মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২৭, ২০০৭

আগুন আবিষ্কার-

একটা কোটেশান পড়লাম কয়দিন আগে, সেক্স এন্ড দ্য সিটি থেকে- বাংলায় অর্থটা মোটামুটি এরকম দাঁড়ায়- “আগুন হয়তো ছেলেরাই আবিষ্কার করেছে, কিন্তু আগুন নিয়ে কি করে খেলতে হয় সেটা আবিষ্কার করেছে মেয়েরা''!

বেশ পছন্দ হয়েছে কথাটা। ঠিক বলেই মনে হয়।
কিন্তু ইদানীং একটু অন্যরকমও ভাবি। এদিকে সেদিকে যখন হুট হাট করে বস্তি পুড়ে ছাই হয়ে যায়, অথবা বড় কোন দালানে আগুন লাগে, তখন ভাবি, মেয়েদের সাথে সাথে আগুন নিয়ে খেলা করার অধিকার ঈশ্বর কিছুটা নিজের জন্যে, আর কিছুটা রাজনীতিবিদদের জন্যেও রেখে দিয়েছেন।

ভাবি, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। নারী, রাজনীতিবিদ আর ঈশ্বরের ঈর্ষনীয় সৌভাগ্যে!

সোমবার, ফেব্রুয়ারী ২৬, ২০০৭

কারওয়ান বাজারে আগুন-


কারওয়ান বাজারের এনটিভি, আরটিভি এবং আমারদেশ পত্রিকার বিল্ডিং-এ আগুন লেগেছে।
মোটামুটি ভয়ংকর পরিস্থিতি।
লাইভ আপডেট পাওয়া যাবে এখানে-

-------------
ছবি কৃতজ্ঞতা- রাগিব।

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ২৩, ২০০৭

সিয়েরা লিওনের অফিশিয়াল ল্যাঙুয়েজ বাংলা-

সম্ভবত ২০০২ এর ডিসেম্বরের কোন একটা সময়ে সিয়েরা লিওনের প্রেসিডেন্ট ইংরেজির সাথে বাংলাকেও তাদের অফিশিয়াল ল্যাঙুয়েজ হিসেবে ঘোষণা দেন।
পুরা কৃতিত্বটাই অবশ্য জাতিসংঘ শান্তিমিশনে যাওয়া বাংলাদেশি জলপাই মামাদের।
প্রথম যেবার খবরটা শুনছিলাম, বিস্তর আনন্দ পাইছিলাম মনে। পরে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ভুলে গেছি।
আজ কাজে গিয়া এক আফিন্সকানের সাথে কথা হইলো- বাড়ি কইলো সিয়েরা লিওন। কি কারণে জানি নামটা মাথায় ঘুরতেছিলো।
ব্লগে ঢুইকা চট কইরা মনে পড়লো- ওদের অফিশিয়াল ল্যাঙুয়েজও তো বাংলা! এইজন্যেই মাথায় নামটা ঘুর ঘুর করতেছিলো!
কালকের দিনটা ওদের কেমন গেছে কে জানে! সালাম বরকত রফিক বা জব্বারের নাম ওরা জানে তো?

যেভাবে কয়েকটি সংখ্যার মানে বদলে গেল-


৪০ মানে -- পঞ্চাশ এখনও যার দশ ঘর দূরে৷ আর পঞ্চাশ? সে তো হাফ-সেঞ্চুরি৷ “এক' মানে হল সবকিছুর শুরু৷ কেউ কেউ অবশ্য বলেন, সব কিছু শুরুর মূল দাবিদার “শূন্য'৷

এ সবই সংখ্যাগুলোর নিজস্ব ও স্বাভাবিক অর্থ৷ এ নিয়ে কারও দ্বিমত নেই৷

আচ্ছা, একুশ মানে কী? অথবা ৫২? বা ৬৯, ৭১? কিংবা ৯০? মনে হতেই পারে এই অনর্থক প্রশ্নের মানেটা কী? এসব ও তো কিছু সংখ্যা-ই!

হুমম৷ খুবই সত্যি কথা৷ এরাও কয়েকটি সংখ্যাই বটে৷ তবে এদের অর্থ কেবল কিছু সংখ্যাই নয়, আমাদের কাছে এদের অর্থ আরও অনেক অনেক ব্যাপক৷ শুধুমাত্র বাংলাদেশে জন্মেছি বলেই কয়েকটি সংখ্যার মানে আমাদের জীবনে আশ্চর্যজনকভাবে পাল্টে গেছে৷

আমরা বাংলাদেশি বলেই, বাহান্ন বা একুশ শুনলে, ৫-এর পরে ২ অথবা ২-এর পরে ১ বসিয়ে দুটো সংখ্যাই কেবল মনে হয় না আমাদের কাছে -- ৫২ বা ২১ মানে -- আমাদের কাছে -- নিজের ভাষার জন্যে বুক ভরা ভালবাসা৷ যে ভালবাসার টানেই আমাদের ভাষা-শহীদদের আত্মত্যাগ৷

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির কথা বাঙালি মাত্রেরই জানা৷ আর কিছু নয়, নিজের ভাষার কথা বলবার অধিকারও যে প্রাণ দিয়ে আদায় করে নিতে হবে, এই দিনটির আগে কেউ কি তা কল্পনাও করেছিলেন? এই যে আমি এখন অবলীলায় গড় গড় করে বাংলায় লিখে চলছি, খেলার মাঠে নিজের প্রিয় দলকে চিৎকার করে “সাবাস সাবাস' বলে উৎসাহ দিচ্ছি, অথবা বন্ধুদের সঙ্গে দিচ্ছি প্রাণ খুলে আড্ডা৷ গলা ছেড়ে কখনও গেয়ে চলেছি বুকের গভীর থেকে উঠে আসা গান -- “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ....'৷ অথবা জ্বরার্ত কণ্ঠে কখনও অস্ফুটে আমার ডেকে ওঠা -- “মা ...'! এ সবেরই পেছনে ঐ একটি দিনেরই পূর্ণ অবদান৷

এরপর ৬৯-এর গণ-অভ্যুথান৷ ভাষার অধিকার আদায়ের পর আমাদের স্বাধীনতার দাবিকে আরও জোরালো করা হল যে ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমে, ১৯৬৯ এই হয়েছিল তা৷ পরাধীনতা ভেঙে ফেলে, নিজেদের একটি ভূখণ্ডের স্বপ্নের শুরুও এই সময়েই৷

তারপর, ৭১৷ চোখ বুজে শুধু ৭১ বললেই মাতৃভূমির কথা মনে পড়ে যায় আমাদের৷ ১৯৭১ সালটিই এদেশের জন্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়৷ ২৫ মার্চ রাতের নৃশংস গণহত্যা, তারপর ২৬শে মার্চ আমাদের স্বাধীনতা ঘোষণা৷ এরপর একেকটি সংগ্রামমুখর দিনের মধ্য দিয়ে -- অনেক আত্মত্যাগ আর বিসর্জনের নয় মাস পর -- সেই ৭১-এরই ডিসেম্বরে অর্জিত হয় আমাদের বিজয়৷ যে বিজয়ের ফলে বিশ্ব-মানচিত্রে আমরা একটি স্বাধীন জাতি হিসাবে জায়গা করে নিয়েছি৷ স্বাধীন একটি দেশ হিসাবে আমাদের অস্তিত্বের ঘোষণা আর তার বাস্তবায়ন হয়েছিল ১৯৭১-এ৷ এ কারণেই মনে হয় যেন -- ৭১ সংখ্যাটিই আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে আছে৷

৯০-এরও রয়েছে আলাদা তাৎপর্য৷ স্বৈরাচার বিরোধী গণ-আন্দোলনের তরতাজা স্মৃতিময় ১৯৯০-এর উত্তাল দিনগুলো৷ আরও একবার পুরো দেশের মানুষের মিলেমিশে এক হয়ে যাওয়া! অবশেষে গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আবারও আমাদের মুক্তি৷

এমনি করে, ২১, ৫২, ৭১ বা ৯০, এই সাল বা তারিখগুলো কয়েকটি সংখ্যার রূপ ধরে আমাদের কাছে অন্যরকম মানে নিয়ে আসে৷ অন্য যে কোনও সংখ্যার চেয়ে তাই এ সংখ্যাগুলৈ আমাদের কাছে বেশি আপন মনে হয়, বেশি মহিমান্বিত৷ কালো কলম দিয়ে কালো হরফে লিখছি ওদের, তবু যেন মনে হয়, তাদের র ং আসলে লাল -- রক্তেভেজা লাল৷

এ সংখ্যাগুলো প্রতিবার উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গীত হয়ে বেজে উঠে আমাদের মনে৷ প্রতিবার লিখবার সময় দেখতে পাই -- আরও বেশি সৌন্দর্যমন্ডিত হয়ে উঠেছে যেন ওরা৷ যতবারই ভাবি ওদের; ভাষা হয়ে, ভালবাসা হয়ে রক্তের মাঝে চঞ্চলতা বাড়ায় এরা৷ প্রতিবার শুনতে গিয়ে তাই মনে হয়, আলাদা করে কিছু সংখ্যা নয় -- যেন একটিই শব্দ শুনছি বারে বারে -- “বাংলাদেশ'!

আজ তাই এত বছর পরেও আমরা, নতুন প্রজন্মের গর্বিত মানুষেরা, বিজয়ের এই মাসে সেই বীর শহীদদেরকে বুকের গভীর থেকে জানাই শ্রদ্ধা ও ভালবাসা -- যাদের কারণে নিজের ভাষাকে আপন করে নিতে পেরেছি আমরা৷ জন্মের সংগে সংগেই পেয়েছি একটি পতাকা, নিজের একটি দেশ, আর দেশেরই প্রতিধ্বনি করা ভালোবাসাময় কয়েকটি সংখ্যা৷

-----------
২০০৪ এর ডিসেম্বরে লেখা।
প্রথম প্রকাশ: বাংলালাইভ
ছবি: সূত্র।

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ২১, ২০০৭

অমর একুশেঃ আমার একুশে

শূন্য

মুনীর চৌধুরীর "কবর' নাটকটি মঞ্চে প্রথম দেখি সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়৷ তখনো এর পেছনের ইতিহাস ভালো করে জানি না৷ শুধু জানি ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা এই নাটক৷ কিন্তু তখনো জানি না, ৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট ভ্রাষা বাংলার দাবিতে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালানোর প্রতিবাদ করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মুনীর চৌধুরী৷ প্রতিবাদ করার অপরাধে জেলে পাঠানো হয় তাঁকে৷ প্রায় বছর খানেক কারাবাসের সময়ে সহবন্দীদের অনুরোধে জেলে বসেই তিনি লেখেন একুশের প্রথম প্রতিবাদী নাটক "কবর'৷ আর সে নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন হয় কারাগারের ভেতরে, হারিকেনের আলোয়৷ নাটকের কুশীলব ছিলেন মুনীর চৌধুরীর সহবন্দীরাই৷ এই তথ্যটুকু অজানা ছিল, তবুও "কবর' নাটকের মধ্যে দিয়েই আমার মঞ্চের প্রতি আগ্রহের সূত্রপাত৷

"কবর'-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র একজন মদ্যপ নেতা৷ মিছিলে গুলিবিদ্ধ লাশেদের যেখানে গণকবর দেওয়া হয়েছিল, রাতের অন্ধকারে নেতা সেখানে গিয়ে দাঁড়ান৷ একসময় তাঁর মনে হতে থাকে সব লাশেরা যেন কবর ছেড়ে উঠে আসতে চাইছে, তারা আর কবরের ভেতর থাকতে চাইছে না৷ নেতা কবরের পাশে দাঁড়িয়ে উঠে আসা লাশেদের কবরেকবরে ফিরে যেতে অনুরোধ করেন, কিন্তু গুলিবিদ্ধ সেইসব লাশেরা কবরে ফিরতে চায়নি, তারা অন্য লাশেদের জাগিয়ে তুলতে চেয়েছে, তারা মিছিলে যেতে চেয়েছে৷ সারিবদ্ধভাবে যেতে যেতে তারা উল্লাস করছিল যে তারা মিছিলে যাবে, সে মিছিলে আবারও গুলি চলবে৷

নাটকের আবহ সঙ্গীতে গুলির শব্দ ছিল, রাষ্ট ভ্রাষা বাংলা চাই বলে স্লোগান ছিল৷সেই স্লোগান আর গুলির শব্দে ভর করে, সত্যিকার অর্থে - সেই প্রথম একুশের চেতনা - দর্শকের সারিতে বসে থাকা আমি, ও আমার মতো আরও কিছু কিশোরের হদৃয়ে প্রবেশ করেছিল৷ রক্তের মধ্যে ঝনঝন করে বেজে উঠেছিল "অমর একুশে'৷

এক

পাকিস্তান রাষ্ট স্রিষ্টির পর থেকেই বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানীদের অবহেলার নমুনা দেখছিল বাঙালি৷ প্রায় সবখানে বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস ছিল লক্ষণীয়৷ অল্প কিছু নেতা মুখে তাদের সেই ইচ্ছে প্রকাশও করেছিলেন; কিন্তু ততটা গুরুত্ব পায়নি সেসব, যতটা পেল মহম্মদ আলি জিন্নার বক্তৃতার পর৷ ৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় পর পর দুটি বক্তৃতায় তিনি ঘোষণা করলেন, অন্য কোনও ভাষা নয়, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট ভ্রাষা৷ বাঙালি ঐ জনসভায় দাঁড়িয়েই সাথে সাথে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল৷ একেবারে জিন্নার সামনে দাঁড়িয়েই৷ তিনি কি বুঝেছিলেন জানা নেই, তবে তাত্ক্ষণিক আর কোনও উচ্চবাচ্য করেননি৷

এরও কিছু দিন আগে পূর্ব বাংলার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত গণপরিষদের সভায় প্রস্তাব এনেছিলেন বাংলাকে রাষ্ট ভ্রাষা হিসেবে ঘোষণা করার৷ কিন্তু তাঁর সেই প্রস্তাব গৃহীত হয়নি৷ বর ংনিন্দা হয়েছিল এই প্রস্তাবের৷ পরবর্তীতে ভেতরে ভেতরে চলছিল বাংলা হটানোর আয়োজন৷ পোস্ট অফিসের খাম বা ফর্মে, সরকারি নির্দেশাবলীতে বাংলা ধীরে ধীরে অবুলুপ্ত হয়ে আসছিল৷ কিন্তু বাঙালি চিরকালই সচেতন ছিল এই প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে৷ সে সময়কার এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, পুরো পাকিস্তানের প্রায় ৫৫ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা ছিল বাংলা৷ অন্যদিকে উর্দুভাষীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭ ভাগ! কিন্তু তবুও বাংলাকে মাতৃভাষা করার এই ন্যায্য দাবিকে শাসকগোষ্ঠী "প্রাদেশিকতা' বলে নিন্দা করেছিল৷ তাদের সহায়তা করেছিল তোষামোদকারী কিছু পত্রিকা৷ এমনকি এই দাবির বিরোধিতা করেছিলেন পূর্ববঙ্গের তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন! সরকারের তোষামোদ করতে গিয়ে জনতার দাবিকে তিনি অগ্রাহ্য করে বলে বসেন, "বাংলাকে রাষ্ট ভ্রাষা করার দাবি একেবারেই ভিত্তিহীন' যদিও কিসের ভিত্তিতে এই ভিত্তিহীনতার অপবাদ, সেটা পরিষ্কার করেননি৷

জনতা মেনে নেয়নি এ কথা৷ পাকিস্তান তৈরি হওয়ার পর বাংলাদেশের জনগণ প্রথম হরতাল করেছিল এ কথার প্রতিবাদে৷ ৫২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি খাজা নাজিমউদ্দেন ঢাকায় এক সাংবাদিক সম্মেলনে আবারও এই কথার পুনাবৃত্তি করেন৷ এবং আবারও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে, ধর্মঘট ডাকা হয় দেশ জুড়ে৷ প্রতিটি শহরে জনতা স্বতস্ফুর্ত ভাবে ধর্মঘট পালন করেন৷ এই হরতাল আর ধর্মঘটে টনক নড়ে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর৷ তারা বুঝতে পারে বাঙালি খেপেছে৷ ভাষা প্রশ্নে কোনও আপোসে যাবে না তারা৷ পুরো ফেব্রুয়ারি মাস ধরে ছাত্র-জনতা প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে থাকে৷ শান্তিপূর্ণ মিছিল আর মিটিং-এর মাধ্যমে নিজেদের দাবি জানাতে থাকে তারা৷ কিন্তু কোথাও কোনও ইতিবাচক সাড়া না পেয়ে অবশেষে আন্দোলনের পথ ধরে দেশবাসী৷ আন্দোলনকারীরা সিদ্ধান্ত নেয়, একুশে ফেব্রুয়ারি বিকেল তিনটেয় পরিষদের সভা চলাকালীন পরিষদ ভবন ঘেরাও করবে তারা৷

এই সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে সরকারও তড়িত্ গতিতে ব্যবস্থা নেয়৷ ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকা শহরে এক মাসের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেন৷ এই নির্দেশের আওতায় যে কোনও ধরনের মিছিল বা সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়৷ বলা যেতে পারে ভাষা আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে এই ১৪৪ ধারাই ছিল সরকারের সবচেয়ে কঠিন পদক্ষেপ৷ মিছিল সমাবেশ আটকে দিয়ে আন্দোলন রুখতে চেয়েছিল তারা৷ কিন্তু আন্দোলনকারী ছাত্রেরা তাতেও বিন্দুমাত্র দমে যাননি৷ আদালত কর্তৃক এই নির্দেশ জারির পরপরই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ভাষার দাবিতে মিছিল করবেন তাঁরা৷ পরদিন অর্থাত্ ২১ ফেব্রুয়ারি৷

দুই

আজ প্রায় ৫৪ বছর পরে সেদিনের ইতিহাস প্রায় সবটুকুই আমাদের জানা৷ কিন্তু সেদিনের কথা যাবার আগে ২০ তারিখের কথা আমরা একটু সময় নিয়ে ভাবি৷ সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশ জারি হয়েছে মিছিল করা যাবে না৷ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা সে বিষয়ে পুরোপুরি সচেতন৷ তাঁরা জানতেন, সে মিছিলে পুলিশি হামলা হতে পারে, টিয়ার শেল ছোঁড়া হতে পারে৷ এমনকি আইন অনুযায়ী গুলি করার নির্দেশ দিতে পারে সরকার৷ তবু কোন সাহসে তাঁরা সেদিন অবলীলায় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন? শুধুমাত্র ভাষার প্রতি ভালোবাসায়? শুধুমাত্র বাংলা ভাষার জন্য ভালোবাসা তাঁদেরকে সাধারণের চেয়ে উর্ধে নিয়ে গিয়েছিল?

তখনও পৃথিবী কি আশ্চর্য রকমের সুন্দর ছিল, মানুষ নি:স্বার্থে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে পারত অপরের জন্য, ভাষার জন্য, দেশের জন্য৷ আজ এতদিন পরে বুকের ভেতর দেশপ্রেম বলে যে একটা বায়বীয় অনুভূতি টের পাই, যার প্রায় কোনও গুরুত্বই নেই আমাদের কাছে, টেনে নেওয়া নিশ্বাসের মতন সে অনুভূতি রক্তে এমনকি এক বিন্দু অক্সিজেনেরও জোগান দেয় না, মাত্র অর্ধশতাব্দী আগে সে অনুভূতি কেমন করে এতগুলো মানুষকে কি অসম্ভব বলীয়ান করে তুলেছিল, যে, তাঁরা জীবন দিতেও দ্বিধা করেননি!

ধরে নিন আজ ২০ ফেব্রুয়ারি৷ আজ রাতে ঘুমোবার আগে ভেবে নিন, কাল আমরা মিছিলে যাব৷ সালাম বরকত আর রফিকের পাশে হাঁটব৷

--------
প্রথম প্রকাশঃ বাংলালাইভ

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ২০, ২০০৭

সমলোচনার ভাষা কীরকম হবে?


সমালোচনা-টা বাংলা সাহিত্যের একটা হৃষ্টপুষ্ট শাখা হয়ে উঠতে পারলো না, এই নিয়ে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বেজায় দু:খ করেছেন নানা জায়গায়। আমিও ভেবে চিন্তে দেখলাম, কান কথায় শুনেছি- শনিবারের চিঠি বলে একটা ব্যাপার ছিলো বহু আগে, যেটায় নাকি গায়ে বিছুটি লাগানো সমালোচনা হোত। কিন্তু ইদানীংকালে আমরা সেরকম আর দেখি কই!

এখনকার সমালোচনাগুলান তেমন আকর্ষক হয় না। ব্লগের কথা অবশ্য আলাদা। এইখানে সমালোচনার পারদ মরুভুমির টেম্পারেচারের মতন ওঠানামা করে। কিন্তু প্রচলিত সাহিত্যের সমালোচনা গুলা হয় প্রশংসায় পঞ্চমুখ, নয়ত রেখেঢেকে নিরাপদ বেষ্টনীর এপাশ থেকে পাঁচ কথা শুনিয়ে দেয়া।

সত্যজিত রায়ের “বিষয়:চলচ্চিত্র'' পড়ছিলাম। নানারকম খুঁটিনাটি নিয়া দারুন সব কথাবার্তা। “চারুলতা' প্রসঙ্গে' নামের লেখাটা পড়ার সময় মজা পেয়ে গেলাম। রুদ্র নামক কোন একজন সমালোচককে প্রায় ধুয়ে মুছে ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। এই লেখাটাকে অবশ্য সরাসারি সমালোচনা বলা যায় না, তবে টেকনিক্যালি এটা সমালোচনামূলকই। মানে সমালোচকের সমালোচনা আর কি!

রুদ্র মশাই কি লিখেছিলেন, সেইটা জানার বিস্তর আগ্রহ হচ্ছে। আর কোথাও সত্যজিৎএর এইরকম আক্রমনাত্মক রূপ দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বিশেষ করে দুইটা জায়গায়। একখানে বলেছেন, “ রুদ্র মশাই সাহিত্য বোঝেন কিনা জানি না; সিনেমা তিনি একেবারেই বোঝেন না। শুধু বোঝেন না নয়; বোঝালেও বোঝেন না। যাকে বলে একেবারে বিয়ন্ড রিডেম্পশন।''
অথবা ঐ জায়গাটা- যেখানে বলেছেন- “মুশকিল হয়েছে কি, সিনেমাটা একেবারে বারোয়ারি শিল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। . . . . . সিনেমার ব্যাপারে দেখি, যাঁরা 'সংগম' দেখছেন, তাঁরাই 'লা দোলচে ভিতা'তেও উঁকি দিচ্ছেন। “

জব্বর আরাম পেয়েছি পড়ে। বড় সাহিত্যিক বা সমালোচকেরা ব্যক্তিগত আক্রমন না করে নীরিহ সমালোচনা করে- এমন কথা বলে কোন বোকা!


সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০০৭

সুনীলের কবিতা বিষয়ক কবিতা-

অল্প বিস্তর চটি গল্প বা উপন্যাস ছাড়া সুনীল গাঙ্গুলীর বাদবাকী গদ্য বেশ ভালো লাগে। তবে ওনার কবিতার তেমন ভক্ত না।
আজ উলটাইয়া পালটাইয়া দেখতে গিয়া এই কবিতাটা বেশ পছন্দ হইলো।

আঙুলের রক্ত
--------------

ঘর শব্দটি কবিতার মধ্যে এলে আমি তার দরজা দেখতে পাই না
অথচ দরজা শব্দটির একদিকে ঘর, আর একদিকে বারান্দা
বারান্দার পাশেই নিম গাছ
আমার শৈশবের নিম গাছের স্মৃতির ওপর বসে আছে একটা ইস্টিকুটুম পাখি

যদি ঐ পাখিটিকে আমি কখনো কবিতার খাঁচায় বসাই নি
শব্দের নিজস্ব ছবি তা শব্দেরই নিজস্ব ছবি
শরীরর শিহরন যেন মাটির প্রতিমার সর্বক্ষণ চেয়ে থাকা
যেমন পাথর ধুলো হয়ে যায় কিন্তু জল বার বার ফিরে আসে
কবিতায় কে যে কখন আসে জানি না
শুধু আমার আঙুল কেটে রক্ত পড়লে তা নিয়ে কবিতা লেখা হয় না।

-

দোজখের ওম-


ফাল্গুন চলে বাংলাদেশে, আর চৈত্রের সব গরম যেন পড়ছে এই মেলবোর্ণে!
গরমে জান উথালি বিথালি করে, আসমান থেইকা য্যান দোজখের আগুন পড়তাছে গইলা গইলা। গলা পর্যন্ত পানি খাইছি সারাদিন, তবু জানি তিয়াস মেটে না। শইল্যে কাপড় রাখলে লাগে গরম, আর খুললে মনে হয় ছ্যাকা খাইতেছি!
-কও দেখি মা কই যাই?
--বাজান, তুমি গাছে ওঠো!

আইজকা গাছের ছায়াগুলানও মনে হয় আগুনে টগবগাইয়া ফুটতাছে! মাথায় কি ভুত চাপলো, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দোজখের ওম পড়া শুরু করছি।
ভেতর বাইর মিলাইয়া আইজকা আমি আগুন এককেরে!
হক্ব মাওলা!


-----------
পিকচার: মারিং ফ্রম হিয়ার

তুমি বরুণা হলে-

আমাদের গ্রুপ মেইলে আহমেদ একটা গানের লিংক পাঠাল- সাথে কমেন্ট- গানটা কি দেখছিস তোরা? দেইখা আমার তো ব্যাপক ভাব জাইগা উঠলোরে!
শুনে দেখলাম, আসলেই, ব্যাপক ভাব জাগার মতই।




শিল্পী- মাহাদী।
গীতিকার- আসিফ ইকবাল।

বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০০৭

ভুতে ধরা দিন-


দেশ থেকে এবার বেশ কিছু প্রিয় বই নিয়ে এসেছি। তারই একটা বইয়ের ভেতর হঠাৎ “মরাল'' খুঁজে পেলাম।
আমাদের পত্রিকা “যুযুধান' বের করার পর, পোষ্টারে আমার নাম ও রুম নাম্বার পেয়ে খুঁজে খুঁজে আমার রুমে এসেছিলো মূর্তালা রামাত। মরালের সম্পাদক। হাতে মরালের বেশ কয়েকটা সংখ্যা। লিফলেট ধরণের এই পত্রিকাগুলোকে মাইক্রোম্যাগ বলে। ওর কাছ থেকে নিয়ে বেশ কিছু সংখ্যা প্রায় এক বসাতেই পড়েছিলাম, অবাক লাগছিলো- এইটুকু ছোট্ট জায়গায়ই ওরা কি প্রচন্ড শক্তি ধরে!

মুর্তালার সাথে বন্ধুত্ব গভীর হতে বেশি সময় নেয় নি। একসাথে অনেক সময় কাটিয়েছি পরে। আমি যুযুধান নিয়ে আমার স্বপ্নের কথা বলতাম, আর ও কথা বলতো মরাল নিয়ে। ওর কাছে যুযুধানের জন্যে কবিতা চাইতেই ওর পুরো কবিতার খাতাটা এনে দিয়েছিলো আমাকে।
আমাদের বয়েসী যে ক'জন কবিকে চিনি আমি, তাদের মধ্যে মূর্তালার কবিতা উল্লেখযোগ্য রকম শক্তিশালী- কোন সন্দেহ নেই।
এবার গিয়ে সময়ের টানাটানিতে ছিলাম, তবু দেখা হয়েছে ওর সাথে। একটা প্রাইভেট রেডিওতে ঢুকেছে বললো, আরো জানালো - ইদানীং গান লিখছে। খুব মজা লাগলো শুনে।

পত্রিকা বের করাটা খুব সহজ কাজ নয়। মাথার মধ্যে ভুত চাপতে হয়, নাহলে হয় না।
আজ অনেকদিন পর মরাল দেখে সেই ভুত চাপা দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেলো। পুরোনো বন্ধুদের কথা মনে পড়ে গেলো।

আহা,
কোথা লিখে রাখি এত প্রিয় নাম,
যারা পাশাপাশি একদা ছিলাম!

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ১৪, ২০০৭

আজ তোমার মেঘে মেঘে রঙধনু


টুকটাক-
---------
আজ কি টিপ দিয়েছিলি? আজ কী টিপ দিয়েছিলি?
কালো, নাকি লাল?
আমায় ভেবে একটু রাঙা, হলো কি তোর গাল?
আজকের আকাশ-
মেঘ কি ছিলো তাতে?
নাকি নীল মেঘেরা চূড়ি হয়ে ভাসছিলো তোর হাতে?

মনে পড়ে রুবি রায়
------------------
প্রিয় ফুল নিয়ে কোন মাতামাতি নেই। ভাবাভাবিও নেই। তবে প্রিয় ফুল গাছ আছে একটা, কৃষঞচূড়া। লাল লাল আগুন রঙা ফুলগুলো যখন গাছ ভর্তি হয়ে থাকে, আমার তখন মাথা খারাপের মতন হয়ে যায়। চনদ্্রাহতের মত তাকিয়ে থাকি আমি।

অনেক বছর আগে, মনে পড়ে, বেড়াবার জায়গা খুঁজে না পেয়ে দু'জনে সদরঘাটে চলে গিয়েছিলাম আমরা। পাঁচটাকা দিয়ে টিকেট কিনে সোজা লঞ্চঘাটে। সবকয়টার সামনে গিয়ে ব্যাকুল জিজ্ঞাসা আমাদের, কটায় ছাড়বে এটা? একজন যেই বললো, আরো ঘন্টা তিনেক পরে, টপ করে উঠে গেছিলাম সেটায়। তারপর সোজা ছাদে। বুড়িগঙ্গার দূষিত বাতাসে নি:শ্বাস নিতে নিতে কতই না গল্প আমাদের!
তারপর সেই ঝালমুড়ি? পৃথিবীর সবচে মজার ঝালমুড়ি পাওয়া যায় সেখানে, বাজি লাগতে চাইলে বাজি!
তারপর যেই ঘোষনা হলো লঞ্চ ছেড়ে দিবে, দু' জনে তাড়াহুড়া করে নেমে পড়লাম।
নিজের মনেই হাসি আজো, লোকে শুনলে কি ভাববে? সদরঘাটে বেড়াতে যায় মানুষ!!
যে যাই ভাবুক, রবি কাকু বলে গেছেন, তোমারও অভিসারে, যাবো অগম পারে..।

ফিরেছিলাম কেমন করে মনে আছে? টমটমে চড়ে। দুজনে, রূপকথার গল্পের রাজা-রাণীর মত।
রাজা রাণী? হা হা হা! আমি পরেছিলাম খাদির একটা ভাঁজ পড়া পুরোনো শার্ট আর তুই পরেছিলি লাল টুকটুকে একটা জামা।
লাল, টুকটুকে, আগুনরঙা; ঠিক যেন কৃষঞচূড়া!


যে তার রুমাল নাড়ে-
-----------------
... চক্ষের ভিতর থিকা সোহাগের পাখিরে উড়াও,
বুকের ভেতর থিকা পিরীতের পূর্ণিমার চান;
নিজেই তাজ্জব তুমি- একদিকে যাইবার চাও,
অথচ আরেকদিকে খুব জোরে দেয় কেউ টান। ...

আজ দিন কাটুক গানে
------------------
আকণ্ঠ গানে ডুবে আছি, সারাদিন, সারারাত।

ভাবতেই পারো ক্লান্ত কোন দুপুরে, ধূলো মেখে মেখে বেজে ওঠা নুপুরে,সুর মেলে ডানা আকাশেরও ওপরে।
যাও যদি সুদূরপানে, চেনা কোন অন্যখানে।
ভালোবাসা মেঘে ঘেরা, আসবে যে আমার মনে।
আজ তোমার মেঘে মেঘে রঙধনু, আজ তোমার মেঘে রঙ!
আজ তুমি মেঘে মেঘে যেমন ইচ্ছে তেমন-
ভালোবাসা নিয়ে আসি আজ আমি, মেঘে মেঘে সারাক্ষণ।


.


-----------------------
টুকটাক- নিজস্ব দূর্বল অনুভূতি।
বাকি সব কৃতজ্ঞতা-
১। পরাণের গহীন ভেতর- সৈয়দ শামসুল হক।
২। ছবি সুত্র- ভ্যালেন্টাইন লাভার
৩। গান- ভাবতেই পারো- প্রেয়ার হল।


শনিবার, ফেব্রুয়ারী ১০, ২০০৭

মন্টি-

.

যাত্রীর নতুন এলবাম "ডাক" এর একটা গান শুরু থেকেই খুব পছন্দের। গানটা হলো- খুব, তুমি জিতছো।
গানের শুরুতে খুব মজা করে একজন বলে, খুব তুমি জিতছো, এলা ক্ষ্যান্ত দাও!
কদিন আগে তিথি জানালো- এই কন্ঠটা নাকি মন্টির! শুনে আরো ভাল লাগলো।
হলে থাকবার সময় ও প্রায়ই আসতো আমাদের রুমে। নর্থ সাউথে পড়ে, কিন্তু ঢাবি-র টিএসসিতে এসে বাংলা কবিতা আবৃত্তি করে, এরকম ছেলে খুব বেশি দেখা যায় না। মন্টির কন্ঠ খুবই সুন্দর। তারচেয়ে বড় কথা, মাইমানসিংয়ের বাকি বন্ধুদের মত ওর কথায় একেবারেই আঞ্চলিকতার টান নেই।
তিথির কাছে শুনবার পরে গানটা আরো কয়েকবার শুনলাম, মন্টির গলা চিন্তা করতেই আরো বেশি বেশি মজা পাচ্ছে!

শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ০৯, ২০০৭

বাচ্চা ভয়ংকর কাচ্চা ভয়ংকর

ইদানীংকালের বাচ্চা কাচ্চারা আক্ষরিক অর্থেই ভয়ংকর! এদের বুদ্ধির তারিফ না করে পারা যায় না, আর দুষ্টামীর বহর দেখলে রীতিমতন আতংকে থাকতে হয়!
এবার দেশে গিয়ে দেখি, তিনবছর আগে যাদের কোলে-পিঠে দেখেছিলাম, তারা সবাই এখন রেলগাড়ির মতন দৌড়াচ্ছে।

অর্ণব, আমার খালাতো ভাই। বয়স সম্ভবত পাঁচ। ওর সবচে' প্রিয় খেলা হলো, সোফার কুশন মেঝেতে ফেলে অনেক দূর থেকে দৌড়ে এসে 'ই-য়া-া-া-হু-উ-উ“ বলে সেটায় লাফিয়ে পড়ে স্কিড করে সামনে এগিয়ে যাওয়া। মোটামুটি শিউরে উঠবার মতন ব্যাপার! যেই মুহূর্তে ও লাফটা দেয়, আমি সাথে সাথে চোখ বুজে ফেলি! এই বুঝি কুশন মিস করে একেবারে ফ্লোরে গিয়ে পড়লো! নাহ, মজা হলো এই যে কিছুতেই সেটা হয় না। একবার সাহস করে চোখ খুলেছিলাম, দেখি স্কিড করে এগুবার সময় ও গরিলার মতন বুকে থাবা দিতে দিতে টারজানের মতন হুংকার দিতে থাকে!
মাথা নষ্ট কারবার!



ওর খেলার সাথী আমার মামাতো ভাই রোহান। বয়েস চার। সারাদিন ধরে কার্টুন চ্যানেল দেখবে। পাপাই দেখতে দেখতে মুখস্খ হয়ে গেছে, তবু তার দেখা চাইই চাই। কখনো আমরা একটু খবর দেখতে চাইলেই পাকা কথা শুরু হয়ে যায়, “ধুরো, সারাদিন খালি খবর আর খবর, তোমাদের জ্বালায় একটু কার্টুনও দেখতে পারি না।''
মাঝে মাঝেই দেখি গম্ভির মুখে বসে বসে কি যেন ভাবে। জিজ্ঞেস করলেই অবিকল বুড়ো মানুষদের মতো করে বলে, “কিচ্ছু ভাল্লাগে না!''

মামাতো বোন আনিকা। সাড়ে তিন বছর বয়স, মারাত্মক সুইট। ওর বড় ফুপি, মানে আমার মায়ের খুব ভক্ত। সারাক্ষণ আম্মুর গায়ে গায়ে লেগে থাকবে, ঘর ঝাড়ু দিবে, চাল বাছবে। ওর মা-কে সারাক্ষণই ঝাড়ির উপর রাখে, তুমি পঁচা, তুমি ভালো না, ফুপ্পি ভালো।
একবার ওর আম্মু ওকে কেন যেন ভীষন বকা দিলো, ও সাথে সাথে কেঁদে কেটে বাসার সবাইকে ডেকে এনে ফরমান দিলো, “ আমি আজ থেকে আমার আম্মুর মেয়ে না, আমি বড় ফুপ্পির মেয়ে!''
আমি এক কথায় মুগ্ধ!





আমার আরেক খালাতো ভাই- ফারহান। বয়স সাড়ে তিন বা চার। এই ভাইজানের বন্ধুবান্ধবরা বিশেষ সুবিধার না। এবং এ কারণেই ওর সবচে প্রিয় শব্দ হলো “গু''!
একবার বাসায় একজন বয়স্ক গেস্ট এলো। তিনি আদর করে ডাকলেন, ফারহান আসো কোলে আসো। ফারহান খানিক্ষণ চোখ গোল করে তাকিয়ে থেকে বললো, আসমু না, তোর পুটকিতে গু!
হা হা হা!
এমনিতে কিন্তু চালাক আছে। ওকে নিয়ে দোকানে গেছে ওর খালা। ওর হয়তো চকলেট খেতে ইচ্ছে করলো, কিন্তু কখনো নিজের জন্যে চাইবে না। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলবে। কথোপকথন মোটামুটি এরকম-
-আন্টি, রোহান কি চকলেট খায়?
আন্টি বুঝে ফেলেন মতলব কি। তাই বলে, না, খায় না।
- তাইলে, আনিকা খায়?
-- নাতো, আনিকাও খায় না।
-তাইলে অর্ণব?
-- উঁহু, অর্ণবও চকলেট খায় না।
এ পর্যায়ে আর থাকতে না পেরে ও বলে কি, আইচ্ছা, তাইলে আমি খাই, আমারেই কিইন্না দাও!

দেশে গিয়ে এবার এদের কান্ড কীর্তি দেখতে দেখতেই আমার অনেক সময় চলে গেছে। আমাদের ছোটবেলায় আমরা এত দুষ্টু ছিলাম? বা এত বুদ্ধি ছিলো আমাদের? মনে হয় না!

ও আচ্ছা, এবার ফারহানের সাথে আমার প্রথম দেখার গল্পতো বলাই হয় নি।
প্রায় তিন বছর পরে দেখা হবে খালার সাথে, তাই দুপুরে খাবার দাওয়াত। কিন্তু আমার একটু দেরি হয়ে গেলো, সবাই না খেয়ে বসে রইলো আমার জন্যে।
আমি গিয়ে সোজা বাসায় ঢুকলাম, আসার আগে সম্ভবত আমার কথাই বলছিলো সবাই। গিয়ে ফারহানকে দেখেই আদর করে বললাম, ফা-র-হা-ন, কেমন আছো?
এতক্ষণ সম্ভবত খিদে চেপে ছিলো, এক সেকেন্ড চুপ থেকে রাগী গলায় বললো, ঐ আইছে, হালার পুতে এতক্ষণে আইছে!

হায়, ধরণী দ্বিধা হবারও টাইম পেলো না! :-০

-----------------------
- নামকরণ: মুহম্মদ জাফর ইকবালের একটি বইয়ের নাম থেকে নেয়া।
ছবি: আনিকা ও রোহান। বাকিদের ছবি খুঁজে পাচ্ছি না। পেলেই দিবো।

ফটুকবাজি


কক্সস বাজারে যাবার পথে সন্ধ্যায়-

ছবির ক্রেডিটঃ কঙ্কাবতী ।

বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারী ০৮, ২০০৭

স্বপ্নাবলী-

গত কয়েকদিনে মোট দু'বার খুব বাজে রকমের দুঃস্বপ্ন দেখলাম।
প্রতিটি ঘটনার কার্যকারণ থাকে, স্বপ্নও তার ব্যাতিক্রম নয়। আমি ভেবে বের করার চেষ্টা করছি দুঃস্বপ্ন দেখার কারণ কি হতে পারে। ইদানীং কি খুব বেশি চিন্তা করছি কোন কিছু নিয়ে? অথবা দুশ্চিন্তা?
একটু একটু করছি বোধহয়।
স্বপ্ন গুলো ভীষন খারাপ। আরো খারাপ ব্যাপার হচ্ছে সেগুলোর সবই প্রায় পুরোপুরি আমার মনে রয়ে গেছে। সুখস্বপ্ন যেরকম হয়- মনে থাকে না, শুধু একটা রেশ রেখে যায়, সকালে ঘুম ভাঙলে পরে মন খুব ভাল থাকে, আর একটা ভীষণ ভাল লাগা অনুভুতি মনের মধ্যে গুন গুন করতে থাকে।
কিন্তু দুঃস্বপ্ন দেখি ঠিক তার উলটো। একেবারে দাঁড়ি কমা সহ মনে রয়ে গেছে, আর ভেতরের ভীষণ বাজে অনুভুতিটাকেও একেবারে শেকড়ের মত গেঁথে দিয়ে গেছে।

আগামী কয়েকদিন যেমন করেই হোক স্বপ্ন বদল করতে হবে, চেষ্টা চরিত্র করে হলেও আধা ডজন সুখ স্বপ্ন দেখে ফেলতে হবে।

বুধবার, ফেব্রুয়ারী ০৭, ২০০৭

নির্জনবাস

ব্লগটাকে আজ একটু একটু করে সময় নিয়ে আপগ্রেড করে ফেললাম। এখনকার চেহারা আমার অনেক পছন্দ হচ্ছে। এই ফরম্যাটের সবচে ভাল দিকটি হলো, ওল্ডার পোষ্টে ক্লিক করে করে পাতার পর পাতা পুরোনো পোষ্টগুলো পড়ে ফেলা যাবে। এটা আমার সবচে পছন্দ হয়েছে।
কিছুদিন পর পর নির্জনবাসে যেতে ইচ্ছে করে- অনেকদিন পর আবার এই অনুভুতিটা ফিরে এলো মনে।

বসে বসে গান শুনছি শুধু।

অর্থহীনের- আমাদের গান

মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারী ০৬, ২০০৭

কবিতা কবিতাঃ প্রিয় বাংলাদেশ

প্রিয় বাংলাদেশ
-----------

গত ডিসেম্বরের কোন এক সন্ধ্যায়-
প্রিয়তির হাত ধরে হেঁটে যেতে যেতে,
শাহবাগের ফুলের দোকানগুলোর সামনে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালাম।
কয়েকবার ডানে বামে তাকিয়ে-
খানিকটা ইতস্তত চোখে,
আর- দোনোমনা করতে করতেই-
- না, না, ফুল নয়-
লাঠির মাথা থেকে নামিয়ে ঠিক একশত টাকা দিয়ে আমি একটা পতাকা কিনেছিলাম।

ঘন সবুজ আর গাঢ় লাল রং তার।
ইচ্ছে ছিলো- লালটুকু দিয়ে ছুঁয়ে দিই প্রিয়তির গাল।
অথবা আদুরে আদরে বলি,
“একটু আঁচলের মত করে জড়িয়ে থাকো না গায়ে!''
বলা হয় নি- কিছুটা ইতস্তত,
আর বিচলিত মন নিয়ে
আমি সেটা প্রিয়তির ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে রাখি।

হাত ইশারায় ট্যাক্সি থেমে পড়ে।
তাতে চড়ে বসে, সঙ্গত অধিকারবোধে আমি প্রিয়তির কাঁধ জড়িয়ে থাকি।

বাবুই পাখির মতন ওম ভরা গায়ে সে কাছে এসে বসে,
আমি আলতো করে তার ব্যাগ খুলে,
অনেকটা নির্লজ্জের মতই ছুঁয়ে থাকি পতাকা।
তড়িচ্চমকের মতন একটা উত্তপ্ত অনুভূতির স্পন্দন যেন
সেখান থেকে আমার আঙুল বেয়ে উঠে এসে,
ঠিক বুকের পেছনে হৃৎপিন্ডের ভেতরে ঢুকে পড়ে।।

প্রিয়তি জানে না-
আজ মাস দুয়েক পরে,
পরবাসে বসে এই নির্জন রাতে
প্রিয়তির ওম জড়ানো আদরের স্মৃতি গায়ে মেখে নিতে নিতে-
হাত বাড়িয়ে বুকের কাছটায় যখন হৃৎপিন্ড ছুঁই-

প্রতিটি স্পন্দনের সাথে আমি তখন দারুন আবেগে-
শুধু তোমাকেই ছুঁয়ে থাকি প্রিয় বাংলাদেশ।।

০৬/০২/০৭

--------------------

ডিসক্লেইমার:
১।এখনো ড্রাফট পর্যায়ে আছে, পুরোপুরি কবিতা হয় নি, তাই এটাকে এখন কবিতা না বলে বরং বলা যায়- কবিতা কবিতা।
২।ঘষা মাজা চলতে পারে, সময় পেলে।

জনম জনম গেল-

খানিকটা বড়ো হবার পরে, যখন তুলনামূলক বেশি মনোযোগ দিয়ে নজরুল গীতি শুনলাম, তখন মনে হলো, মনের বয়েস একটু বেশি না হলে আসলে নজরুলের মজাটা টের পাওয়া যায় না। ভাষার অপরূপ প্রয়োগ আর সেই সাথে অসাধারণ সুরের যে মিশেল, সেটাকে খুব সংক্ষেপে প্রকাশ করতে চাইলে একটা শব্দই বলতে হবে, “ম্যাচিওরড!''

---------------
পদ্মার ঢেউ রে,
মোর শূণ্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা, যা রে।
পদ্মার ঢেউ রে...।
এই পদ্মে ছিলো রে যার রাঙা পা,
আমি হারায়েছি তারে।

মোর পরাণও বধূ নাই,
পদ্মে তাই মধু নাই, নাই রে।
বাতাস কাঁদে বাইরে...,
সে সুগন্ধ নাই রে...।

মোর রূপের সরসীতে আনন্দ মৌমাছি, নাহি ঝংকারে,
পদ্মার ঢেউ রে, মোর শূন্য হৃদয় পদ্ম নিয়ে যা, যা রে।
------------------------

এই মূহুর্তে বেশ কিছু গান ঘুরে ফিরে শুনছি। তার মধ্যে দু'টা হলো আমার সবচে' পছন্দের নজরুল গীতি।
ফিরোজা বেগমের গলায় গাওয়া পদ্মার ঢেউরে ভীষন ভালো লাগে। তবে খায়রুল আনাম শাকিলের গলার গানটিও দূর্দান্ত। একুশে টিভিতে যখন প্রথম শাকিলের গলায় গানটি শুনি, তখুনি খুব ভালো লেগেছিলো।
মজার ব্যাপার, তখনো আমি জানতাম না যে এটা নজরুল গীতি। পরে যখন শুনলাম, ভীষন অবাক হয়েছিলাম, আর ভেবেছিলাম, এত আগেও এত আধুনিক প্রকাশ কী করে সম্ভব!
----------------------------

খুব প্রিয় অন্য গানটিও বেশি শুনি ফিরোজা বেগমের গলায়।

জনম জনম গেলো, আশা পথ চাহি,
মরু মুসাফির চলি, পার নাহি নাহি।
বরষও পরে বরষ, আসে যায় ফিরে,
পিপাসা মিটায়ে চলি, নয়নেরও তীরে,
জানি না আলেয়া শিখা, নিরাশার মরিচীকা,
ডাকে মরু প্রাণনিকা, শত গীত গাহি।
জনম জনম গেলো, আশা পথ চাহি।


ঠিক এরকম একটি গানের জন্যে আসলেই জনম জনম পার করে দেয়া যায়!

যারা এখুনি শুনতে চান গানটি, তাদের জন্যে-

জনম জনম গেলো


রবি ঠাকুরের দুর্বলতা-





একসাথে দু'টা বই পড়ছি এখন। আমার অনেকদিনের বদঅভ্যাস এটা। বড় উপন্যাসের ক্ষেত্রে অবশ্য সম্ভব হয় না। ছোট গল্প বা প্রবন্ধ হলে ঠিকাছে।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের রচনাসমগ্রের প্রথম খন্ডে শুধু তাঁর গল্পগুলো রয়েছে- মোট আটাশটি। পড়ে চলেছি দিনরাত। সেইসাথে যেটা পড়ছি- আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের “ স্বনির্বাচিত প্রবন্ধ ও রচনা' এটাও পড়ছি মন্ত্রমুগ্ধের মত। মজার ব্যাপার হলো- সায়ীদ স্যার এই বইটি উৎসর্গ করেছেন আখতারুজ্জামানকে।
এই সংকলনের প্রথম লেখাটির নাম “ দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ''। রবি ঠাকুরের সাহিত্য এবং তার সম্পর্কিত তাঁর ব্যাক্তিগত নানারকম দুর্বলতা নিয়ে সেমি-রুঢ় আলোচনা করেছেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ।
রবীনদ্্রনাথকে নিয়ে এরকম আলোচনা অবশ্য নতুন নয়। তবে বিশেষ করে এই প্রবন্ধটির যৌক্তিকতা অনেক বেশি মনে হয়েছে আমার কাছে।
স্ক্যান করে ব্লগারদের জন্যে তুলে দিলাম এখানে (যদিও কাজটার বৈধতা নিয়ে আমি ব্যাপক সন্দিহান, কিন্তু সবাইকে পড়ার সুযোগ করে দিতে ইচ্ছে করছে)।
পড়ার পরে ইচ্ছা হলে এখানে আলোচনা করা যেতে পারে।