মঙ্গলবার, জানুয়ারী ১৫, ২০০৮

নানা 'বর্ণে'র গালি

আমার এক বন্ধুর মামাত ভাই, বয়েস বেশি নয়। দেড় কি দুই। মাত্রই টুবলুশ গাল ফুলিয়ে টুকুস টাকুস করে কথা বলা শিখেছে। সবাই আনন্দে আত্মহারা। এরই মধ্যে কোন এক দৈব দুর্বিপাকে সে একটা 'গালি' শিখে ফেললো, 'কুত্তার বাচ্চা'! খেতে চাইছে না, জোর করা হচ্ছে, ব্যস দিয়ে ফেললো গালি।
বাড়িতে মেহমান এসেছে, কোলে নিতে চাইছে, ভাইজানের হয়ত মুড ভাল নেই। খানিক জোরাজুরির পরে অবধারিতভাবে বলে বসলো, "এই কুত্তাল বাত্তা, ছাল আমালে ছাল!'
বিরাট মুশকিল। তবে সমাধান বের হলো। তাকে আদর করে শিখিয়ে দেয়া হলো, এটা খুবই খারাপ কথা, এরকম বললে লোকে আদর করবে না।
তো সেই আদরে কাজ হলো, সেই পুঁচকা ভাইজান এখন কারও উপর রেগে গেলে চোখ মুখ বড় বড় করে বলে, " এই কুকুলেল বাবুটা, যা এখান থেকে, যা!'

*
খেলার মাঠে হরভজন 'বর্ণবাদী' গাল দিয়ে বসেছে সাইমন্ডসকে। বলেছে নাকি 'বানর'। এই গাল শুনতে হয়েছে সাইমন্ডসকে সর্বশেষ ভারত সফরেও। হরভজন বলেছে সে নাকি বানর বলে নি। ভারতীয় প্রতিনিধিরা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, যদি ডেকেও থাকে, বানর শব্দটা উপমহাদেশে খুব খারাপ গালি নয়, বরং আদর করেই ডাকা হয় এটা।
দুই পড়েই আমার হাসি পেলো। এক, গাল দিয়েছে বলে অভিযোগ করলেন একজন অস্ট্রেলিয়ান! খেলার মাঠে স্লেজিং এর জন্যে যাদের খ্যাতি সীমা স্কাই-হাই। আর দুই, বানর আদরের ডাকই হোক কি বাঁদরের, ইন্নামাল আমালু বিন নিয়াত, বানর ডাকার উদ্দেশ্য মোটেও নির্দোষ হতে পারে না।
এই নিয়ে পত্রিকার পাতা খুব গরম ছিলো কদিন। অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট গ্রেটরা পক্ষে বিপক্ষে অনেক তর্ক মাতালেন। এই চান্সে আমরা জেনে গেলাম, ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেট আসলে পুরোপুরি ভদ্রভাবে খেলা হয় না। এর মাঝে নানারকম মিক্সচার আছে।
মজা আরো আছে। ভারত শিবির থেকে তারপরে অভিযোগ করা হলো, ব্র্যাড হগ কাকে যেন বলেছেন 'বেজন্মা' (বাস্টার্ড)। ভারত বসে থাকবে কেন? আইসিসিকে জানানো হলো এ কথা। এই নিয়ে অজি-রা বিস্মিত! মানে, বেজন্মা শুনে আবার কেউ অভিযোগ করে নাকি! এটা কোন গাল হলো?
হুম, তার মানে বেজন্মায় আপত্তি নেই, কিন্তু বানরে আছে!

পরিস্থিতি যখন গনগনে কড়াই, হরভজন তখন জানালেন, তিনি মাংকি বলেন নি। তবে কাছাকাছি উচ্চারণের একটা পাঞ্জাবী গালি দিয়েছেন। কি সেটা? 'মা কি ......' , ইংরেজিতে যেটা হলো, " মাদার...... র' ।
তো অজিরা এইবারে খানিকটা শান্ত। ও, আচ্ছা, মাদা......র বলেছে, মাংকি তো বলে নি! এ আর এমন কি! চলো ভাই, আমরা আবার হাত মেলাই।

শুনেছি ভারত তার সফর শেষ করবে। কুম্বলে হগের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নিয়েছেন। পন্টিং এর সাথে একটা নির্বিষ আলোচনা সভাও নাকি হয়ে গেছে।

তা হোক, জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। ওম শান্তি।

*
কনফুসীয় ফুটনোটঃ
গালি দিন, মন খুলে। সমস্যা নেই। শুধু খেয়াল রাখবেন, সেগুলো যেন সুশীল গালি হয়।

শনিবার, জানুয়ারী ০৫, ২০০৮

লাট্টু - ২

১।
ইশকুলে পড়বার সময় বছরের শুরুর দিকে বেশ বিপাকে পড়ে যেতাম। ক্লাশের খাতার শিরোনামের পাশে যত্ন করে বার আর তারিখ লিখবার সময় সালের জায়গায় ভুল করে আগের বছরেরটা লিখে ফেলতাম। তারপর ইরেজার ঘষে ঘষে বিরক্ত মুখে ঠিক করে লিখতে হতো।
এখন আর সেই বিরক্ত হবার সুযোগ নেই। গুগল ডকসে চলে লেখালেখি। ওরা নিজেরাই কয়েক সেকেন্ড পর পর সব লেখা সেভ করে ফেলে। তারিখ তো বটেই এমনকি ঘন্টা মিনিট সময় সহ!
কাল রাতে হুট করে ড্রয়ার খুঁজে খুঁজে একটা পেন্সিল বের করেছি। আজ ভেবেছি সেই পেন্সিল দিয়ে দিন তারিখ দিয়ে একটা কিছু লিখবো ডায়রিতে।
কিছু একটা। কি যে সেটা, জানি না এখনো।

২।
নিউজিল্যান্ডে গিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বেশ নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। প্রথম ওয়ানডে-র অল্প কিছু সময় খানিকটা হাসতে পেরেছিলো, বাকি পুরো সফরটাই শেষমেষ দুঃস্বপ্ন হয়ে যাবে কি না, সেটা নিয়ে এখন আর সংশয় নেই কোন।
আমি মন খারাপ করে প্রতিদিন ক্রিকইনফো খুলে বসি। স্কোর কার্ড দেখতে দেখতে ভাবি, আসলে সমস্যাটা কোথায় আমাদের?
হুম, ভেবে ভেবে যে শেষমেষ সমস্যার মূল বা তার সমাধান বের করে ফেলি, ব্যপারটা এমন নয়। তবু, মাথা চুলকে ভেবেই চলি অনেকক্ষণ।
ধারে কাছে কোথাও প্রফেসর শঙ্কু কিংবা বিজ্ঞানী সফদর আলিকে পেয়ে গেলে ভালো হতো। ওনাদের হাতে পায়ে ধরে 'খেলার পার্ফমেন্স বর্ধক বড়ি' নামক একটা কিছু বানিয়ে নেয়া যেত।
মনে হচ্ছে, ওরকম কোন একটা বড়ি ছাড়া আমাদের আর গত্যন্তর নেই।

৩।
ইন্ডিয়ান তিনটা ছেলে আগুনে পুড়ে মারা গেল দুদিন আগে। আমার বাসা থেকে ঠিক ২০০ মিটার দূরে। পত্রিকায় পড়লাম, কম্প্যুর মনিটর থেকে স্পার্ক হয়ে আগুন লেগে যায় ঘরে। এখানকার বাড়িগুলো কাঠজাতীয় বোর্ড দিয়ে বানানো বেশিরভাগই। দুই রুমের ঐ ছোট্ট বাসায় মোট ছ'জন থাকতো! একরুমে ঐ তিনজন, আর পাশের রুমে চার বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে সহ স্বামী স্ত্রী।
ভাগ্যক্রমে ঐ ছোট্ট পরিবারটা বেঁচে গেছে। কিন্তু ঐ তিনজন সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলো কোনভাবে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উঠতে পারে নি।
কীরকম দুঃস্বপ্নের মতন লাগে এসব খবর পড়লে।
আজ কাজ থেকে ফিরবার সময় রাস্তা বদলে ঐ পোড়া বাড়িটার সামনে দিয়ে এলাম। গা কেঁপে উঠছিলো বারে বারে।
৪।
নতুন বছরে নতুন প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করার ঘোষণা দিয়েছেন শুনলাম। সংক্ষিপ্ত আর গোপন একটা সফরে ইরাকে গিয়েছিলেন তিনি, সেখানে অজি সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, নতুন কোন সৈন্য আর ইরাকে যাবে না অস্ট্রেলিয়া থেকে। যারা আছে, তারাও মাস ছয়েকের মধ্যে বাড়ি ফিরে যাবে।
এই খবরে নানান রকম 'কিন্তু' আছে জানি। তবুও, অন্য বড় দেশগুলো, যাদের সৈন্যরা এখনো রয়ে গেছে ইরাকে, তারা কি পদক্ষেপ নেয়, সেটাই দেখার অপেক্ষায় আছি।

৫।
রাহুল দ্রাবিড়কে নিয়ে এখানকার পত্রিকাগুলো সাংঘাতিক মাতামাতি করছে। বেচারার সুন্দর একটা নাম ছিলো, দ্য ওয়াল, সেটাকেই এখন তারা লেবুর মতন চিপে ছিবড়ে বানিয়ে দিচ্ছে।
আজকের হেরাল্ড সানে লিখেছে, অবশেষে সিডনিবাসী তাদের বিরক্তিকর রকমের রেল-সিস্টেমের চেয়েও ধীরগতির একটা কিছু খুঁজে পেয়েছে। আর সেটা হলো রাহুল 'দ্য ওয়াল' দ্রাবিড়।
গতদিন ১৮ রান থেকে ১৯-এ যেতে বেচারার লেগেছিলো ঠিক ৪০ টি বল! এমনকি সেই এক রান নেবার পরে দর্শকরাও নাকি উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়েছে দ্রাবিড়কে। খেলা দেখা হয় নি নানা ঝামেলায়, কিন্তু দৃশ্যটা কল্পনা করতেই হাসি পেয়ে গেলো।

৬।
খবরে বলছে বাংলাদেশে চালের দাম এখনো ধরা ছোয়ার মধ্যে নেই। নতুন করে বেড়েছে আটা ময়দার দাম।
আগামী সপ্তাহে নাকি তেলের দাম এখানে ঠিক দেড় ডলার হয়ে যাবে। দুটো খবর পড়েই মনে মনে কার উদ্দেশ্যে যে গাল দিলাম কে জানে।
গালিগুলো বুমেরাং হয়ে ফিরে না এলেই হয়!

৭।
আজ ছিলো আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মৃত্যুবার্ষিকী।
প্রায় নিঃশব্দে কেটে গেলো একটা দিন।
কাটিয়ে দিলাম আমি কল্পনার সেপাই হয়ে, মনের চিলেকোঠায় শুয়ে বসে।