর্তে আগুন ধরাই - ঠিক তখুনি গভীর পানির তলদেশ থেকে ক্রমশ বড় হতে হতে উপরে উঠতে থাকা বুদবুদের মত অনেক আগের একটা ঘটনা আমার মনে পড়ে যায়।
আমি আর দীপুই ছিলাম সেবারও। দুজনেরই বয়স তখন দশ, কিংবা এগারো হবে। ছাদের পাশের সিঁড়ির ঘরটায় গিয়ে কুড়িয়ে পাওয়া আধ-খাওয়া একটা সিগারেটের টুকরাতে আগুন ধরিয়ে টানছিলাম আমরা। একেকবার টান দেবার সাথে সাথে ঐ সিগারেটের চেয়েও বেশি লাল হয়ে উঠছিল আমাদের মুখ। কাশির দমক আটকে ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন ঘরটায় আমরা দুই কিশোর যখন অনভ্যস্ত ভঙ্গিতে একের পর এক টান দিয়ে চলেছি সিগারেটে- আর ফিসফিস করে ঠিক করছি- বন্ধুদের কাছে কেমন করে এই বীরত্বের গল্প করা যায় - ঠিক সেই মূহুর্তে বাবা এসে দরজা খুলে দাঁড়ান।
বাবাকে সেদিন শীতের কুয়াশা কেটে কেটে নদীর ওপার থেকে ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসা ডিঙি নৌকার মাঝির মত লাগছিল আমার কাছে - মনে আছে।
দীপু একটুও দেরি করেনি। ছুটে পালিয়ে গিয়েছিল ও। আর বাবা, চোখে অবাক দৃষ্টি নিয়ে আমার কাছে এসে হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে গিয়েছিলেন। তারপরে আচমকাই প্রচন্ড জোরে চড় মেরেছিলেন আমাকে। আমি ছিটকে পড়েছিলাম মেঝের ওপর। কোনো কথা না বলে তিনি নীচে নেমে গিয়েছিলেন সেদিন।
আগে পরে অনেকবারই মার খেয়েছি, কিন্তু সেদিনের কথা মনে আছে বেশ। খুব ব্যথা পেয়েছিলাম এটা ঠিক, তবু সেদিন একটুও রাগ করিনি বাবার ওপর - কারণ, বাবা আমার এই কীর্তির কথাটা মাকে কখনো বলেননি।
২।
আমার মা। প্রায় সারাটা জীবন দেখেছি তিনি বিছানায় শুয়ে আছেন। কী একটা অসুখ ছিল মায়ের - তিনি খুব বেশি নড়াচড়া করতে পারতেন না। এমন নয় যে সারাদিন কাশতেন বা খুব জ্বরে ভুগতেন- সেরকম কিছু নয়। প্রায় সুস্থ মানুষের মতনই দেখাতো তাকে। পার্থক্য এই যে তিনি বিছানা শুয়ে থাকতেন সারাদিন।
ভীষন ফর্সা ছিলো তার গায়ের রঙ- চোখ দুটো- মনে আছে- ছিল আশ্চর্য রকমের গভীর আর কালো। মা যখন মাঝে মাঝে কাছে ডাকতেন আমাকে, আমি বিছানার পাশটিতে চুপ করে বসে থাকতাম আর শুরু হত তার রাজ্যের সব গল্প। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকতাম সেসব, আর মনে মনে ভেবে যেতাম আজগুবি সব ভাবনা।
কখনো কিছু লুকোতে চাইলে মায়ের চোখের দিকে তাকাতাম না কখনো। অন্যদিকে চেয়ে থাকতাম। মা কেমন করে যেন বুঝে যেতেন, আমাকে বলতেন তার দিকে তাকাতে। আমি তাকিয়ে দেখতাম- পাথরের মত কালো দুটি চোখ, কিন্তু কি গভীর আর কি স্বচ্ছ তারা! খানিক তাকিয়েই মা বুঝে যেতেন কোথাও গোপন কোন কথা আছে আমার, সযত্নে লুকোনো। তারপর গলায় আদর নিয়ে তিনি কেমন করে যেন আমার কাছ থেকে সে খবর ঠিকই বের করে নিতেন।
মায়ের বিছানার পাশে দেয়াল ঘেঁষে একটা মাকড়সার জাল ছিল, মাঝে মাঝে সেখানে কালো রঙের একটা মাকড়সা এসে বসতো। মা সেটাকে বলতেন তার বন্ধু। আমরা যখন থাকি না বাসায়, মা নাকি সেই মাকড়সার সাথে গল্প করেন। আমাদের কাজের বুয়া সেসব শুনেছে মাঝে মাঝে।
মাকড়সার চোখ কোথায় থাকে জানি না, কিন্তু প্রায় প্রতিবারই মনে হত, মাকড়সাটা যেন আমার দিকেই কঠিন মুখ করে চেয়ে আছে। যেন বা আমার এখানে, এইভাবে, মায়ের কোল ঘেঁষে বসে থাকাটা তার পছন্দ হচ্ছে না। কখনো কখনো শিউরে উঠে আমি সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে মনে মনে ভাবতাম, আচ্ছা, ও কি বাবার দিকেও একই চোখ করে তাকিয়ে থাকে?
৩।
বাবা চিরকালই খুব নির্বিবাদী মানুষ ছিলেন। শহরের একমাত্র সরকারী কলেজে পড়ান। সারা দিনের পর বাসায় ফিরলে মাঝে মাঝে দু'একজন ছাত্র তার কাছে টিউশান নিতে আসে, তিনি তাদেরকে ঘন্টা দুই সময় দেন, তারপরে পত্রিকা নিয়ে বসে পড়েন - একেবারে রাতের খাওয়ার আগে পর্যন্ত- যতক্ষণ না মা তাকে তার ঘরে ডেকে পাঠান।
বাবা ও মায়ের মধ্যে নাকি একসময় গভীর প্রেম ছিল - এ কথা আমার কেন যেন বিশ্বাস হতে চায় না। মা বিছানায় শোয়া থাকলেও ভীষন ছটফটে স্বভাবের মানুষ। প্রায় সারাক্ষণই কথা বলে যাচ্ছেন- অথবা কাজের বুয়াকে এটা ওটা বলে যাচ্ছেন। সেই তুলনায় বাবা একেবারেই মৃদুভাষী। কেমন করে যে তাদের মিল হলো!
বাবা মা প্রায়শই বসে বসে অনেক গল্প করেন। গল্প মানে- মা একাই বলে যেতে থাকেন, বাবা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন সেসব। মানুষের চোখ থেকেও যে কখনো ভালবাসা ঝরে পড়ে, এ ব্যাপারটা তখন বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বুঝেছিলাম। প্রায় প্রতিটি কথার মৃদু স্বরে জবাব দিতেন - কিন্তু গলার স্বরেও সেটা টের পাওয়া যেত।
আমার পনের বছর বয়সে যেদিন মা মারা যান- বাবা সেদিন একদম স্থির হয়ে বসেছিলেন সারাদিন। বারান্দার এক কোনায় চেয়ার পেতে। আমাদের নিকট আত্মীয়স্বজনেরা এসে মায়ের দাফনের ব্যবস্থা করেছিলেন, বাবাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়নি।
সারাদিন একঠায় বারান্দায় বসে থেকে- সন্ধ্যার পরে তিনি প্রথম কথা বলে ওঠেন। ক্লান্ত স্বরে আমাকে ডেকে বলেন, আজকের পেপারটা একটু দিয়ে যাবি আমাকে?
আমি সেদিন কোনো এক ফাঁকে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি - মাকড়সাটি নেই আর ওখানে। তারপরে আর সেটাকে কখনো দেখিনি আমাদের বাসায়।
৪।
বৃষ্টি ঝরতে থাকে। একটু বাড়ে, আবার কখনও কমে যায়। ভিজে চলা দাঁড়কাকের মতন ঋষিসুলভ শান্ত ভঙ্গিতে আমরা ক'জন প্রায় ধ্যাণমগ্ন মানুষ এই গাছটার তলায় দাঁড়িয়ে থাকি। দীপু আমার কাঁধে হাত দিয়ে থাকে, এইটুকু স্পর্শকেও যেন ভীষণ প্রয়োজনীয় মনে হয় তার। সামনে তাকালে কেবলই অবিরাম বৃষ্টি, চেয়ে থাকার কোন মানে হয় না, তবু আমরা সবাই নিদারুণ আলস্যে সেদিকেই তাকিয়ে থাকি। খানিকটা দূরে, প্রায় অস্বচ্ছ অবয়বের অজানা অচেনা কিছু লোক নির্বিকার মনোযোগে মাটি খুঁড়ে চলেছে। তাদের মুখে কোনো শব্দ নেই, শুধু কান পাতলে ঝুপ ঝুপ করে একটা ভোঁতা আওয়াজ পাওয়া যায়। আমি সেই আওয়াজের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হই, অল্প প্রচেষ্টার পরেই সেটাও আমার কাছে সুরময় হয়ে ওঠে, আর তখন আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়।
মা চলে যাবার পরে বুকের মধ্যে একটা শূণ্যতার মত তৈরি হয়েছিলো। ঠিক সেই সময় মনে হয়েছিল সেটা আসলে কখনই পূরণীয় হবার নয়। কিন্তু তেমনটা হলো না আসলে। কলেজে থাকার সময়টা বা যতক্ষণ বন্ধুদের সাথে থাকা হয়, মাকে মনে পড়তো না। বাড়ি ফিরলেই শুধু একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগতো। আমাদের বাড়ির চেহারাও তেমন একটা বদলালো না। সেই পুরোনো বুয়াই বহাল রইলেন। শুধু বাচ্চা মতন একটা ছেলেকে এনে রাখা হলো ছোটখাট ফাই-ফরমাশ খাটার জন্যে।
বাবার সাথে দেখা হওয়া কমে গিয়েছিল আরও। তিনি আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। আরও বেশি পত্রিকা-প্রিয়। দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ ছিলেন। বাবার বন্ধুরা এসে তাকে নানা জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইতেন, বাবার ভাল লাগবে এই ভেবে। কিন্তু তিনি তেমন একটা পাত্তা দেননি সেসবে। দু'একজন মুখ ফুটে আবার বিয়ে করার কথাও বললেন, কিন্তু বাবার চোখের পলক পড়ছে বলে মনে হয়নি কখনও।
বছর গড়িয়ে যায়।
আমি তখন সদ্য যুবক। প্রিয়তির সঙ্গে পরিচয় হয়ে গেছে ততদিনে। ক্লাশের ফাঁকে খানিকক্ষণ কথা বলা, অথবা কথা না বলে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকা, সবই আমার কাছে অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ। রিকশায় পাশাপাশি বসলে যখন আমাদের দুজনের গা ছুঁয়ে থাকে, আমি কেমন যেন ঘোরের মধ্যে চলে যাই। ততদিনে গাঁজা টানাও শিখে গেছি। কিন্তু গাঁজার ঘোরের চেয়েও আমার কাছে প্রিয়তির গা ছুঁয়ে থাকাটা আরো বেশি মধুময় মনে হয়।
একদিন ক্লাশ শেষে - আমরা দুজন বসে আছি। প্রিয়তি কি একটা গল্পের বই পড়ছে আমার সাথে কথা না বলে। আমি সেটা টুক করে কেড়ে নিতে চাইলাম, ও দিলো না, সেটাকে চেপে ধরলো একদম বুকের সাথে। আমি আবারও জোর করতে যেতেই কী যে হলো, আমার হাতের দু'টো আঙুল হঠাৎ ওর বুক ছুঁয়ে গেল। দু'জনেই একটু চমকে উঠলাম- তারপর -কিছুই হয়নি - মত করে ও আবারও বই পড়া শুরু করলো। কিন্তু আমার মধ্যমা আর তর্জনীর চমক তখনো কাটেনি। আমি অবাক দৃষ্টিতে আমার আঙুলের দিকে তাকিয়ে রইলাম- কী আশ্চর্য একটা সুখানুভুতি সেখানে।
সেদিন রিকশায় করে ফেরার সময় কেউ কোন কথা বলিনি।
বাড়ি ফিরে নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে শুয়ে পড়েছি- আর খানিক পর পর হাত চোখের সামনে তুলে আঙুল দুটোকে দেখেছি। হঠাৎ খুব বেশি আপন মনে হচ্ছিল ঐ দুটোকে, এমনকি ভাত খাবার সময় যখন খাবার মুখে তুলছিলাম, বারবার মনে হচ্ছিল, এই দু'জন বেশি কষ্ট পাচ্ছে না তো!
রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না সেদিন। বিছানায় এপাশ ওপাশ শুধু একসম খুব তৃষ্ণা পেলে উঠলাম পানি খেতে। রান্নাঘরে যাবার প্যাসেজটায় এসে দাঁড়াতেই হঠাৎ গোঙানির মত একটা শব্দ শুনলাম যেন। আমি দাঁড়িয়ে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম কোত্থেকে আসছে সেটা।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বুঝতে বুঝতেই দেখি বাবা বের হয়ে আসছেন হন্তদন্ত হয়ে, এপাশে আলো না থাকায় আমাকে দেখেননি - ঘাম দেয়া শরীরে ছুটতে ছুটতে চলে গেলেন নিজের ঘরে। আমি খানিকটা এগিয়ে রান্না ঘরে উঁকি মেরে দেখলাম- আমাদের কাজের ছেলেটা উঠে বসে হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। পাশেই পড়ে থাকা লুঙিটায় চোখ মুছছে শুধু একটু পর পর।
এরকম করেই ঠিক একদিনে দু'বার আমার পৃথিবী বদলে গেল।
৫।
নিউমার্কেটের সামনের বড়ো রাস্তাটা পার হবার জন্যে প্রিয়তি যখন নির্বিঘ্নে আমার হাত ধরে, আমার ইচ্ছে করে এই হাতটা, এই নিউমার্কেটটা, এই সময়, এই জায়গা, সবকিছুকে সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে রাখি!
কিন্তু বাড়ি ফিরলেই আবারও সেই বিচ্ছিরি বোধ। বাবাকে দেখলেই একটা বমি-মতন অনুভূতি দলা পাকিয়ে উঠতো গলার কাছটায়। কখনই আমাদের চোখে চোখ পড়তো না। আমি চাইতাম, হয়ত ঠিক যেমন করে মা তাকাতেন আমার দিকে, আমার গোপন কথা জানবার জন্যে, কিন্তু বাবা অন্যদিকে তাকিয়ে কথা বলতেন সবসময়। আমি তীব্র দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করতাম কখন তিনি আমার দিকে তাকাবেন- আর আমি আমার সবটুকু ঘৃণা ঢেলে দিব সেখানে।
ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে আমি চলে এলাম আমাদের শহর ছেড়ে। একই বিষয় নিয়ে পড়তে প্রিয়তিও চলে এল। আমরা দুজনেই হলে থাকতাম, একসাথে পড়তাম, ঘুরতাম, ফিল্ম সোসাইটি করতাম। মিছিল, মিটিং, আন্দোলন আর ভালোবাসাবাসি- সব চলতে লাগলো একসাথে।
ছুটিছাটায়ও বাড়ি যেতে চাইতাম না আর। অনেক দিন বাদে বাদে বাবার সাথে হঠাৎ হঠাৎ ফোনে কথা হতো।
একবার তিনি খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। হার্টের অসুখ। বাইপাস করাতে হলো। হাসপাতাল- ডাক্তারের কাছে ছোটাছুটি, সবই একা প্রিয়তি করলো, আমি কেবলই তাকে সঙ্গ দিলাম।
অপারেশনের পরদিন আমি বাবার বিছানার পাশে বসা। প্রিয়তি বাইরে গেছে কিছু একটা কাজে। বাবা ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে তিনি চোখ মেলে তাকালেন। এবং অনেক অনেকদিন পরে আমাদের চোখাচোখি হলো।
বাবার চোখ দেখে আমি চমকে উঠলাম। কি গভীর ক্লান্তি, লজ্জা আর আকুতি সেখানে! কিছু না বলে তিনি আমার হাত ধরতে চাইলেন, আমি চট করে উঠে দাঁড়ালাম। অনেকদিনের পুষে রাখা ঘৃণাটুকু ঢালতে গিয়ে দেখি- সেটুকু গ্রহন করবার ক্ষমতা আর তার নেই। অঝোরে পানি পড়ছে তাঁর চোখ থেকে।
ঘৃণা করতে না পারার অক্ষমতায় আমি সেখান থেকে ছুটে বের হয়ে এলাম।
৬।
আবারও বছর গড়ায়। গড়িয়েই চলে।
প্রিয়তি আর আমার ছোট্ট সংসার। প্রিয়তি এখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ায়। আর আমি পুরোপুরি সিনেমাওয়ালা। হলে চলে না- দর্শকে দেখে না- এমন সব ছবি বানাই। বছর বছর নিয়মিতভাবে পুরস্কার এনে দেয় সেসব সিনেমাগুলো, আর আমি সেই আনন্দে প্রতিদিন প্রিয়তিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে থাকি।
এমনি করেই চলছিল আমাদের। গতকাল পর্যন্ত।
কাল রাতেই হঠাৎ ফোন এলো বাড়ি থেকে। জরুরী তলব। আর আমরা আজ সকালে এসে পৌঁছাই আমাদের ছোট্ট শহরে- এক ঝাঁক কালো মেঘ মাথায় নিয়ে।
*
সিগারেটটা শেষমেষ ধরাতে পারি। ওটার মাঝামাঝি আসতে আসতে বৃষ্টির মধ্যে খুঁজে পাই সেই তবলার বোলের ছন্দ। শেষ হবার আগেই দীপু আমার কাঁধ ধরে ইশারা করে। বৃষ্টি থেমে গেছে, আমরা কয়েকজন নিশি পাওয়া মানুষের মতন হেঁটে এসে দাঁড়াই সেখানে।
কবরে লাশ নামানো হয়। বাবাকে মাটি চাপা দেয় সবাই মিলে। দেখি চেনা অচেনা সব লোকজন গভীর মনোযোগে বাবার কবরে মাটি ফেলতে থাকে। আমি এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকি। হঠাৎ বড় চাচা বলে ওঠেন, বাবা রে, মাটি ফেলবি না একটু?
আমি মাথা নাড়ি। হাতের সিগারেটটা শেষ প্রায়। কোথায় ফেলবো বুঝে পাই না। তারপর কি ভেবে ফেলে দিই সেটা কবরের ভেতর। এরপর নিচু হয়ে এক গাদা মাটি মুঠো করে ছড়িয়ে দিতে থাকি সেটার ওপরে।
বৃষ্টি গুমোট বেঁধে থাকে আকাশে, মেঘ ডেকে ওঠে। আমার হাত থেকে মুঠো মুঠো মাটি বৃষ্টির মত ঝরে পড়তে থাকে, সেখানে - একটা সিগারেটের সাথে আমার বাবা ক্রমশ চাপা পড়তে থাকেন।

-----------------
অনলাইন ম্যাগাজিন গুরুচন্ডালিতে প্রকাশিত।
ছবির ক্রেডিটঃ কঙ্কাবতী।

বৃহস্পতিবার, জানুয়ারী ১৮, ২০০৭

সেলিম আল দীনের গল্প পড়ার পরে-

মাত্র তিনখানা গল্প পড়ে কোন গল্পকার সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া মুশকিল। সেরকম চেষ্টাও আমার ছিলো না। সবচেয়ে বড় কথা সেলিম আল দীন গল্পকার হিসেবে পরিচিত নন, বিশুদ্ধ নাট্যকার হিসেবেই তিনি খ্যাত। তাঁর রচনা সমগ্র পড়তে গিয়ে দেখি, অনেকগুলো নাটকের সাথে সেখানে বেশ কিছু কবিতা, গান ও গল্প সংযুক্ত করা আছে। সাধারণত যেটা হয়, খানিকটা ব্যাতিক্রম দেখলেই আগ্রহ বেড়ে যায়, প্রায় সমমানের কারণে আমি জীবনানন্দ দাশের গদ্য গোগ্রাসে পড়েছিলাম। নাট্যকার সেলিম আল দীনের গল্পের প্রতি আকর্ষন বোধ করার কারণও বোধ করি এই 'ব্যাতিক্রমপ্রিয়তা'।

মোট তিনটি গল্প। প্রথমটির নাম আহত বিহগ। বিহগ = বিহঙ্গ।
মাত্তর তিনপাতার গল্পটা এক নি:শ্বাসে পড়া যায়। একটা নাটকের খন্ড দৃশ্যের মত করে বর্ণিত গল্পটি মূলত সংলাপ-নির্ভর। মূল চরিত্রের নাম সেকেনদ্্রা। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম পৌরাণিক কোন চরিত্র হবে হয়তো। সত্যিই তাই কিনা আমার জানা নেই। পরে সেকেনদ্্রা শব্দটিকেও নানাভাবে ভেংগে চুরে উচ্চারণ করে দেখলাম বাংলা কোন শব্দের সাথে মিলে কিনা। পেলাম না তেমন কিছু।
সেকেনদ্্রার অবস্খান এখানে তিনজন পুরুষের মাঝখানে। একজন তাকে সেক্সুয়ালি হ্যারাস করে, সম্ভবত প্রায় নিয়মিত। অন্যজন তার দেবর সম্পর্কিত। যার প্রতি তার ( অথবা - পরস্পরের প্রতি দু'জনের) শারিরীক আকর্ষন আছে। তৃতীয়জন বড়-ভাই-সুলভ-সম্পর্কের-সম্ভাব্য-প্রেমিক-প্রজাতির মানুষ।
প্রায় একভাবে বলে যাওয়া বিক্ষিপ্ত সংলাপের মত করে পুরো গল্পটাতেই তিনজন পুরুষের সাথে সেকেনদ্্রার আচরণ ও মনোভাব নিয়ে গল্পটি লেখা। আবছায়ার মত করে এক ফাঁকে তার স্বামীর কথাও এসেছে বটে, তবে সেটুকু ধর্তব্য নয়।

দ্বিতীয় গল্পের নাম- রেডিয়াম থেকে বিদায়: একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী।
এটি আসলে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়। স্বর্গ থেকে গন্ধম ফল খেয়ে অ্যাডাম এবং ইভের বিদায়ের যে প্রচলিত ধারণা, সেটিকে নির্ভর করে এবং এ কাহিনিতে প্রায় কোনরকম পরিবর্তন না করেই গল্পটি লেখা। স্বর্গের নাম তিনি এখানে দিয়েছেন রেডিয়াম! বিজ্ঞানের ছাত্র বলেই খানিকটা হাস্যাস্পদ মনে হয়েছে এটা আমার কাছে। এই ইচ্ছাকৃত ( ধরে নিলাম) নামকরণের পেছনে নিগুঢ় কোন কারণ আছে বলেই মনে হয়।
এই গল্পটিকেও প্রায় বিনাশ্রমে নাটক বানিয়ে ফেলা যাবে। আরো ভালো করে বলা যায়, লেখার ( অথবা ছাপার) ফরম্যাট খানিকটা বদলে দিলে এটা আসলে একটি নাটকই।
গল্পের একটা অংশই আমার ভালো লেগেছে- এখানে শয়তান-রূপী যে চরিত্র ( এখানে, নাম- আফতাব) তাঁকে দেখানো হয়েছে মূল চরিত্র, মানে অ্যাডাম ( এখানে - আখতার) এর বন্ধু হিসেবে।
গল্পের এই আইডিয়াটুকুকে আমাদের জানাশোনা মূল কাহিনির সাথে সমন্বয় ঘটালে খানিকটা নতুনত্বের আমেজ পাওয়া যায়।

তৃতীয় গল্পের নাম- “লেসার রশ্মি নয়: একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি' এবং এটিও মূলত কোন বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি নয়। একজন ক্যানসার আক্রান্ত মানুষের বিচ্ছিন্ন প্রলাপ গল্পের প্রতিপাদ্য। যার নিম্নাঙ্গে গুটির মত করে ক্যানসারের প্রকাশ ঘটে। এবং সে এটি টের পায় 'একজন বেশ্যা'র কাছ থেকে ফিরে আসবার পরে।
এইখানে এসে মনে হয় রোগটি ক্যানসার না হয়ে সিফিলিস, এইডস অথবা অন্য কোন যৌন-বাহিত-রোগ হলে আরো মানানসই হোত। যদিও মনে হচ্ছে এইরকম অনাকাংক্ষিত ব্যাপারগুলোকেই সেলিম আল দীনের গল্পের মূল বৈশিষ্ঠ বলে চিহ্ণিত করা যায়।

ছোটগল্পের স্বাভাবিক সুরটুকু প্রায় তিনটি গল্পেই তিনি ব্যাহত করেছেন। 'হয়েছে' না বলে “করেছেন' বললাম, কারণ এটুকু তাঁর ইচ্ছাকৃত কিনা আমার জানা নেই। তাঁর লেখা আবার কোন গল্প চোখে পড়লে হয়ত সেটা পড়বো, কিন্তু সেটা 'গল্প' পড়ার ইচ্ছা থেকে হবে না, বরং সেলিম আল দীনের গল্পের বর্তমান প্যাটার্ণ জানবার ইচ্ছা থেকেই হবে বলে মনে হয়।

আকাশ ছড়ায়ে আছে-


পুরোনো চাল ভাতে বাড়ে
------------------
রয়েছি সবুজ মাঠে- ঘাসে-
আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে।

ভালো গদ্য লিখতে চাইলে নাকি বেশি করে পদ্য পড়তে হয়, কে বলেছিলেন? মনে নেই। তবে খুব সঠিক কথা। কবিতা পড়লে শব্দ নিয়ে রংবাজিটা খুব ভালোভাবে চোখে পড়ে, মনে গাঁথে। এই ক্ষেত্রে একদম টপ রংবাজ বলে মানি জীবন-দাশ-বাবুরে। প্রায়শই তাই তার রংবাজি-সমগ্র টা হাতে নিয়ে বসি, পাতা উলটে যাই আর বিপন্ন বিস্ময় বোধ করি।

যায় দিন, যায় একাকি...।
------------------------------
গতকাল, রাতে, সিংহপুরী পংখীরাজ যখন মেলবোর্নের রানওয়ে স্পর্শ করলো, ছাদের কোন এক কোনা থেকে একজন সুকণ্ঠী স্বাগতম জানালেন, এবং বললেন, বাইরে আজ ৩৫ ডিগ্রি গরম। স্কুল-বালিকাদের একটা গ্রুপ সম্ভবত ট্যুরে গিয়েছিল, প্রায় সব কজন এক সংগে হৈ হৈ করে হাতে তালি দিয়ে উঠলো। এরা সামারটাকে এত বেশি পছন্দ করে! আর আমি মরি গরমে!! ধুর!

ভালো লাগে রে সবই
---------------
কদিন খুব আজব কাটলো।
জোহানেসবার্গ থেকে দুবাই হয়ে যেবার মেলবোর্ণে প্রথম এসেছিলাম, মাঝপথে প্লেনের জানালা দিয়ে দেখলাম সূর্য ডুবে গেল। মজা হলো, ঠিক তার ছ'ঘন্টা বাদেই সূর্য আবার উঁকি দিলো। আমার জীবনের সবচে দ্্রুততম রাত ছিল সেটা।
বাংলাদেশে আমার গত দুমাসটাকেও জীবনের সবচেয়ে দ্্রুতগামী দু'মাস বলে মনে হয়।
অবরোধে অবরোধে ঢাকা-কুমিল্লায় আসা যাওয়া। একগাদা শারীরিক আর মানসিক প্রেশার। এর ফাঁকে হঠাৎই একদিন নিজের ব্যাচেলর জীবনের পরিসমাপ্তি! সবমিলিয়ে, ডালে-চালে-গোশতে একেবারে যেন নান্না মিয়ার বিরিয়ানি!

সারাদিন তোমায় ভেবে, হলো না আমার কোন কাজ-
--------------------------------------
কদিন মনে হয় এরকমই যাবে।

অনেকগুলো বই নিয়ে এলাম এবার। গতকালই প্লেন আর ট্রানজিট মিলিয়ে পড়ে ফেললাম আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ' নিউইয়র্কের আড্ডায়'। আমার খুব পছন্দের মানুষ, অনেক পছন্দের লেখক। পড়ি আর চমকাই। নতুন করে বাংলা শব্দের ব্যবহার শিখি, আর ভাবি, অল্প কিছু শব্দ সম্বল করেই আমরা রংবাজি করার চেষ্টা করি, অথচ বাংলা শব্দ নিয়ে কত কিছুই না করা যায়! কিছু লাইন নিজের মনেই বিড়বিড় করি বারবার, শব্দের স্পর্শটা টের পাওয়ার চেষ্টা করি।

শুনবোনা গান, গান শুনবো না
---------------------
মুখে বলি ঠিকই, তবু এখন প্রায় সারাদিনই শুনছি-

আমার মাঝেই এখন আমি, স্বপ্নের সিঁড়ি দিয়ে স্বর্গে নামি,
যেন অন্যরকম এক ভালোবাসাতে, ডুবে আছি তুমি কাছে আসাতে,
মন যেন এক উদাসী কবি-
ভালো লাগে রাত, ভালো লাগে চাঁদ, ভালো লাগে রে সবই,
ভালো লাগে ফুল, কিছু কিছু ভুল, ভালো লাগে রে সবই।

যুগ যুগ জিও।

[ ছবির ক্রেডিট: কঙ্কাবতী]

বুধবার, জানুয়ারী ১৭, ২০০৭

লাট্টু!

পঁচিশতম জন্মদিনে এসে আমার মনে হয়, যদি পঞ্চাশ বছর বাঁচি, তবে অর্ধেক পথ এরই মাঝে পার হয়ে এসেছি।
বড় নির্দয়ভাবে এই ভাবনাটাই কেবল মাথার ভেতর লাটিমের মত ঘুরতে থাকে। কিছুক্ষন এদিক ওদিক ডিগবাজি খেতে খেতে একটা কেন্দেন্স এসে ভাবনাটা স্খির হয়, এবং একই কেন্দেন্স ঘুরপাক খায় বলে সেটা ক্রমশ: গভীরে যেতে থাকে- আর সেখানে যেন কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে যায়, পঁচিশ, চব্বিশ, তারপর তেইশ বাইশ একুশ...।

সতেরতম জন্মদিনে ঠিক এরকম একটা ভাবনার উদয় হয়েছিল মনে। ধারণা হচ্ছে, সেদিনও সম্ভবত আজকের মতই কিছু খরচ না করা অলস সময় জমে গিয়েছিল। শীতের সকালে খুব আরাম নিয়ে রোদ পোহানোর মত করে আদুরে ভঙ্গিতে আমি তাই ভাবনার লাটিম চরিয়ে বেড়াই। মনে পড়তে থাকে- সে দিনেও আমার এমনি মনে হয়েছিল যে সতের বছর পার হয়ে এসেছি!
আজকের দিনের সাথে তার পার্থক্য একটাই, সামনের অর্ধেক জীবনের কথা তখন মাথায় এসে বসেনি।
এই রকমের ভাবনাগুলোর ব্যাকগন্সাউন্ডে ফ্ল্যাশব্যাকের মত করে পুরনো স্মৃতিরা উঁকিঝুকি দেয়া শুরু করলে বেশ জমে ওঠে।
আমিও তাই ভাল মতন জমিয়ে যাই। মস্তিষ্কের মজাটাই এই- সে পন্সায় সব স্মৃতিই জমা করে রাখে। ডেস্কটপে ফেলে রাখা আনইউজড আইকনের মত মাঝে কিছু কিছু ডিলিট করে দেয় বটে, তবে সেটা শিফট+ডিলিট নয় কোনমতেই। তাই খানিকটা চেষ্টা করলে সেসব রিটিন্সভ করা যায়।
আর এই রিটিন্সভের পন্সক্রিয়াটা অনেকটা সার বেঁধে সাজিয়ে রাখা তাসের মতন, একটা টোকা দিলেই সরসর করে একের পর এক সব গড়িয়ে পড়তে থাকে।
মনের ভেতর গড়িয়ে পড়া ফ্ল্যাশব্যাকগুলো থেকে হঠাৎ হঠাৎ দু'একটাকে পওজ করে থামিয়ে দেই। ডানে বামে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ত্রিমাত্রিক ভঙ্গিতে দেখি তাদের। না না, চতুর্মাত্রিক হবে দেখাটা, সময়ও যে থাকে সাথে! দেখতে দেখতে ভাবতেও ভাল লাগে- এতদিন পরেও তারা পন্সায় একই রকম অনুভূতির জন্ম দেয় মনে, ঠিক পন্সথমার মতন। কখনো টুপুর টাপুর কখনো মুষলধারে হাসতে থাকি আমি, অথবা কখনো চুপ করে নীরব জোছনায় ভেসে যাই।

তো, বলছিলাম, সতেরতম জন্মদিনটির কথা। সেদিন খানিকটা থমকে পেছনে তাকিয়েছিলাম, আর ঠিক আট বছর বাদে আজ আবার সময় হলো তাকানোর।

সতের মনে আছে, তবে আঠারো নেই একদমই।
অথচ আঠারো নিয়ে কতই না মাতামাতি- গল্পে কবিতায় আর গানে, এদেশের বুকে আঠারো আসে নেমে। কিন্তু কেমন করে আঠারোকেই অবহেলা করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। একবার নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকাল বেলা টেন্সনে চেপেছিলাম, জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখতে দেখতে কাঁচের গায়ে মাথা ঠেকিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি! হঠাৎ চমকে ঘুম ভেঙ্গে দেখি, স্টেশান পার হয়ে গেছে আগেই, অথচ নামা হয় নি আমার।
ঠিক একই চমক নিয়ে আজ আঠারোর কথা ভাবি। কোন আবেগ কিংবা আবেশে মাতা হলো না তেমন করে। কাঠঠোকরা পাখির মত একাগন্সতায় ঠক ঠক করে গুনে ফেলেছি আঠারো ঊনিশ বিশ- , কোনখানে থামবার কথা মনে হয়নি একবারো।
আজ তাই অল্প স্বল্প দু:খ বোধ হয়- যদি মনে পড়তো- শেরপা তেনজিং এর মতন গর্বিত ভঙ্গিতে না হলেও, খানিকটা সংকোচ নিয়ে আঠারোর বুকে একটা পতাকা গেঁথে দেয়া যেত।

শহুরে জীবনের কল ঘুরিয়ে মাঝে মাঝেই এরকম শাওয়ারে ভিজে নিতে ভাল লাগে, চোখ বুজে নীপবনের শান্তি খুঁজে নেবার চেষ্টা চালানো যায়।

আপাতত লাটিম থেমে যায়, হাতের সুতো তাতে জড়িয়ে নিতে নিতে ভাবি- আরো বছর পঁচিশেক এরকম নবধারাজলে ভিজতে পারলে মন্দ হয় না বটে!


-----------------------
আজ আমার জন্মদিন নয়। এই লেখাটা জন্মদিনের সমকালীন লেখা, লিখেছি অনলাইন ম্যাগাজিন বীক্ষণের জন্যে ।