বৃহস্পতিবার, মে ৩১, ২০০৭

লোপা এলেন, লোপা গেলেন-



কিন্তু যাবার আগে জয় করতে পারলেন কি না, সেটা আমি বাদে অডিটরিয়মে উপস্থিত বাকি সব দর্শক শ্রোতারা জানেন।
আমি জানি না, কারণ বহু আগেই তিনি আমাকে জয় করে ফেলেছেন। অন্য সবাই যখন তাই ফুলগুলো বুকপকেটে লুকিয়ে এনেছিলো, যদি পছন্দ হয়, তবেই তাঁকে পরাবেন ভেবে, আমি তখন ঢাকঢোল সহ লাল গালিচা নিয়ে উপস্থিত সেখানে!
তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক থাকতে পারি নি শুনে। বাকি সবার সাথে তাই প্রায়শই চেঁচিয়ে উঠেছি, আরেকবার হবে, ওয়ান মোর!
তো গাইলেন লোপামুদ্রা, পুরো শরীর আর মন দিয়ে, আমিও দেখলাম তাঁকে, শুনলাম মাত্র পনের গজ সামনে বসে। পনের গজ অনেক দূর ভাবছেন নাকি? উঁহু, ভুলে যাবেন না, ক্রিকেট পিচের দৈর্ঘ্যও মিনিমাম বাইশ গজ। তারই দু'প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুই ব্যাটসম্যানের মধ্যে কতই না আন্ডারস্ট্যান্ডিং! পনের তার চেয়ে কম হলো না?!?
মেলবোর্ণের মূল শহর থেকে দূরে, কোন একটা খটোমটো নামের অডিটরিয়ামে দাঁড়িয়ে, তিনি সর্বমোট বিশ বা বাইশটি গান গাইলেন। গানের পছন্দগুলো এলোমেলো ছিল না। সেটা বুঝলাম যখন দর্শকদের নিজস্ব পছন্দ জানবার পরেও তিনি পুরোটা সময়েই তাঁর মত করে নিজের সিরিয়ালেই গান গাইলেন। এর ফলে যেটা হলো, সারাক্ষণই একটা উত্তেজনা ছিলো- এর পরে কোনটা গাইবেন!
পছন্দের প্রায় সব গানই গাইলেন, যাও পাখি, আমার দেশ, হল্লা রাজা...। অসাধারণ কিছু রবীন্দ্রসঙীতও গাইলেন তিনি- গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ, আমারো পরাণ যাহা চায়...।
বেণীমাধব গাইলেন অনেক পরে। আর জানালেন, লোপামুদ্রা আর বেণীমাধব আলাদা কেউ নয়, একসময় লোকে লোপামুদ্রাকে চিনতো না, চিনতো বেণীমাধবকেই।
তবে নিজের গান বাছাই করতে গিয়ে পপুলারিটি দেখেন নি তিনি। বেশ কিছু স্বল্পপরিচিত গানও গেয়েছেন। যে কোন কনসার্ট বা এ জাতীয় অনুষ্ঠানে এ ব্যাপারটা একটু রিস্কি হয়ে দাঁড়ায়, শ্রোতাদের মনোযোগ হারানোর একটা আশংকা থাকে, কিন্তু লোপামুদ্রা দিব্যি উৎরে গেলেন!
বেশ মজা করতে পারেন তিনি। দর্শকদের সাথে কথা বলছিলেন গানের ফাঁকে ফাঁকে। পাশে দাঁড়িয়ে গীটার বাজানো ওঁর স্বামী জয় সরকারকে গান গাইবার অনুরোধ করতেই চটুল গলায় বলে উঠলেন-, কেন বলুনতো? আমি একটু গান গেয়ে পেট চালাই, এটা আপনারা চান না বুঝি!
তারচেয়ে জমলো যখন একজন প্রবীণ ভদ্রলোক জিজ্ঞেস, ' নজরুল গীতির কি অবস্থা?'' লোপা কাঁচুমাচু মুখ করে জানালেন, ' অবস্থা তো বেশি ভালো না!'' সবার সে কি হো হো হাসি!
দর্শকদের অনুরোধ ছিলো অনেক, সেকারণেই তার বেশিরভাগই গাইলেন না তিনি। এমনিতে এ রকম জায়গায় আমি চুপ মেরেই থাকি, তবু সেদিন জড়তা ভেঙে গলায় অনেকটুকু জোর এনে বেশ কয়েকবার জানান দিয়েছিলাম আমার পছন্দ- ' সহে না যাতনা' শুনতে চাই। তিনি সেটা শুনেওছিলেন, বুঝলাম যখন কথাটা পুনরাবৃত্তি করলেন, কিন্তু শেষমেষ লোপা গাইলেন না সেটা! যদিও শুধু এই গানটা শুনবার জন্যে কাজ বাদ দিয়ে দেড় ঘন্টা ড্রাইভ করে অনুষ্ঠানে এসেছিলাম বলা যায়!
প্রায় তিন ঘন্টার এক জাদুকরী মুগ্ধতার পরে অনুষ্ঠান শেষ হলো। কেন শেষ হলো, এই অনুযোগটা যে কার কাছে করবো বুঝতে পারছিলাম না!
লোপা নেমে এলেন মঞ্চ থেকে। অনেকেই এগিয়ে গিয়ে কথা বললেন তাঁর সাথে। সুন্দর হেসে জবাব দিলেন সবার কথার। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছিলো, কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে জড়তা কাটছিলো না।
তবু শেষমেষ এগিয়ে গেলাম। বেশ খানিকক্ষণ দোনমনার পরে শুধু বললাম, ''খুব ভাল লাগলো।'' তিনি হাসলেন। ''সহেনা যাতনা গাইলেন না কেন?'' শুধু এটুকুই বলতে পারলাম। তিনি বললেন, ''আসলে অনেকগুলো রবীন্দ্রসঙীতের অনুরোধ ছিলো, সব কি আর গাওয়া যায়! ''
''তা যায়না, কিন্তু এ গানটা আপনার চেয়ে ভাল আর কেউ গাইতে পারে না যে! '' নাহ, মুখ ফুটে বলতে পারি নি সেটা। মনে মনেই বললাম শুধু।
তার পর কয়েক সেকেন্ড বিরতির পরে 'ভাল থাকবেন' বলে চলে এলাম।
ঐ কয়েক সেকেন্ড কেউ কোন কথা বলি নি। কেন বলি নি, সেটা নিয়ে আজ অনেকক্ষণ ভাবতেই মনে হলো, আসলে এরকমই হয়, দু'জন গ্রেট মানুষ এরকম সামনা সামনি এলে কথা হারিয়ে ফেলতেই পারে!
এ আর নতুন কি! :-))


বুধবার, মে ৩০, ২০০৭

গলাগলি আর গালাগালি-


গলাগলি আর গালাগালি।
না না। ইহারা দুই ভাতৃদ্বয় নহেন। সেরম কিছু হইবার সম্ভাবনা কস্মিনকালেও নাই, তবে এই নামে দুইখানা নৌকার স্যাংশান হইবে বলিয়া শুনিয়াছি।
বাজারে গিয়া দেখিলাম সেই নিমিত্তে জোরে শোরে বৃক্ষ কর্তন চলিতেছে। আমি সব দেখিয়া শুনিয়া খুঁজিয়া পাতিয়া তিনখানা জবরদস্ত পেরেক কিনিয়া আনিলাম।
দুইখানার যে কোন এক নৌকায় উঠিতেই হইবে, এমনটা আমার বোধ হইলো না। থাকুক তাহারা তাহাদের বৃহৎ তরণী লইয়া। আমি ক্ষুদ্র মনিষ্যি, কাহারো বোঝা বাড়াইতে চাহি না।
আমি তাই আরামসে পেরেক ঠুকিয়া ঠুকিয়া আমার পুরানা ডিঙিখানা বেশ অনেকখানি সময় লইয়া মেরামত করিলাম।
অতঃপর তাহাতেই চড়িয়া বসিয়া একেলা মাঝি নদী বাহিয়া যাই,
কেউ শুনে বা না শুনে বেসুরা গলায় দেশেরই গান গাই!

শনিবার, মে ২৬, ২০০৭

ব্লগের আবার জাত কীয়ের-


কথাটা শুনতে ভাল শোনায়, কিন্তু বাস্তব তার উল্টা। সকল ব্লগ মূলত ভাই ভাই নয়। দুঃখজনক ভাবে ব্লগীয় উম্মাহ নামে কোন বৃত্তের অস্তিত্বও নেই, যার বাউন্ডারির ভেতরে 'সব ব্লগই সমান' স্লোগান নিয়ে ব্লগেরা বেঁচে থাকবে।
ব্লগের ভেতর খুব স্পষ্টভাবেই জাতপাত বিদ্যমান। ভাল ব্লগ বা খারাপ ব্লগ বলছি না। লেখার মানের উপর নির্ভর করে যে বিভাজন, সেটা হবেই, ভালো মানুষ বা খারাপ মানুষের মতন। আমি বলছি উঁচু জাতের ব্লগ, আর নীচু জাতের ব্লগের কথা, আশরাফ আর আতরাফ ব্লগ।
বাংলাদেশী ব্লগারদের কথা যদি ধরি, তাহলে সবচেয়ে উঁচু জাতের ব্লগার হলেন তারা যারা ইংলিশে ব্লগান। আন্তর্জাতিকতার বিবেচনা করলে অবশ্য ঠিকই আছে, সবচেয়ে বেশি ব্লগারদের কাছে পৌঁছবার জন্যে ইংলিশই ভালো। সুতরাং ইংরেজি ব্লগারদের জাত উঁচু হয়ে যাওয়াটায় কারো কোন হাত নেই। বাংলা ব্লগাররা তাই দূর থেকে ঈর্ষান্বিত চোখে তাদের দিকে তাকানো ছাড়া বেশি কিছু করতে পারবেন না।
জাত-পাত আছে বাংলা ব্লগগুলোর মধ্যেও।
এ ক্ষেত্রে উঁচু জাত হচ্ছে- যারা খানিকটা গম্ভীর বিষয়ে লিখেন। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি - এইসব ব্যাপারগুলো নিয়ে। অপেক্ষাকৃত মাঝারি জাতে পড়েন টেকনিক্যাল বিষয়ে ব্লগিং করেন যারা, মানে ভাইটিদের যারা আইটি শেখানোর অপচেষ্টা চালান। আর একেবারে নীচু জাতে পড়েন সেইসব ব্লগাররা, যারা ওয়েবলগ লিখেন। বুঝাতে পারলাম? মানে কি খাইলাম কি করলাম, অথবা আজকের আকাশ কেবলই কর্দমাক্ত, এই সব হাবিজাবি মনের কথা লিখেন যারা।
কবিতা বা গল্প লেখকরা আদৌ কোন জাতে পড়েন কি না, সেই বিষয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ আছে!

এই জাত্যাভিমান চিরস্থায়ী কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ, তবে উত্তর আপাতত 'হ্যা'। আমাদের সামাজিক মানসিকতাটুকু আমরা পকেটে লুকিয়ে ব্লগে আসি না, তাই এখানেও সেই একই রকম দৃষ্টিভঙ্গী আসাটাই 'স্বাভাবিক'।
এই জাত-বিজাতের ভাল মন্দ বলেও সুস্পষ্ট কোন আউটপুট আসলে নেই। এটা কেবলই আমাদের মনে হওয়া, উঁচু জাতের ব্লগাররা এইসব ভেবে মানসিক আনন্দ লাভ করতে পারেন, আর নীচু জাতের ব্লগাররা এটা টের পেয়ে 'কী আসে যায়' টাইপ একটা ভাব মেরে সময় কাটিয়ে দিতে পারেন।
কারো লাভ বা ক্ষতি বৃদ্ধি তাতে হচ্ছে বলে মনে হয় না।

সুতরাং বহু প্রাচীণ কাল পূর্বে কবি যদিও বলেছিলেন, নহে আশরাফ আছে শুধু যার বংশ পরিচয়, বেচারা কবি জানতেন না, মানবসমাজ তো বটেই, এমনকি ব্লগসমাজেও তার এই কবিতা খুব বেশি পাত্তা পাবে না। জাত-পাতের ব্যবধান সেখানেও সগর্বে রয়ে যাবে!


------------
ডিসক্লেইমারঃ
১। এতক্ষণ যা কিছু হাবি জাবি বললাম, বলাই বাহুল্য এটা আমার মনের কথা নয়। সম্প্রতি ব্লগ বিষয়ক নানা জ্ঞানী ব্যক্তিদের আলোচনা-সমালোচনা পড়ে আমার এইরূপ ধারণা হলো, তাই মনে হলো এই বিষয়ে ভুল-ভাল বকে পোষ্টের সংখ্যা আরো একটা বাড়াই।
২। এই পোষ্টের নামের জন্যে চোর-এর প্রোফাইলের কাছে শতভাগ ঋণী, তার কাছে তাই অসীম কৃতজ্ঞতা!

শুক্রবার, মে ২৫, ২০০৭

হেলাল হাফিজঃ বাইসাইকেল থিফঃ ভ্যালেরি এ টেইলর




প্রায়শই নির্জনে বসে ভাবি, সম্ভবত আমার ভেতরে কোথাও নীরবে নিভৃতে একজন হেলাল হাফিজ বাস করেন। অথবা হয়তো আমার নয়, আমাদের সবারই, আমাদের মানে-, আমরা যারা কবিতা ভাবি, হয়ত বা লিখি না সবসময় কিন্তু কবিতায়ই বসবাস করি। সেই কবিতাজীবি আমাদের সবার ভেতরেই আছেন একজন হেলাল হাফিজ।
একজন প্রেমিক ও সৈনিক হেলাল হাফিজ, যিনি সভ্যতাকে উদ্দেশ্য করে কটাক্ষ করেন, 'অশ্লীল সভ্যতা, নিউট্রন বোমা বোঝ, মানুষ বোঝ না!' যিনি আমাদের কানে কানে মন্ত্র পড়ে শোনান, 'এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।' আবার তিনিই যখন হাতের পাঁচটি আঙুলকে নিরাশ্রয়ীর ছদ্মবেশ দিয়ে প্রিয়তমাকে স্পর্শ করার ষড়যন্ত্র করেন, আমরা পুলকিত হই। জলের আগুনে জ্বলে পুড়েন যিনি, সেই হেলাল হাফিজ যখন লিখেন-
'মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক হবে
এরকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই,
উত্তর পুরুষে ভীরু কাপুরুষের উপমা হবো
আমার যৌবন দিয়ে এমন দুর্দিনে আজ
শুধু যদি নারীকে সাজাই। ''

-আমি তখন মুগ্ধ হয়ে পড়ি। প্রায় নিরুপদ্রব জীবনের কোন এক অবসর মুহূর্তে যখন আমি এ কবিতাটি পড়ি, মাথার ভেতরে কিছু ভাবনা কিলবিল করে ওঠে। ঠিক এমন করে জীবন পার করে দেয়াটা উচিৎ হচ্ছে কি? আমার তো একটা কিছু করার কথা ছিলো।
মানব জন্মের নামে আমারও কলঙ্ক হচ্ছে না তো?

------------------------------

প্রায় বছরকয়েক আগে, সম্ভবত গ্যোথে ইনস্টিটিউটের কোন এক হল রূমে বসে, ঢাবি-র চলচ্চিত্র পরিষদের সদস্য হিসেবে দেখছিলাম 'বাইসাইকেল থিফ' সিনেমাটি।
সাদাকালো সিনেমা, অনেক বছর আগের, প্রিন্ট ভাল ছিল না তবু তারই ফাঁকফোকরে একজন অভাবী বাবা ও তাঁর সন্তানের আকুতি পড়তে একটুও অসুবিধে হয় নি। বেকার বাবা অবশেষে চাকরি পায়। শহরের দেয়ালে দেয়ালে পোষ্টার লাগাতে হবে তাকে। কিছুই প্রয়োজন নেই, শুধু দরকার একটা বাইসাইকেল। পরিবারের সম্বল বিক্রি করে সেটা সে কিনেও ফেলে। কিন্তু কাজের প্রথম দিনেই সেটা চুরি হয়ে যায়। তারপরে পিতা পুত্র বিষন্ন চেহারায় ঘুরে ফিরে এখানে সেখানে। আবারো অনাহারের দুশ্চিন্তা মাথায় তাদের।
ঠিক এমনি সময়ে তারা দেখে অনেকগুলো সাইকেল একসাথে রাখা, সম্ভবত কোন অফিস ছিলো সেটা, অথবা রেস্তোরাঁ, ভুলে গেছি। খানিকটা দোনোমনা করে বাবা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, এখান থেকে একটা সাইকেল চুরি করবে সে, করতেই হবে। কিন্তু সাইকেল চুরি করে নিয়ে দৌড় শুরু করতেই ধরা পড়ে যায় সে! চারপাশের লোকেরা ছুটে আসে, ছেলের সামনেই চলে নির্দয় প্রহার! প্রচন্ড আক্রোশে তারা মারতে থাকে ধরা পড়া সাইকেল চোরকে।
সিনেমাটা বোধহয় এখানেই শেষ হয়েছিল। ভাল মনে নেই। তবে মনে আছে, শেষ হবার পরেও বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তি ঘুরপাক খাচ্ছিলো যেন। অনেকক্ষণ, কি যে সেটা বুঝতে পারছিলাম না, শুধু মনে হচ্ছিলো, এক্ষুণি একটা কিছু করা দরকার আমার! ঠিক এক্ষুণি!
ছবি শেষের ঘোর কাটবার আগেই মাইক হাতে উঠে এলো সহপাঠী আশা, মৃদু স্বরে বললো, 'আমি জানি, এ ছবি দেখার পরে আমাদের সবার ভেতরে একটা প্রচন্ড ইচ্ছা জাগছে...।' আর, তখুনি, আশা বলে দিতেই, আমি চমকে উঠে ভাবি, তাইতো! আমার তো সত্যিই এখন ইচ্ছে করছে এক ছুটে বেরিয়ে গিয়ে কোথাও থেকে একটা সাইকেল চুরি করে আনি! ঠিক এক্ষুণি!

-----------------------------

আজ অনেকদিন পরে আবার সেই অনুভূতি ফিরে এলো মনে।
অলস বিকেলে সময় কাটাতেই ব্লগে ঢুকলাম। তারপরে এক এক করে পড়লাম ভ্যালেরিকে নিয়ে লেখা জেবতিক আরিফের পোষ্ট, আগেই পড়া ছিলো, তবু আবারো পড়লাম জানালা-র পোষ্টটাও।
আর তারপর থেকেই আমার বুকের ভেতরে একটা অস্বস্তি দানা বেঁধে আছে। কেবলই মনে হচ্ছে, একটা কিছু করা দরকার আমার, আমাদের সবার। কি সেটা জানি না, বুঝে উঠতেও পারছি না ভাল করে, শুধু বুকের গভীরে কোথাও মনে হচ্ছে, উত্তর পুরুষে আমরাও ভীরু কাপুরুষের উপমা হচ্ছি না তো?

....................
সম্পর্কিত আরো কিছু লিংকঃ
১। সাপ্তাহিক ২০০০ এর রিপোর্ট।
২। সি আর পি ওয়েবসাইট।
৩। জেবতিক আরিফের পোষ্ট
৪। জানালা-র পোষ্ট।


যদি আপনি হন এ প্রজন্মেরই কেউ-

যদি হন আপনি, এ প্রজন্মেরই কেউ, আর প্রায় অবুঝ চেহারা নিয়ে যদি আপনি, প্রায়শই বলে ওঠেন-'' না তো, জন্মযুদ্ধ দেখি নি আমি, জানি না তো কি হয়েছিলো তখন; কে বা কারা, কি করেছিলো!''

আমরা- বোকাসোকা কিছু মানুষ-, যদি তখন, আদর করে গল্প শোনাই আপনাকে-, কেমন করে অনেক অনেক দিন ধরে আমাদের মায়েদের অশ্রু ভিজিয়েছিলো এ মাটি; অথবা, কেমন করে আমাদের ভাইয়েদের রক্তে এ সবুজ পতাকা হয়েছিলো লাল; কেমন করে তিরিশ লক্ষ বোকা মানুষ, মৃত্যুর বিনিময়ে এনে দিয়েছিলো স্বাধীনতা...।

সব দেখে এবং শুনে, এইবার, খানিকটা বুঝদার চেহারার আপনি যদি বলেন, ' হুমম, কিন্তু সংখ্যাটা যে শুনেছিলাম- তিন লক্ষ! আর মুজিব, হু হু, তিনি কিন্তু স্বাধীনতা চান নি, আপনারা জানেন না?''

অথবা, যদি বলে ওঠেন, ' গোলাম আযম- তিনি তো অপরাধী নন, আর রাজাকারেরা, ভেবে দেখুন, তারা তো নিজের দেশ ভাংতে চায় নি শুধু, ওরাইতো সাচ্চা দেশ প্রেমিক!''

আমরা- বোকাসোকা কিছু মানুষেরা-, একটুও না রেগে তখন, অনেকগুলো বধ্যভূমি খুঁজে, গুনে গুনে ... হয়ত আপনার হাতে তুলে এনে দিবো তিরিশ লক্ষ মৃতের তালিকা। হয়ত কোন সন্তানহারা মা, আপনাকে বলে যাবে হত্যাকারী অগণিত রাজাকারের নাম...।

তবু, হ্যা, তবুও যদি আপনি বলেন, '' থাক না..., এত বছর বাদে, কেনই বা এসবের টানাটানি, আসুন তারচেয়ে, কাঁধ মিলিয়ে, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাই, ভাইয়েরা আসুন আমরা, কাতার সোজা করে দাঁড়াই। ''

একটুও না রেগে, বিশ্বাস করুন, কাতার ভেঙ্গে, বাবার কফিন বয়ে ভারী হয়ে ওঠা আমাদের কাঁধ টেনে নিয়ে এসে, আমরা- কিছু বোকা মানুষেরা, প্রায় একবারও আপনাকে 'ছাগল' না ডেকে, আয়নাটা নিয়ে এসে আপনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবো, ' ভালো করে দেখুনতো চেয়ে, মাথার উপরে দু'খানা বাঁকানো শিং দেখা যায় কি না আপনার, অথবা চারখানি লিকলিকে ছাগুলে ঠ্যাং? ''

অথবা, হয়তো, কে জানে, আমরা, আপনাকে শুধু, রোজ সকালে এক হাঁড়ি ভাতের মাড়, আর এক মুঠো লবণ মিশিয়ে, ভর পেট খেতে বলবো।
না না, স্যালাইন ভেবে নয়।

আমাদের পূর্বপূরুষদের দেখেছি- গোয়ালে বেঁধে রাখা অকাট বলদগুলোকে তাঁরা-
এভাবেই খাবার খাওয়াতেন।।

রবিবার, মে ২০, ২০০৭

আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন-


কদিন ধরেই এ শহরে তুমুল বৃষ্টি! দিন নেই রাত নেই সারাক্ষণ ঝুম ঝুম ঝুম।
দেশে হলে এর মাঝেই দৌড়ে নেমে যেতাম ভিজতে। কিন্তু এখানে, আমার ভাল লাগে না। দু'একবার যে চেষ্টা করি নি তা নয়। কিন্তু, দেশে যেমন, আকাশ থেকে একগাদা দূষিত রাসায়নিকের সাথে সাথে ভালোবাসাও ঝরে পড়ে বৃষ্টি হয়ে, এখানে একেবারেই তা নয়। উলটো কেমন গা বাঁচিয়ে চলতে ইচ্ছে করে আমার বৃষ্টি দেখলেই।

কিন্তু, সম্ভবত আমি বাদে, মেলবোর্ণের সবাই খুবই খুশি। মাত্র ক'দিন আগেই পত্রিকায় দেখলাম, রিজার্ভয়ারে পানির পরিমাণ গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন সীমায় গিয়ে ঠেকেছে। কাঠা ফাটা রোদে কোন একটা চাষী জমির ছবি দিয়েছিলো তার সাথে, ঠিক যেন আশী বছরের কোন বুড়োর কুচকানো গালের চামড়া! দেখলেই শিউরে উঠতে হয়!
এ শহরের সবাই কিছুদিনের জন্যে তাই চাতক পাখীর সঙী হয়ে উঠেছিলো। সৌভাগ্যবান চাতক, এতগুলো মানুষের কল্যানে অবশেষে তারও অদৃষ্টে জল এলো!
এ কয়দিনের রিমঝিমের পরে আজকের পত্রিকায় তাই অন্যরকম ছবি! মাঠের মাঝে খেলছে ছোট্ট এক কৃষক কন্যা, তার বাবার সাথে। কি যে ভাল লাগলো দেখে!

মাঝের পাতায় আরেকটা ছোট্ট ছেলের ছবি ছাপা হয়েছে। রেইনকোট গায়ে হাসিমুখে খেলছে সে বৃষ্টিতে। প্রথম বৃষ্টি দেখে সে নাকি অবাক হয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করেছিলো-, ''মাম, হু টার্নড দ্য শাওয়ার অন? ''

এইটুকু পড়ে হেসে ফেলতেই এ বছরের বৃষ্টিকে আমারও ভালো লাগা শুরু হলো।

সোমবার, মে ১৪, ২০০৭

বিবাহনামা-

[ বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণঃ এই পোষ্ট কেবলমাত্র বিবাহিতদের জন্যে। যুবক ও অবিবাহিত ভাইয়েরা শত হস্ত দূরে থাকুন। তবে... কথা আছে, সদ্য বিবাহিতরা পড়িতে পারেন। আপনাদের জন্যে জরুরী অবস্থা আপাতত শিথিল:-) ]

জানুয়ারির কোন এক রাত। সদ্য দেশ থেকে ফিরেছি, বিবাহ করে মোটামুটি যুদ্ধ জয়ী সেনাপতির মতন নূরানী হাসি সারাক্ষণ আমার চোখে মুখে। কারো সাথে দেখা হলেই খানিক কথাবার্তার পর পেটের মধ্যে ভুটভাট শুরু হয়ে যায়, কেবলই উশখুশ করতে থাকি কি করে নিজের বিয়ের গল্প বলা যায়। হাওয়া অনুকূল দেখলে শেষ মেষ গলা খাঁকারী দিয়ে বলেই ফেলি, ' তা শুনেছেন নাকি, কাহিনি তো একটা ঘটিয়ে ফেলেছি!' শ্রোতা তখন আগ্রহী হয়ে বলেন, তাই নাকি? কি করেছেন?
আমি তখন প্রসন্ন হাসি দিয়ে বলি, 'আর বইলেন না, বিয়ে করে ফেলছি!'
তারপরে শুরু হয় আমার প্যাচাল। এর আগে বহুবার বলে বলে আমি যেটাতে বিশাল দক্ষতা অর্জন করে বসে আছি। আমার সেই প্রাঞ্জল বর্ণনায় শ্রোতা মুগ্ধ হয়ে যান, আমিও গল্প শেষে আয়েসী ভঙ্গিতে একটা ঢেকুর তুলি।

তো, তেমনি একদিন, আলাপের কেউ নেই, তাই ইয়াহু চ্যাটে লগইন করে বসে আছি, এমন সময়ে অনলাইনে এলো আমার কলেজের এক বছরের জুনিয়ার এক ছোট ভাই। ও কানাডায় থাকে, অনেকদিন ধরে, পড়ছে, প্রেম করে ইউএস এ থাকা এক মেয়ের সাথে।
আমি তো তারে দেখে মহা খুশি। নক করে নানা কথা বার্তা বললাম, তারপরে আস্তে ধীরে রসিয়ে রসিয়ে বললাম, 'তা, শুনছো নাকি? কান্ড তো একটা ঘটাইয়া ফেলছি!'
সেই ছোট ভাই আমাকে বলে, 'আপনেরটা পরে শুনমু, আমি যে একটা কান্ড ঘটাইছি সেইটা জানেন নাকি?'
আমি একটু থমকে গেলাম। আলাপটা এগোলনা! :-(
জিজ্ঞেস করলাম, 'তাই নাকি? কি করছো?'
ও অতি উৎসাহে বলে, 'আর বইলেন না ভাই, লাস্ট সামারে ইউ এস গেছিলাম, ঐখানে গিয়া তো ওরে বিয়া করে ফেলছি!'
আমি চুপসে গেলাম। বলে কি! এইটা তো দেখি আমার চেয়ে বড় কাহিনি! বললাম, 'খাইসে! গ্রেট ব্যাপার! কেমনে কি হইলো?'
ও খুব মজাসে নিজের কাহিনি বলা শুরু করলো। মেয়ের বাবা কেমন করে বাগড়া দিচ্ছিলো প্রেমে, কিন্তু কেমন করে সে মা-কে ম্যানেজ করে তাদের বাসায় হাজির হয়। অতঃপর ওখানে একা একাই পুরা ফ্যামিলিকে ম্যানেজ করে বিয়ে করে ফেলে!
আমি নিজের কাহিনি গেলাম ভুলে, ওর কাহিনি শুনে নিজেই টাসকি খেয়ে বসে আছি! বলি, 'ভাল ভাল, খুব ভাল। এখন কি অবস্থা? কেমন আছো?'
ও বলে, 'এখন কঠিন অবস্থা! খুব মজা করছি দুইজনে। ক্যান ইউ ইমাজিন ম্যান দুইজনে টানা দুই সপ্তাহ একসাথে ছিলাম! এক রুমে!'

আমি একটু গলা খাঁকারি দিলাম। ছেলে বলে কি! তারপরে আমতা আমতা করে বলি, 'না না, তাতো হবেই। বিয়ে করছো..., এখন তো একসাথেই...।'
কীয়ের কি! আমারে পাত্তাই দিলো না। এক নাগাড়ে বলতে থাকলো, 'এখন বস ভাল কইরা আপনার লাইগা দোয়া করেন!'
আমার তো জান শুকিয়ে গেলো! ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ক্যান, আমি আবার কি করলাম!?'
ও মুহাহাহা টাইপ একটা ভিলেনের হাসি দিয়া কইলো, 'আরে না, আপনে কি করবেন? করছি তো আমি! এখন মনে প্রাণে দোয়া করেন এত অল্প বয়সে আপনি আবার চাচা-কাকা না হইয়া যান!'

আমি বিরাট এক ঢোঁক গিললাম। আস্তে ধীরে লিখতে থাকলাম, 'ছি ছি, তোমরা আজকালকার বৈজ্ঞানিক যুগের পোলাপান, কী সব যে বলো না... ।'
ওর উচ্ছাসের ঠেলায় আমার এইসব কথাবার্তা মেসেঞ্জারের কোন চিপায় যে হারাইয়া গেলো, পরবর্তী কয়েক দিবস-রজনীও তাহাদের খুঁজিয়া পাইলাম না!

রবিবার, মে ১৩, ২০০৭

দূরালাপনী-

কাল কি জানি কি হলো, রাতে ঘুমুবার আগে খু-উ-ব মন কেমন করে উঠলো!
বালিশের তলায়, বিছানার নীচে- আমি তন্ন তন্ন করে খুঁজি, কিন্তু কোথাও পেলাম না আমার কেন মন খারাপ!
বাইরের মাঠে, ঘাসের ডগার আড়ালেও খুঁজলাম অনেকক্ষণ। কি মুশকিল! সেখানেও নেই নেই নেই।
মুখ তুলে তাকাতেই দেখি ঘাসফড়িং, তাঁকে দেখে যেই না লুকাবো, ও মা, সে দেখি আমার দিকে চেয়ে ফিক ফিক হাসে! আমি তার ডানা ধার নিয়ে উড়ে উড়ে উড়ে সো-জা- মেঘের ওপরে! ওখান থেকে উঁকি দিয়ে দেখি, না তো, সেই নদীটার গায়েও লেখা নেই কেন আমার মন খারাপ।
এমনকি ওই বদমাশ পাহাড়টাও জানে না!
আমি ধ্যুত্তোরি বলে রাগ দেখালাম। তারপরে রংধনু বেয়ে নেমে এলাম ঘরের ভেতর। বিছানার কাছটায় এসে মনে পড়লো- আরে, চাঁদকে তো জিজ্ঞেস করি নি! জানালা খুলে যেই না ডাকতে যাবো, ওমনি ব্যাটা আমার ঘরে এসে হাজির। আর কি নির্লজ্জ! বসলো গিয়ে ঠিক তোর মাথার কাছটাতে। আমি চোখ রাঙিয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলি, চুপ! শব্দ কোরো না! ঘুমাচ্ছে তো! তারপর জোছনার আলো সরিয়ে চাদরটা তোর গায়ে টেনে দিতে দিতে হঠাৎই মনে পড়লো, তাই তো! কাল যে তুই আমাকে গুড নাইট না বলেই ঘুমিয়ে গেলি!
আমার মন খারাপ হবে না বল?

বুধবার, মে ০৯, ২০০৭

রঙীন 'একটি ফুলে দুইটি ভ্রমর'-


সোজা সাপ্টা কাহিনি। দুই নায়ক, এক নায়িকা। নায়কদের একজনের বাবা নিজে নিজে খুন হন, ঘটনাচক্রে সন্দেহ গিয়ে পড়ে মূল নায়কের উপর। এদিকে নায়ক নায়িকার মাঝখানে চলে আসে আরেক প্রায়-নায়িকা। আমাদের নায়ক লোকসম্মুখে চুমু খান সেই নবাগতা নায়িকাকে- তাও আবার অনেককাল আগে মূল নায়িকাকে যেই ইশটাইলে খান, ঠিক সেই ইশটাইলে। এই না দেখে নায়িকার অভিমান ভেঙে পড়ে। ওদিকে বাবার খুনী সন্দেহ করায় নায়কদের মধ্যে বিরোধ শুরু হয়। কাহিনিতে চলে আসেন ভিলেন। সেই কিন্তু আবার ভালো মানুষ, পুরোপুরি ভিলেন না। মেয়ের চিকিৎসার খরচ তোলার জন্যে তিনি ভিলেনের রোল করছেন।
তো এইরকম গোলমালের মাঝখানে সিনেমার শেষপ্রান্ত হাজির হয়ে যায়। নায়িকাকে কিডন্যাপ করে ফেলে ভালো মানুষ-ভিলেন, আর সহযোগী ভিলেন। ওখানে তুমুল মারামারি, নিজেদের মধ্যকার ভুল বুঝাবুঝি ভেঙে দুই নায়ক 'বুকে বুক মিলিয়ে' যুদ্ধ করে ভিলেনদের বিরুদ্ধে। শেষ পর্যায়ে ভিলেন ছুরি হাতে এগিয়ে আসে নায়ককে মারতে, আর বন্ধুকে বাঁচাতে সেই ছুরির সামনে পিঠ পেতে দেন অন্য নায়ক। লাভের মধ্যে লাভ- নায়িকার কোলে মাথা রেখে মৃত্যু হয় তাঁর। শেষমেষ নায়ক নায়িকার মিলন ঘটে। সিনেমারও শেষ হয়।
এতক্ষণের কাহিনি পড়ে যদি ভাবেন, এই সিনেমার নাম রঙীন একটি ফুলে দুইটি ভ্রমর, তবে পাঠক, আপনার দোষ দিব না। বিশ্বাস করুন- সিনেমার শুরুতে যদি স্ক্রীনে না দেখাতো, তারচেয়ে বড় কথা- সাথের টিকেটের গায়ে যদি স্পষ্টাক্ষরে লেখা না থাকতো- আমি বিশ্বাসই করতাম না এই মাত্র যেই ছবিটা দেখলাম, সেটার নাম- স্পাইডার ম্যান-থ্রি!
হায়, সেলুকাস! হলিউডের পরিচালকেরা যে ইদানীং মনোযোগ দিয়ে বাংলা সিনেমা দেখা শুরু করেছেন, সিনেমার শেষে ক্রেডিট ডিসপ্লেতে এই তথ্যটাও যোগ করা দরকার ছিলো।
যারা এখনো দেখেন নি, তারা বেঁচে গেছেন। আর যারা বাঁচতে পারেন নি,আসেন ভাইয়েরা, আমরা গলা ছাইড়া কান্দি! :-((

মঙ্গলবার, মে ০৮, ২০০৭

রচনা রবীন্দ্রনাথ-


বলা হয়, মানব মনের এমন কোন অনুভূতি নেই, যেটা নিয়ে তাঁর কোন কবিতা বা গান নেই। মানুষের মনের সব কথাই নাকি তিনি বলে ফেলেছেন।
এরকম একটা মানুষকে নিয়ে লেখা আমার সাধ্যের ভেতর নেই। এবং সত্যি বলতে কি- সেই চেষ্টার ধারে কাছেও আমি আজ যাবো না।
জীবনের নানা প্রয়োজনে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে নানা কথা ধার করে কাজ চালাই। আজ রবীন্দ্রজয়ন্তীতে তাঁকে রেহাই দেবার সুযোগ পেলাম। এবারে হাত পাতলাম সুনেত্রা ঘটকের কাছে। তাঁর লেখা 'রচনা রবীন্দ্রনাথ'- আমার মনের প্রায় সব কথাই বলা হয়েছে যেখানে। নির্দ্ধিধায় বলতে পারি- রবি ঠাকুরকে নিয়ে লেখা এর চেয়ে সুন্দর কোন কিছু আমি আজ অবদি পাই নি, , এবং আমার দৃঢ় ধারণা আর কখনো পাবোও না।
সৌভাগ্য এই যে, 'রচনা রবীন্দ্রনাথ'-এ কণ্ঠ দিয়েছেন আমার আরেকজন প্রিয় আবৃত্তিকার- শিমুল মুস্তাফা।
দুইয়ে মিলে আমি যতক্ষণই শুনতে থাকি- মুগ্ধতার সাগরে সারাক্ষণই ডুবি ভাসি।




rochona robindrona...

শুক্রবার, মে ০৪, ২০০৭

একটি আইটিঘটিত কল্পকাহিনি-

অবশ্য এরকমই হয়- জামাত যখন পত্রিকা বের করে, তার নাম দেয় 'সংগ্রাম'।
তাতে কারই বা কি আসে যায়? কাগজটা নরম নয় বলে এমনকি টয়লেট পেপার হিসেবেও তার ব্যবহার নেই। অথবা কে জানে, যাদের শক্ততেও চলে, তারা হয়ত রোল করে বাথরুমে ঝুলিয়ে রাখেন 'সংগ্রাম'।

বাজারে পর্ণ ম্যাগাজিনের অভাব নেই। কাউন্টারের তলদেশ থেকে সর্বদাই উঁকি দিতে থাকে রসময়ের চটি বই। তবু যদি এ শহরের প্রধানতম নটী ঘোষনা দেন, 'সতী নারীর কিসসা!' নামে গল্প লিখবেন তিনি, তবে অনেকেরই হয়তো জিভ লকলকিয়ে উঠবে। এটুকুই তো! বখে যাওয়া কিশোরেরা সেই তো সেটা হাতে নিয়ে বাথরুমেই ঢুকবে!

আমি ভাই বিবাহিত সদ্বংশীয় পুরুষ, আমার এসবে কাজ নেই। বাথরুমেও ঝুলে থাকে নরমানরম টয়লেট টিস্যু।

তবে হ্যাঁ, আমাদের পাড়ার ডাস্টবিন নিয়ে বড়ই চিন্তায় আছি। কাল রাতে কে যেন সেটা তুলে নিয়ে গেছে, সেই সাথে ঘোষনা দিয়ে গেছে ওটার আর কোন দরকার হবে না। এখন আইটির যুগ, লেখাপড়া থেকে বাজার সদাই সবকিছুই অনলাইন, তো ডাস্টবিনটাই বা বাকি থাকে কেন?
শুনলাম জোর গবেষনা চলছে। অনেক পয়সা ঢালা হচ্ছে তাতে, খুব শিঘ্রীই আপনারা মাউসে ক্লিক করেই পেয়ে যাবেন ঝকঝকে নতুন অনলাইন ডাস্টবিন!
অপেক্ষায় থাকুন!

-------------
মূল পোষ্ট- এখানে

বৃহস্পতিবার, মে ০৩, ২০০৭

একজন জননীর জন্যে-


''পঞ্চাশের দশকে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, জাহানারা ইমাম তখন ঢাকা শহরের সুচিত্রা সেন। ''
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ এমন করেই তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছেন, জাহানারা ইমামকে প্রথম দেখে তিনি চমকে উঠে ভেবেছিলেন কোলকাতা থেকে এত দূরে, ঢাকায়, কি করে অবিকল একই রকম একজন সুচিত্রা সেন থাকতে পারে, যিনি পর্দার অলীক নায়িকা নন, বাস্তব মানুষ!
'৯৪ এ লেখা এই প্রবন্ধটি প্রায় এক যুগ বাদে প্রথমবারের মত পড়বার সময় আমি নিজেও চমকে উঠেছিলাম! বস্তুত, জাহানারা ইমামকে শহীদ জননী হিসেবেই জানি, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান হিসেবে জানি- তিনি একজন সাধারণ মানবী নন, একজন অতিমানবী। ঠিক এরকম ভাবনাগুলোর সাথে সুচিত্রা সেন-এর ছবিটা মিলছিল না, সে কারণেই যখন তাঁরই সমবয়েসী ও সমকালীন সায়ীদ স্যারের লেখায় জানলাম, তৎকালীন যুব সমাজের কাছে তিনি ছিলেন ঢাকা শহরের সুচিত্রা সেন, এই প্রথমবারের মত অনেক কাঠিন্যের পেছনে তাঁর মানবী রূপটিও যেন সহসাই চোখে পড়লো।
অনেক রকমের স্মৃতিচারণের মাঝে এই নতুনত্বটুকু বেশ উপভোগ্য লাগলো।
----------------

এইট বা নাইনে পড়ি, কলেজ লাইব্রেরীর বাংলা বইয়ের শেলফের কোন এক কোনায় একটা বই সবসময়ে চোখে পড়তো, ক্যান্সারের সাথে বসবাস। লেখক- জাহানারা ইমাম। কখনো পড়িনি, পড়বার আগ্রহও বোধ করি নি, বরং ফেলুদার কীর্তিকলাপ বেশ কয়েকবার রিভিশান দেয়াতেই আগ্রহ ছিল বেশি। সেসময়েই একবার মুহম্মদ জাফর ইকবালের কোন একটা লেখায় জাহানারা ইমামের কথা পড়লাম, সহজ সরল জলের মতন ভাষায় জাফর ইকবাল কি লিখেছিলেন মনে নেই, তবে সেটা পড়ে চোখ ভিজে গিয়েছিল মনে আছে। পরের লাইব্রেরী ক্লাসেই ইস্যু করি ক্যান্সারের সাথে বসবাস। তারপরের সপ্তাহে- একাত্তরের দিনগুলি। এবং মন্ত্রমুগ্ধের মতন পড়ে যাই। একবার নয়, বেশ কয়েকবার। ফেলুদার বদলে রুমি-জামিই আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিল তখন। প্রায় চেনা ভঙ্গিতে এমন সুন্দরভাবে লিখেছেন তিনি, যেন তাঁকে সঙ্গী করেই সকল আনন্দ বেদনা অনুভব করতে করতে '৭১ এর ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়ালাম বেশ কয়েকটা দিন।

তারপর, ক্রমশ বড় হই, বড় হতে হতে এই ভীষন বড় মানুষটার কথা যখন আরো বেশি করে জানতে পারি, শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যাই।

--------------
আজ শ্রদ্ধেয় জাহানারা ইমামের জন্মদিন। কাছের মানুষেরা তাঁকে আম্মা বলে ডাকে। অথবা কে জানে, আম্মা ডেকেই হয়ত সবাই তাঁর খুব কাছের মানুষ হয়ে যায়!

জন্মদিনের দিন মৃত্যুর কথা বলতে নেই। তবু যে মানুষটা চলে গেছেন, তাঁর জন্মদিনেও যেন তাঁকে হারাবার বেদনাটাই বেশি করে বুকে বেজে ওঠে।
ঢাকার রাস্তায় যখন জাহানারা ইমামকে কালো কফিনে শুইয়ে বিদায় জানানো হচ্ছিল, সেই কফিনবাহী লাশের পাশ দিয়ে যেতে যেতে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের কথাটুকু দিয়েই শেষ করি বরং-
" একটা ভারী কষ্ট গলা অব্দি উঠে এসে বুক চেপে বসে রইল। আমার চোখ ছাপিয়ে পানি টলমল করে উঠল, কিন্তু মাটিতে পড়লো না। আমরা এখন আর কাঁদি না। বয়সের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জেনেছি, যে দুঃখের অশ্রু একবার মাটিতে ঝরে, সে দুঃখকে মানুষ হারিয়ে ফেলে।''
-------------

আপনার জন্যে বুকের গভীর থেকে উঠে আসা ভালবাসা জানাই শহীদ জননী। কখনো কোন মানুষের জন্যে যদি অমরত্ব প্রার্থনা করার সুযোগ পেতাম, নিঃসন্দেহে সেটা আপনিই হতেন।