শনিবার, এপ্রিল ২৬, ২০০৮

লেখাচুরির গল্প

তো, এটা আসলে আপনাতেই হয়ে যায়। পঞ্চাশটা ছেলে-পেলে একসাথে থাকলে, সবার দোষগুণ একদিকে ধায় না, একেকজনের প্রতিভা একেকদিকে স্ফূরিত হয়।
ব্যাতিক্রম কেবল আমি, মোটামুটি প্রতিভাহীন অবস্থাতেই আমি পুরো কলেজলাইফ কাটিয়ে দিয়েছি।

আমি খেলাধূলায় কখনোই ভাল না। রুম ক্রিকেট বা করিডোর ক্রিকেটে প্লেয়ার শর্ট পড়লে আমার ডাক পড়ে, আর তা না হলে আমার কোন গুরুত্বই নেই। আমিও অলস মানুষ, মাথা গুঁজে কোনমতে একটা বই শেষ করে কখন আরেকটা গল্পের বই ইস্যু করবো, সারাক্ষণ এই নিয়েই আছি।
ক্লাসে যারা ভাল খেলোয়াড়, সেভেনের থার্ড টার্ম পেরুবার আগেই তাই তারা সুপার-স্টার। কঠিন ভাব নিয়ে ঘোরাফেরা করে।

এই অপরিসীম ভাবের কিয়দংশ পরিমান অর্জন করতে আমাকে আমাদের ক্লাশের প্রথম দেয়াল পত্রিকা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে! সারা বছরে শুধু এই দেয়ালপত্রিকা বা কলেজ ম্যাগাজিনের সময়টুকুতেই আমি খানিকটা আলগা-মুডে থাকতাম। স্যার প্রুফ দেখার কাজ দিতেন, আমি খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতে সে সব কাজ করতাম। যত না করতাম, তার চেয়ে বেশি ভাব নিতাম। জুনিয়র ক্লাশে থাকতে একটা গল্প জমা দিলাম, কলেজ কালচারাল প্রিফেক্ট ছিলেন রহমান ভাই, উনি ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এইটা তুমি লিখছো? আমি হ্যা বলার পরেও বিশ্বাস করলেন না। বারবার জিজ্ঞেস করলেন কোন পত্রিকা থেকে মেরে দিয়েছি কি না! তখনই বুঝে গেছি লেখাটা ভাল হইছে। আমি তো মহা খুশি!

পত্রিকা থেকে মারার ব্যাপারটা তখন মোটামুটি সাধারণ ব্যাপার ছিলো। যে কোন উপলক্ষে লেখা দিবার সিজন আসলেই সব পুরনো পত্রিকা/ ম্যাগাজিন উল্টে পাল্টে সবাই 'ধরা খাবার চান্স কম'-এরকম লেখা বের করে ফেলতো। যাদের এইরকম 'কষ্টকর' কাজ করতেও আলসেমী লাগতো, তারা আমার কাছে চাইলেই, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে চাইবার আগেই আমি কবিতা ধার দেবার জন্যে রেডি হয়ে বসে থাকতাম! এইসব দুইনাম্বারীর ফলে কলেজ ম্যাগাজিনে দেখা যেত আমার একারই পাঁচ ছয়টা লেখা, বন্ধুদের নামে।

আমার জুনিয়র রুমমেট একবার হাউসের দেয়ালপত্রিকার জন্যে পত্রিকা থেকে মেরে দিয়ে একটা কবিতা জমা দিয়েছিলো, ওটা ফেরত এসেছে ওর কাছে, আরও চার লাইন যোগ করে দিতে হবে। ও পড়েছে মুশকিলে! আমি তখন বীরদর্পে নতুন চার লাইন লিখে দিলাম এক বসায়। কারও বোঝারই সাধ্য নাই! আর আমার তখন কঠিন 'ভাব'!
এই লেখা জমা-টমা দেবার সময় নানারকম মজার কাহিনি ঘটতো।
আমাদের মজিবের নানান রকম কাণ্ডকীর্তি রীতিমতন কিংবদন্তী হবার সামর্থ্য রাখে! ও একবার ইংরেজী ম্যাগাজিনে ( প্রতি টার্মে বের হতো, সম্ভবত দ্য রিপলস নাম ছিলো ওটার) একটা কবিতা জমা দিলো আমাদের ইংরেজী শিক্ষকের কাছে। সেই শিক্ষক খুব ভোলাভালা ছিলেন, নাম বললেই চিনবে সবাই, তাই বলছি না, শুধু বলি, উনি ডান গাল চুলকাতেন বাম হাত দিয়ে, তাও সোজাসুজি না, মাথার ওপর দিয়ে হাত ঘুরিয়ে এনে!
তো সেই শিক্ষক মজিবের কবিতা লাল দাগ দিয়ে ভরিয়ে দিলেন, তিন চার জায়গার গ্রামার ঠিক করে দিলেন। মজিব সেই কবিতা আবার হাতে নিয়ে স্যারের কাছে গিয়ে মৃদু আপত্তি জানিয়েছিলো। স্যার সপাটে বললেন, ব্যাটা এইসব কি লিখিস! গ্রামারের কোন ঠিক-ঠিকানা নেই!
বেচারা মজিব, পুরো একটা লাইব্রেরী ক্লাস বরবাদ করে অনেক ঘেঁটে শেক্সপীয়রের স্বল্প-পরিচিত একটা কবিতা তুলে এনেছিলো, স্যার যে শেক্সপীয়রের মেন্যুস্ক্রিপ্টেও লাল দাগ দিবেন ও কেমনে জানবে!

আমার সাথে বেশ কয়বার মজার কাহিনি ঘটেছিলো। বিজয় দিবস নিয়ে 'তরঙ্গ'-এর একটা সংখ্যা বের হবে। আমি দুইটা কবিতা রেডি করলাম, তুলনামূলকভাবে ভাল যেটা, নির্দ্বিধায় সেটা দিলাম আমার নামে, অন্যটা তানভীরের নামে। পরে দেখা গেলো- আমার কবিতা ছাপাই হয় নি! তানভীরেরটা গ্যাছে। :-)
আমাদের ক্লাশ যেবার হাউসে দেয়াল পত্রিকা বানালো, সে বারও তাই। দুইটা গল্প লিখলাম। খানিকটা আঁতেলিক যেটা ছিলো, সেটা আমার নামে দিলাম, সাধাসিধা অন্যটা দিলাম আরেকজনের নামে। দেয়াল পত্রিকার কম্পিটিশান শেষে দেখা গেল, ঐ গল্পটা বেস্ট গল্প হিসেবে প্রাইজ পেয়ে গেছে, আমার কপাল ভাঙ্গা! :(

শেষ করি আরেকটা ঘটনা দিয়ে।
এইরকম লেখা জমা দেবারই মৌসুম সেটা। তো দোস্ত রাজীবের শখ হইছে ওর নামে একটা কবিতা ছাপা হোক। এমনিতে একাডেমিক পড়াশোনা নিয়েই থাকে, অন্য বই-টই পড়ে না একদম। তো কবিতা ছাপানোর শখ হইছে, এদিকে আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড ছিল বলেই মনে হয় আমার ওপর একেবারেই ওর ভরসা ছিলো না। :-) ও তাই লাইব্রেরীতে গিয়ে অনেক খুঁজে টুজে একটা কবিতা বের করে ওর নামে লিখে স্যারের কাছে জমা দিয়ে আসলো। খুব খোশমেজাজে ছিলো। আমি বললাম, ধরা টরা খাবি না তো? বিখ্যাত কারো কবিতা দিছিস নাকি?
ও বলে, আরে না, বিখ্যাত না, কেউ নামই শোনে নি এমন একজনের কবিতা দিছি।
আমার শংকা তবু কমে না, জিজ্ঞেস করি, কার কবিতা? নাম কী?

ও বলে, মহাদেব সাহা। নাম শুনছস জীবনে?
আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি...।


অসুখের দিনলিপি ( হাওয়াই মিঠাই ৭)

কদিন আগেই ঘাড়ের ব্যথায় কাতর হয়ে দু’দিন ধরে বাসায় শুয়ে বসে দিন কাটাচ্ছিলাম। অনেকদিন ছুটি নেয়া হচ্ছিলো না জগৎ-সংসার থেকে, মহামতি ঘাড়-ব্যথা আমাকে তাই বাধ্যতামূলক ছুটির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলো, আর আমি বসে বসে পুরনো অসুখের দিনগুলোর কথা জাবর কাটছিলাম।

কলেজ-হোস্টেলে থাকবার সময় অসুখ বিসুখ বাধিয়ে ফেলাটা দস্তুরমতন সুখকর ছিলো। বেশ কয়েকদিনের জন্যে পিটি-প্যারেড-গেমস থেকে মুক্তি, এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে? সেই সক্কাল ভোরে বিছানা-বালিশকে অনাগত বউয়ের মতই জড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করতো তখন, মনে-প্রাণে জপতে থাকতাম "এ বাঁধন যাবে না ছিঁড়ে," তবু হায় বেরসিক বাঁশীর ডাকে সেই ঘুম ভেঙে উঠে কলেজ মাঠে চক্কর লাগাতে হতো। যন্ত্রণার একশেষ!
ক্লাস সেভেনের শেষের দিকে পক্স বাঁধিয়ে একবার এইরকম লম্বা আরামে ছিলাম। আরেকবার দুনিয়ার সবার উপর বিরক্তিতে না খেয়ে খেয়ে হিমোগ্লোবিন কমিয়ে ফেলেছিলাম অনেক, শেষে ড্রাকুলা হয়ে ক্লাসমেটদের কাছ থেকে রক্ত খেয়ে বেঁচে গিয়েছিলাম। অনেকদিন তখন সিএমএইচে থাকতে হয়েছিলো, সেটাও একটা অভিজ্ঞতাই বটে, কিন্তু সে আলাপ পরে। আজ বলবো অন্য এক দিনের কথা।

কোন এক গরমের সকাল ছিলো সে দিন। ঘন্টা দেড়েকের দুর্বিষহ পিটি শেষে গোসল করে আমার রুমে ফিরেছি, আমার বিছানা ছিলো জানালার পাশেই। রাতে জানলা লাগিয়ে ঘুমিয়েছিলাম, এখন সকালের নাশতা খেতে যাবো, দেরি হয়ে গেলে শাস্তিও খেতে হবে ডেজার্ট হিসেবে, তাই তাড়াহুড়োয় খুলতে গিয়ে দেখি জানলাটা এঁটে বসে আছে টাইট হয়ে, কোনমতেই খুলছে না। রাগের মাথায় কাঁচের উপর দিলাম এক ঘুষি। তাতে কাজ হলো ঠিকই, জানালা খুললো, কিন্তু সেই সাথে কাঁচ গেলো ভেঙে, আর অবধারিতভাবে আমার হাতও কেটে গেলো! আমার রুমমেটরা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আমার হাত থেকে গলগল করে রক্ত বেরুচ্ছে, এক্ষুণি হাসপাতালে দৌড়াতে হবে, আর আমি তখনো টাওয়েল পড়া। কোনমতে হাফপ্যান্ট গলিয়ে হাত চেপে ধরে দে ছুট! এক ছুটে সোজা ক্যাম্পাসের ভেতরের হাসপাতালে!

হাসপাতালে তখন ছিলেন সঞ্জুদা। ভাল নাম সঞ্জয়, আমাদের মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট। উনি আমার হাতের রক্ত দেখে দিলেন এক চিৎকার। সঞ্জুদা হিন্দু ছিলেন, তবু কেন জানি উত্তেজিত হয়ে গেলেই উনি আল্লাহ আল্লাহ করতেন। আমাকে নিয়ে গেলেন পাশের কেবিনে। ডেটল লাগিয়ে রক্ত মুছছেন, আমি ব্যথায় কঁকিয়ে উঠি, আর তখন উনি আমার চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে ওঠেন ‘আল্লা আল্লা আল্লা’ করে, ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আমার চিৎকার যায় থেমে!
এদিকে অনেক মুছেও রক্ত থামছে না দেখে উনি সিদ্ধান্ত নিলেন, উপায় নেই, স্টিচ দিতে হবে। আমি শুনে ঢোঁক গিললাম, জীবনেও এর আগে সেলাই টেলাই করতে হয় নি।

উনি খানিক খুঁজে টুজে বাঁকানো একটা ভয়ংকর দর্শন সুঁই নিয়ে হাজির, সেইটা দেখে অবধারিতভাবে মাছ ধরার বড়শির কথা মনে পড়ে যায়। আমি তা-ই দেখে কাতলা মাছের মত খাবি খেতে লাগলাম!

তখন হাসপাতালে আরও ভর্তি ছিলেন আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র মুহী ভাই, আমার চিৎকার শুনে তিনিও ততক্ষণে চলে এসেছেন।

আমি ভাবলাম, সেলাই যেহেতু করবে, নিশ্চয়ই আগে এনেস্থেশিয়া দিয়ে নিবে।

কিন্তু কীয়ের কি, সঞ্জুদা মুহী ভাইরে বললেন, ‘মুহী, এক কাজ করো, শক্ত কইরা ওর হাতটা চাইপা ধরো!’ আমি বলি, খাইসে আমারে। সঞ্জুদারে মনে হলো যেন ছুরি হাতে উদ্যত কুরবানীর হুজুর! সেই সাথে উনার মুখের সার্বক্ষণিক আল্লা আল্লা কুরবানীর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হয়ে বাজা শুরু করলো।

তো মুহী ভাই শক্ত করে হাত চেপে ধরলেন। সঞ্জুদা সেই বিকটদর্শন সুঁই নিয়ে আমার হাতের চামড়ায় দিলেন খোঁচা! ব্যথায় আমি দিলাম চিৎকার, আর উনি আমার চেয়েও জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, আল্লা আল্লা আল্লা! কি মুশকিল! জুৎমতন চেঁচাতেও পারি না!

দ্বিতীয় বার সুঁই ফোঁটাতে গিয়ে ওনার বেশ কসরত করতে হলো, বিরক্ত মুখ করে সঞ্জুদা বললেন, ‘মিয়া, তোমার হাতের চামড়া এতো শক্ত ক্যান!’ আমি তো হাঁ। বলে কি এই লোক!
শেষমেষ বহু কায়দা করে উনি সেই শক্ত চামড়া ভেদ করে সুঁই ফোটালেন, আর তারপরেই দিলেন জিভে কামড়। বললেন, ‘সর্বনাশ!’ আমি ভয়ার্ত চোখে ব্যথা ভুলে তার দিকে তাকালাম, ‘কি হইছে?’ উনি হতাশ হয়ে মাথা দুইপাশে নাড়াতে নাড়াতে বললেন, ‘ ভুল হয়া গ্যাছে, ভুল জায়গায় ফুটা করে ফেলছি, বের করে আবার নতুন করে করতে হবে!’

আমি তখন পাথর! কয় কি! রাগে দুঃখে বাংলা সিনেমার জসীমের মতন এক চিৎকার দিলাম, ‘ইয়াআআআআ সঞ্জুদা! ডিশুম!’
নাহ, ডিশুমটা বাস্তবে না। কিন্তু মুহী ভাই সে দিন আমার হাত না ধরে থাকলে সেটা যে বাস্তবেও হয়ে যেত, কোন সন্দেহ নাই!

শেষমেষ উনি তিনটা সেলাই দিয়ে থেমেছিলেন।
এই লেখা টাইপ করতে করতে বার বার চোখ চলে যাচ্ছে হাতের কাঁটা দাগটার উপরে, আর সেদিনের কথা মনে করে কেবলই হেসে ফেলছি!

কি একটা আজব সময়ই না কাটিয়ে এসেছি তখন।

শনিবার, এপ্রিল ১২, ২০০৮

হাওয়াই মিঠাই ৫

ঢাকা মেডিক্যালের কোন একটা জনবহুল ওয়ার্ডে প্রায় মাসখানেক কাটিয়ে ডেঙ্গু থেকে সেরে উঠে যেবারে বাসায় ফিরি, তারপরে অনেকদিন ডাক্তারের কাছে আর অসুখ নিয়ে আমাকে যেতে হয় নি।
গতকাল হলো, সম্ভবত বছর সাতেক বা তারও বেশি কিছু সময় বাদে।

অসুখ মানে সাংঘাতিক কিছু নয়। কাল দুপুরে মূল শহর থেকে বাসায় ফিরতে ফিরতে হঠাৎ দেখি ডানে-বামে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতে পারছি না। ঘুম থেকে উঠে মাঝে মাঝে এরকম বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার ঘটে, কিন্তু সে তো সাত সকালে! ভর দুপুরে হঠাৎ কোত্থেকে এই জিনিস উড়ে এসে জুড়ে বসলো আমার ঘাড়ে, মালুম করতে পারলাম না। সোজা রাস্তায় চোখ রেখে গাড়ি চালানোই নিয়ম, কিন্তু গাড়ি চালানোর সময় ডানে-বামে তাকানোটাও কি ভীষন জরুরি, সেটা গতকালের আগে আর এত ভাল করে কখনো আমাকে বুঝতে হয় নি!

কোন মতে বাসায় ফিরে সিলিং-এর দিকে লম্বালম্বি তাকিয়ে ছোটখাটো একটা ঘুম দিলাম, সন্ধ্যায় ঘুম ভেঙ্গে দেখি ঘাড় আরো শক্ত হয়ে গেছে! চোখের মণি শুধু এদিক ওদিক করতে পারি, এত বড় মুন্ডুর আর কোন কিছুই নড়ছে না কোন দিকে। শুনেছি প্যাঁচা নাকি চোখের মণি নাড়াতে পারে না, এই জন্যে সৃষ্টিকর্তা তাকে অবিশ্বাস্যভাবে ২৭০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘাড় ঘুরাবার অনুমতি দিয়েছেন। আর বেচারা আমি, একটু খানি মণি ঘোরাই, তার বদলে আমার ঘাড় এমন করে আটকে দিতে হবে! হায়, এ কেমন বিচার!

তবুও ডাক্তারের কাছে যাবো না বলেই ঠিক ছিল মনে। 'ওষুধ খেলে রোগ সারে সাতদিনে, আর না খেলে মাত্র এক সপ্তায়'- এই মতবাদে ঘোর বিশ্বাসী আমি ঔষধও খাই না কত বছর মনে নেই।

কিন্তু আমার বন্ধু-ভাগ্য বরাবরই ভালো। এই দুরদেশেও তাতে আকাল ঘটে নি। ফোনে খবর পেয়ে সেরকমই একজন বাড়ি এসে আমাকে জোর করে ডাক্তারখানায় নিয়ে গেলো। শত আপত্তিতেও টলানো গেল না। ঘাড়ে ধরেই নিতো, নেহাৎ সেখানে ব্যথা ছিলো বলে বেঁচে গেছি।

এপয়েন্টমেন্ট ছাড়া গেছি, লম্বা সময় অপেক্ষার পরে ভেতরে ঢুকবার সুযোগ হলো।
ডাক্তার ভদ্রলোক এইদেশী নন। আফ্রিকান মহাদেশের কোন এক দেশের হবেন। আমার সমস্যা শুনে বেশ বুঝদারের মতন মাথা নাড়লেন, তার মাথা নাড়া দেখে শক্ত ঘাড়ে বসে বসে রীতিমতন ঈর্ষা বোধ করতে থাকলাম। তারপরেই পান চিবুনোর মতন ভঙ্গিতে তিনি যে কি কি আমাকে বলে গেলেন, তার কিছুই আমি বুঝলাম না। অজিদের আখাস্তা ইংরেজী শুনে ইতিমধ্যেই আমার কান পঁচে গেছে, আমেরিকান ইংরেজি এখন তাই কানে মধুবর্ষণ করে। আমি জানি যে আফ্রিকান ইংরেজিও অনেক ভালো, কিন্তু ইনি কোন ইংরাজিতে কথা কন?

আবারও উদ্ধার করলেন সেই বন্ধু, মোটামুটি দোভাষীর কাজ চালালেন কিছুক্ষণ। একটা ছোট্ট সাইজের প্রেসক্রিপশান হাতে বের হলাম, ভল্টারেন নামের কোন একটা পেইন কিলারের উপদেশ দেয়া তাতে।
আমার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। লম্বা সময় ওষুধ থেকে দুরে থেকেছি, ভালোই ছিলাম। এই নীরিহ-দর্শন ওষুধের কল্যাণে আবার সেই জগতে প্রবেশ করতে হবে না তো!

হে প্রভু, রক্ষা করো, আমি আর প্যাঁচাকে নিয়ে তোমার সাথে বদমাইশি করবো না। মুখপোড়া জীবনানন্দ মরুক গিয়ে, ভেসে যাক কোন বেনো জলে, আমাকে তুমি ভালো করে দাও!