সোমবার, অক্টোবর ২৯, ২০০৭

নাটকঃ মরটিন, মশা অথবা হাত

দৃশ্য-১
পর্দা উঠবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মশার পিন পিন শব্দ।
মঞ্চের মাঝখানে একটা বিছানা, তাতে গোলাপী রঙের মশারী টানানো।
পাশেই চেয়ার, সেখানে রমিজ আলী বসে থাকবেন। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জী, চোখে চশমা। ভুরু কুচকে পত্রিকা পড়বেন।
ডানপাশের কোনা থেকে একটা ফুটলাইট জ্বলবে। আলো পড়বে রমিজ আলীর গায়ের উপরে। পেছনের দেয়ালে তার ছায়া দেখা যাবে।

দৃশ্য-২
আলো বদল। এবার মাঝের ফুটলাইট জ্বলে উঠবে। আগের বাতি নিভবে না।
রমিজ আলী পত্রিকা পড়তে পড়তে মাথা দোলাবেন। এপাশ ওপাশ। হতাশা সূচক। পত্রিকার এ পাশটায় নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের ছবি দেখা যাবে। দুজন টুপিওয়ালা থাকবে সে ছবিতে, একজনের লালচে দাঁড়ি। ব্যাকগ্রাউন্ডে মশার পিন পিন অব্যাহত।

দৃশ্য-৩
মাথার ওপরের বাতি জ্বলে উঠবে। আলো রমিজ আলীর ওপর।
রমিজ আলী উঠে দাঁড়াবেন। পত্রিকা চেয়ারে রেখে দু'হাত প্রসারিত করে হাই তুলবেন। তারপরে মশারির ভেতরে ঢুকে যাবেন।

দৃশ্য-৪
মশারির পাশের ফুটলাইট জ্বলে উঠবে। মশার পিন পিন আওয়াজ একটু বেড়ে যাবে।
রমিজ আলী দু হাতের চাপড়ে দু একটা মশা মারার চেষ্টা করবেন। তারপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়বেন বিছানায়।
আলো কমে আসবে।
খানিকপর রমিজ আলীর ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাবে। মশার শব্দ নেই।
এক মিনিট পনের সেকেন্ড এভাবে কেটে যাবে।

দৃশ্য-৫
আলো খানিকটা বাড়বে। মশার শব্দ শোনা যাবে ব্যাকগ্রাউন্ডে। তীব্র হয়ে উঠবে ক্রমশ।
রমিজ আলী দু'বার এ'পাশ ওপাশ করবেন। অস্থিরতা প্রকাশ পাবে।
মশার শব্দ আরেকটু তীব্র হয়ে উঠবে। ব্যাকগ্রাউন্ডে মৃদুস্বরে বাজবে সাঈদীর ওয়াজ।
রমিজ আলীর অস্থিরতা বাড়বে।
নাক দিয়ে বিরক্তিসূচক শব্দ করবেন একটা।
মশার আওয়াজ বেড়ে যাবে আরো।
রমিজ আলী ঠাস করে নিজের পশ্চাদ্দেশে খুব জোরে একটা চাপড় দিবেন।
রমিজ আলীঃ শালা মুজাহিদ!

সাঈদীর ওয়াজ থেমে যাবে। আলো কমতে থাকবে। মশার শব্দ থেমে যাবে। রমিজ আলীর ভারি নিঃশ্বাস শোনা যাবে।
আলো নিভে যাবে। পর্দা পড়ে যাবে।

আমি গাইবো বিজয়েরই গান...

মানুষের মানসিক গঠনটাই আসলে এরকম, বিশেষ করে অপরাধী মন যাদের। নিজের অপরাধ ঢাকবার জন্যে আপন মনেই নিজেকে প্রবোধ দেয়, নিজের কৃতকর্মকে অস্বীকার করে। একটা পর্যায়ে এসে ঐ প্রবোধটাই বিশ্বাস বনে যায় আপনাতেই।
জামাতে ইসলামী নামে ঘৃণ্যতম রাজনৈতিক দলটির কুখ্যাত নেতা, একাত্তরের স্বীকৃত রাজাকার আলী আহসান মুজাহিদ ঠিক এরকম কোন বিশ্বাস থেকেই মন্তব্য করেছিলো, ' বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাপরাধী নেই।'
কতখানি ঔদ্ধত্য পেয়ে বসলে মানুষ এরকম বলতে পারে এটুকু কল্পনার কোন অবকাশ আর নেই এখন। ঠিক যেন আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার জন্মকে, আমার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মতন তীব্রতর জ্বালা ধরানো কোন অনুভূতির জন্ম হয় মনে এই কথা শুনে।
জামাতী নেতা ও তাদের সমর্থকদের নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টার কোন কমতি ছিলো না এতদিন। কিন্তু এরকম করে পুরো ইতিহাসকে অস্বীকার করার মতন স্পর্ধা এর আগে দেখা যায় নি।
মুজাহিদের বক্তব্য নিয়ে পুরো দেশে যখন আলোড়ন হচ্ছে, তখন পর্দায় হাজির হলেন আরেক গোপাল ভাঁড়, জনান শাহ আব্দুল হান্নান। ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে পরিচিত, কিন্তু জামাতে ইসলামীর অনুগত পরামর্শক হিসেবে নিজের জায়গা করেছেন অনেক আগেই।
একুশে টিভির এক টক শোতে তিনি আমাদের সামনে নতুন অনেক তত্ব ও তথ্য হাজির করলেন। তারমধ্যে অন্যতম হলো, মুক্তিযুদ্ধ আসলে ছিলো একটা সিভিল ওয়ার। মুক্তিযুদ্ধের নিহত শহীদের সংখ্যা তিরিশ লক্ষ কিনা সেটা উনি 'জানেন না', তবে হামিদুর কমিশনের ছাব্বিশ হাজারের তত্বকেও তিনি অস্বীকার করতে পারেন না!!
ভেবে পাই না, বাংলাদেশ সংবিধানের মূলস্তম্ভ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, সেটাকে অস্বীকার করে এই লোকটা কেমন করে বাংলাদেশ সরকারের সচিবালয়ের মতন এতো গুরুত্বপূর্ণ একটা দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলো এতগুলো বছর?

আরিফুর রহমানের নির্দোষ কৌতুকের মধ্যে মহানবীর অবমাননার গন্ধ খুঁজে পেয়ে কিন্তু উম্মত্ত মোল্লা জুম্মার নামাজের পরে কয়েক কপি প্রথম আলো পুড়িয়ে সারা দেশে জিহাদ ঘটিয়ে দিলো। কিন্তু আলী আহসান মুজাহিদ আর শাহ আব্দুল হান্নানের এমন সব মন্তব্যের তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। জনগণের কাছ থেকেও না, সরকারের কাছ থেকেও না।
এই নির্লিপ্ততা বড় কষ্টকর। বড় হতাশার।

শুক্রবার, অক্টোবর ২৬, ২০০৭

বাতের ব্যথা

কোন একটা অসুখকে আগে বড়লোকদের অসুখ বলে জানতাম, কী যে সেটা, ভুলে গেছি। যেমন জানতাম 'বাতের ব্যথা' হলো খাস গরিবী অসুখ।
অসুখের খোঁজ খবর নিচ্ছি, তার একটা অগভীর কারণ আছে। ইদানীং কিছুই লেখা হচ্ছে না। দু'তিনটে গল্প সিনেমার মত করে অনবরত মাথার ভেতর পুনঃপ্রচারিত হয়ে চলছে। বিচ্ছিন্ন কিছু কিছু কবিতার লাইন মাথার ভেতর কাঠঠোকরার মতন ঠোকর মেরে মেরে যায়। মুশকিল হলো, এগুলোকে খাতার ভেতরে স্থায়ীভাবে বেঁধে ফেলাটাই হচ্ছে না।
এইরকম একটা অবস্থাকে বড়লোক লেখকেরা বলেন 'রাইটারস ব্লক'। কিন্তু এই শব্দ আমার বেলায় খাটবে না, আমি তো আর বড়লোক লেখক নই। আমি হলাম হত-দরিদ্র কলমবাজ। এখন তাই আমাকে কলম্বাসের মতই রাইটার্স ব্লকের সমার্থক বাতের ব্যথা জাতীয় নতুন কোন গরিবী শব্দ আবিষ্কার করতে হবে।
কি মুশকিল!

শুক্রবার, অক্টোবর ১৯, ২০০৭

প্রিয় সেগুন বাগান

খুব সিরিয়াসলি সত্যজিৎ রায় হতে চাইবার আগে আমি তারচেয়ে সিরিয়াসলি হতে চেয়েছি ম্যাকগাইভার কিংবা মিঠুন চক্রবর্তী। এই দুইয়ের অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বন্ধুদের নিয়ে গোয়েন্দা দল বানিয়ে আমি প্রায় হয়েই গিয়েছিলাম কিশোর পাশা। গোয়েন্দা রাজু খুব বেশিদিন আমার সহচর ছিলো না। কাকাবাবু বা ফেলুদা পড়েছি, তবে হতে চাই নি কোনদিন। এখন এই আধাযুবক বয়সেও ছেলেবেলার যে হিরোর আবেদন একটুও কমেনি আমার কাছে, সেই দুর্দান্ত ছোকরার নাম 'মাসুদ রানা'। হু, ইনি তিনিই, যে 'টানে সবাইকে, কিন্তু বাঁধনে জড়ায় না।'
এইরকম স্বার্থপর একটা বর্ণনাই বোধকরি আমাদের মাসুদ রানার প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিলো। আরো অনেক কারণও ছিলো। সদ্য কিশোর তখন আমরা, এরকম একটা সময়ে প্রতিবার বিপদে পড়া বাংলাদেশকে বাঁচাতে, অথবা কোন বন্ধুরাষ্ট্রকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে যখন কাঁচা পাকা ভুরুর মেজর জেনারেল রাহাত খান অফিসে ডেকে পাঠাতেন মাসুদ রানা-কে, আমরা সেই সময় আরো একটি চমৎকার স্পাই থ্রিলারের আশায় বসের সামনে বসা মাসুদ রানার কানের পাশে সমানে ফিসফিস করে বলে যেতাম, 'রাজি হয়ে যা ব্যাটা, রাজি হয়ে যা।'
সোহানা চৌধুরির আদুরে ভালোবাসার লোভ ছিলো হামেশাই। সেই সাথে প্রতি পর্বে নতুন কোন স্বর্ণকেশিনীর সাথে সাক্ষাৎ হওয়াটাতো অনিবার্য। এইরকম গল্প গুলোই তখন আমাদের কাছে সোনামাখা স্বপ্ন হয়ে দেখা দিতো।

এইবার দেশে গিয়ে নিজেকে সাংসারিক সকল বাঁধনে জড়ানোর ব্যবস্থা করার ফাঁকে ফাঁকেও বেশ মনে হচ্ছিলো এই 'কোনদিন বাঁধনে না জড়ানো' যুবকের কথা। আমার ফেলে আসা পুরনো বইগুলোর ভীড় থেকে টেনে বের করি মাসুদ রানা সিরিজের আমার খুব পছন্দের একটি বই 'মুক্ত বিহংগ'। এই গল্পের আর দুটি প্রধান চরিত্রও আমার ভীষন পছন্দের ছিলো, মাইকেল সেভারস আর এনি উইসপার।

ঠাকুমার ঝুলি দিয়ে হাতে খড়ি হবার পর, আমার পুরো ছেলেবেলাটাই কেটেছে সেবা প্রকাশনীর বই পড়ে।
অনেকেরই দেখি সেবা প্রকাশনীর বইগুলো নিয়ে নাক উঁচু একটা ভাব রয়েছে। খুব প্রিয় আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও একবার এরকম কিছু বলেছিলেন, সেবা প্রকাশনীর সস্তা বইগুলো পড়ে নাকি আমাদের ছেলেমেয়েরা গোল্লায় যাচ্ছে। এটা পড়ে ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলাম। আমি নিজের ও আমার বন্ধুদের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সেবা প্রকাশনীর ঐ সস্তা ও অগভীর থ্রিলার বইগুলোই আমাদের দেশের কিশোরদের বই-পড়ুয়া হিসেবে বড় হতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে। একেকটা স্বপ্নের রাজ্যের দরোজা খুলে দিত সেইসব অবাস্তব ফিকশানগুলোই। আমি নিজের কথা বলতে পারি, ঐ বয়সে সেবা'র বই না হলে পড়বার অভ্যাসটাই হয়তো ঠিকমতন গড়ে উঠতো না। আর সেটা না হলে বিশ্বসাহিত্যের অন্য সব বইগুলোও আমার ধরা ছোয়ার বাইরে থেকে যেত নিশ্চিত। তাই সুরুচির পতাকাধারীদের ভুরু বেঁকে গেলে যাক, আমার রুচির ফিল্টারে বিশাল বিশাল ফাঁক। তা দিয়ে পটেমকিন জাহাজ যেমন করে বেরিয়ে যায়, তেমনি যায় ক্যাসিনো রয়্যালও। আবার সে ভাবেই গোর্কী আর কাজীদা সেখানে পাশাপাশি চলেন।

রকিব হাসান নিজেই তখন আবু সাঈদ নামে লিখতেন গোয়েন্দা রাজু। জাফর চৌধুরিও কি ওনারই ছদ্মনাম ছিলো? মনে নেই সেটা, তবে রেজা-সুজার সেই রোমহর্ষক সিরিজও পড়তাম ভালই। কুয়াশা সিরিজ মোটামুটি লাগতো, আর তিন গোয়েন্দা ছিলো অসাধারণ। তারপর বয়সের দাবী অনুযায়ীই হাতে চলে এল গরমাগরম মাসুদ রানা। শেখ আব্দুল হাকিম আর খন্দকার মাজহারুল করিমের রোমান্টিক বইগুলোও লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। কিশোর ও রহস্যপত্রিকার নিয়মিত গ্রাহক ছিলাম অনেকদিন।

ক্লাশের তাড়াহুড়া না থাকলে দুপুরের দিকে ঘুম ভাঙ্গে আমার। আজ কেমন করে জানি খানিকটা ব্যতিক্রম হলো, কাক নেই, তাই তার ডাকও শোনা যায় না এখানে, তবে আমার জন্যে সেটা কাক-ডাকা ভোরই আসলে। কি ভেবে আধ-পড়া ইলিয়াস আর মানিক বন্দ্যো-র মাঝখান থেকে টেনে নিলাম মুক্ত বিহংগটাকেই। বহুদিন পরে আবার একটা সকাল বেশ ঝলমলে হয়ে গেল। ছাপোষা জীবনে অভ্যস্ত আমার হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো আফ্রিকার গহীন জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চারটে ট্যাংকের বিশাল বহরকে চালিয়ে নিয়ে যেতে।
এই কৈশোরিক আনন্দে ভরা চপল সুন্দর সকালটুকুর জন্যে তাই কৃতজ্ঞতা জানাই কাজী আনোয়ার হোসেন ও তার সেগুন বাগান প্রকাশনীকে। অনেক ধন্যবাদ আপনাদের কাজীদা, এক স্বপ্নবাজ কিশোরের ছেলেবেলাকে বাঁধনে জড়িয়ে নেবার জন্যে।