শুক্রবার, মে ৩০, ২০০৮

হাওয়াই মিঠাই ৬

বৈদেশে বসতি গাড়লে, কমবেশি সকলেরই পছন্দের চ্যানেল একটাই হয়, নাম তার ইউটিউব।

উপমহাদেশীয় চ্যানেলগুলায় এখন ট্যালেন্ট হান্ট জাতীয় সংগীত প্রতিযোগীতার ছড়াছড়ি। ঘরে ফিরে বউ তার জাগতিক সকল কর্ম ভুলে ইউটিউব খুলে নিয়ে বসে। এর মাঝে চ্যানেল আই সেরা শিল্পী নামের একটা অনুষ্ঠান খুব জাঁক জমক নিয়ে শুরু হয়েছে। ক্লোজআপ ওয়ানের মতই একটা প্রোগ্রাম, তবে এদের বাজনা বোধহয় আরো বেশি!

আমার আবার সময়ের টানাটানি। সারাক্ষণই নিজের জন্যে মাল্টি টাস্কিং ফর্মুলা চালাতে হয়। ডেস্কটপে কোন মুভি চালিয়ে দেখতে দেখতেই ল্যাপটপে হয়ত গুগল ডক খুলে হাওয়াই মিঠাই এর ড্রাফ্ট সেরে নিচ্ছি। অথবা সচলায়তনে ঢুকে টুক টাক মন্তব্য ঝেড়ে দিচ্ছি।
কিন্তু বউয়ের সেটা পছন্দ নয়!

সিনেমার বেলায় মুখ বুজে সহ্য করে। কিন্তু গানের এই প্রোগ্রামগুলোতে আমার হাংকি পাংকিতেও কাজ হয় না। এক দফা এক দাবী, পূর্ণ মনোযোগে সেই গান আমার দেখা চাই।

তা দেখি, কিন্তু ওর চোখ এড়িয়ে ল্যাপটপে নিজের কাজ চালাতেও ভুলি না। মাঝে মাঝে খুব ভাব নিয়ে বলি, "নাহ, এই জায়গাটা ভাল গায় নি, সুর কেটে গেছে।" অথবা, "বাহ, এ তো খুব ভাল গায়!"
সবসময় অবশ্য পার পাই না, মাঝে সাঝেই ধরা খেয়ে যাই। কারণ বউ প্রায়শই স্পট কুইজ নেয় আমার। "বলতো জাজ কি বলেছে মাত্র?" অথবা, "মেয়েটার এক্সপ্রেশানটা দেখলি?"
তো, এই ক্যুইজের ভয়েই আমার মনোযোগ বাড়িয়ে দিতে হয়, কি আর করা।

চ্যানেল আইয়ের প্রোগ্রামটা বেশ আটঘাট বেঁধেই করা হয়েছে। পরিকল্পনায় আছেন বোধহয় আফজাল হোসেন। স্টেজের জাঁকজমক দেখে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। জাজ প্যানেল নিয়ে তো কোন কথাই হবে না, আমাদের একদম সেরা সব শিল্পীদের নিয়ে আসা হয়েছে সেখানে। কিন্তু ফারজানা ব্রাউনিয়া এরকম রোবট হয়ে গেল কেমন করে? ওর আগের কোন একটা স্ট্রিট শো জাতীয় কিছু একটা দেখেছিলাম, সারাক্ষণই দৌড় ঝাঁপ করে বেড়াত সেখানে। আহা, দেখতেও ভাল লাগতো। কিন্তু গানের অনুষ্ঠান যেমনটা হওয়া দরকার, ভীষণ প্রাণবন্ত, এখানে তার ছিটে ফোঁটাও নেই! একদম নিক্তি দিয়ে মেপে মেপে কথা বলছে, ভীষণ দৃষ্টিকটুভাবে একবার ডানদিকে ফিরছে আবার বাম দিকে, সত্যিই যেন রোবোকপ দেখছি! সেই প্রাণময়তা কোথা হারালো?
এর চেয়ে বরং ঐ মেয়েটাকেই উপস্থাপনায় নিয়ে এলে ভাল হতো- নাম ভুলে গেছি- দিহানের বোন- জেলায় জেলায় বাছাই পর্বগুলোয় যে উপস্থাপনা করছিলো। ও-ই বরং অনেক বেশি মানানসই। আফজাল বোধহয় অন্য দেশের ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামগুলো খুব একটা দেখেন নি, নিদেনপক্ষে আমাদের দেশেরই এনটিভি আয়োজিত আগের দুটো ক্লোজআপওয়ান! দেখে নিলে ভাল হতো।

খুঁজে খুঁজে গানের অনুষ্ঠান দেখার বাতিক আছে আমাদের দুজনেরই। এরকম আরেকটা প্রোগ্রামেরও নিয়মিত দর্শক আমরা দুজন, আমারও গাইতে ইচ্ছে হলো। ফারাহ রুমার উপস্থাপনায় মূলত গীতিকার বা সুরকার যারা গানও করেন, তাদের নিয়েই এই অনুষ্ঠান। এটার ডেব্যু করেছিলাম অর্ণবকে দিয়ে, তাতেই আরো ভক্ত হয়ে গেছি। ফারাহ রুমার স্মার্টনেসও দেখবার মতন, সুন্দর বাংলায় উপস্থাপনা করে, খুব সহজেই বিজ্ঞাপন বিরতি নেয়, ব্রেক নেবার দরকার হয় না। কথাও বলে "দর্শক"দের উদ্দেশ্য করে, ভিউয়ার্সদের নয়। এইখানে নিশ্চয়ই পরিচালকের কিছু কারিগরি আছে, তারপরেও উপস্থাপিকাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সহজ সুন্দর বাংলার শান্তি দেবার জন্যে।

এরকম আরেকটা অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে মজা হলো। নাম ভুলে গেছি সেটার, অতিথি হিসেবে এসেছিলেন বাপ্পা মজুমদার, শওকত আলী ইমন আর শ্রাবস্তী তিন্নি। বাপ্পা ইমন ঠিকাছে, কিন্তু গানের প্রোগ্রামে তিন্নিকে দেখে একটু বিষমই খেলাম। কাহিনি কি? খানিক কথাবার্তার পরে যখন শুনলাম তিন্নি গান গাইবে, এবারে সত্যিই নড়েচড়ে বসলাম। মোটামুটি নিশচিতই ছিলাম, আরও একটা ঘোড়ারোগের প্রকৃষ্ট উদাহরণ পাবো ও গলা খুললেই। আনন্দে আমার থাবা থেকে নখ বেরিয়ে গেলো, এইবার পাইছি!

কিন্তু ও গান শুরু করতেই অবাক হলাম! চমৎকার গলা, আর খুবই সুন্দর গায়কী। মিতালি মুখার্জীর বহু পুরনো একটা গান "হারানো দিনের মত, হারিয়ে গেছ তুমি" খুবই চমৎকার করে গাইলো। ভুল টুল ছাড়াই খুব চমৎকার করে সামলে নিলো গানের কারুকাজগুলো। আমি, প্রকারান্তরে মুগ্ধই হলাম বলা চলে।

ওই গানটা নেই, তবে তিন্নির আরেকটা গান পাওয়া গেছে নেট খুঁজে। এখানে তুলে দিলাম সেটা।
কদিন ধরে ঘুরেফিরেই শোনা হচ্ছে গানটা, ভালও লাগছে বেশ।


Vabe_Mon_Okaron_Sa...


বৃহস্পতিবার, মে ২২, ২০০৮

হারানো বিজ্ঞপ্তি-

রাতের গায়ে ইদানিং দুধের সরের মতন কুয়াশা জমে থাকে, মাত্রই বৃষ্টি হয়ে গেলো যেন- ভেজা আর সতেজ ভাব চারিদিকে।

এই রকম রাতগুলোয় আকাশে চাঁদের দিকে তাকিয়ে বারে বারে চমকে উঠি।
চাঁদের নানান রূপ দেখেছি আমি-রূপসী বা রূপালী, ময়লা কিংবা বুড়ি চাঁদ।
নির্মলেন্দুর চোখ চোখে নিয়ে একসময় চাঁদকে কাঁচুলিবিহীন উলংগ বুকের যুবতীও ভেবে নিয়েছি; কিন্তু আর, কোথাও কখনও, এরকম ভৌতিক চাঁদ দেখিনি আমি।
মাথা থেকে হাত দেড়েক উপরে ঝুলে আছে খুব বিশ্রী ভাবে, অনাহুত মাকড়শার অবিন্যস্ত জালের মত।

একটা কালো রঙের এক চোখা নেকড়ে যেন ঘোলাটে সাদা চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। খানিক পর যখন গা শিউরে ওঠে, ত্রস্তে জানালার পর্দা টেনে সরে দাঁড়াই।
বড়ই অভাগা মনে হয় এই শহরটাকে তখন, চাঁদও যেখানে তার রূপ ভুলে ফেলে আসে।

আহা, কেউ যদি আজ আমাকে শহীদুল্লাহর পুকুর পাড়ের সেই মায়াবিনী চাঁদকে এনে দিত, তার সারাজীবনের কাঠি লজেন্সের পয়সা দিয়ে দিতাম।
অথবা, শালবন বিহারের পাহাড়ের বুক ঘেঁষে আড়মোড়া ভেঙ্গে হাতছানি দিয়ে ডাকতো যে কিশোরী চাঁদ, তার বিনিময়ে দিয়ে দিতে পারতাম গোটা একটা শিমুল গাছ।
আহা, কেউ যদি এনে দিত তারে।

------------
২১ মে, ২০০৮

রঙ পেন্সিল

মেঘে মেঘে নিকষ কালো দুপুর,
আলতা মেখে ফড়িং ওড়ে,
বৃষ্টি টাপুর টুপুর।

বৃষ্টি পড়ে উইপোকাদের গায়,
সূর্যমূখীর বুকের ভেতর
স্বপ্ন বাড়ি যায়।

আকাশ বেয়ে নামলো একটা পরী,
রূপনদীতে ডুবে ডুবে
কী করি, কী করি!

থাকুক না হয়, এমন করেই, যা-হোক,
আকাশ নদী মেঘ পরী আর
ছোট্ট একটা ডাহুক।

এমনি করেই, টুকরো টুকরো দাগে,
আঁকার খাতা ভরিয়ে তুলি,
আশাবরী রাগে।


-----
১৬ মে, ২০০৮

কোনদিন আসিবেন বন্ধু

ক্লাশের ভেতরে উৎকট শব্দে হঠাৎ চমকে উঠলাম। বিরক্ত অনেকগুলো মুখের সাথে আমিও শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করি, সবাই ভ্রু কুচকে আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। কি মুশকিল! এই বোরিং লেকচার শুনতে শুনতে কখন যে ঝিমুনি এসে গেছিলো টেরই পাই নি, চট করে পকেটে হাত দিয়ে মোবাইল ফোনটা বের করলাম, শব্দটা হচ্ছে ওখান থেকেই।

মেসেজ এসেছে। সেই মেসেজের প্রথম চারটে শব্দ পড়ে আবারো চমকালাম, " হ্যাপী বার্থ ডে দোস্ত"। কয় কি! তারিখ তো ঠিকই আছে, কিন্তু মাস কি সেপ্টেম্বর চলে এলো নাকি? মে- কই গেল তাহলে? জুন জুলাই অগাষ্ট?
কিন্তু তারপরেই মনে পড়লো, উরিশশালা! আজকে ১২ই মে। আজ তো আমাদের সবার জন্মদিন!

দিন-মাস-বছর হিসেব করতে গিয়ে অবাক লাগলো। চোদ্দ বছর পেরিয়ে গেছে এর মাঝে! বাসায় ফিরে ফেইসবুকে কথা চালাচালি, জিমেইলে, ফোনে- সব বন্ধুদের বহুদিন বাদে ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাংগানো চললো বেশ অনেকক্ষণ।

চোদ্দ বছর আগে, ১৯৯৪ এ, চাঁদে মানুষ যাবার প্রায় বছর পঁচিশেক বাদে আমরা একান্নজন নীল আর্মষ্ট্রং ১২ মে দুপুর বেলায় কুমিল্লা শহরের কাছেই কোটবাড়িতে আমাদের ছোট্ট সুন্দর কলেজে প্রথম পা রেখেছিলাম। সপ্তম শ্রেণীতে পড়া ছোট ছোট মানুষদের লিটল স্টেপস দিয়ে বাবা-মায়ের জায়ান্ট স্বপ্ন পূরণের প্রথম চেষ্টা!

আজ সেই পুরনো ছবিগুলো আবার দেখলাম বসে বসে, আমার সত্যিই কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না, এতগুলো দিন কেটে গেছে এর মাঝে। সময় সত্যিই পলক ফেলার আগেই যেন দৌড়ে চলে যায়। মাঝের এতগুলো দিন, মনে হচ্ছে শীতের দুপুরের খুব আরামদায়ক একটা ভাত-ঘুমের চেয়ে খুব লম্বা সময় তো নয়, এতই দ্রুত কেটে গেল।

প্রথম দিন- নিজের নাম বলে বলতে হয়েছিলো- "আমি তোমার ক্লাশমেট, তোমার নাম কি?" সেই "ক্লাশমেট" থেকে একটু একটু করে আমরা এতগুলো ছেলে কেমন করে যে প্রাণের "বন্ধু" হয়ে গেলাম, নিজেরাও জানি না।
য‌ত‌বার‌ই ভাবি, কিছু এক‌টা লিখি সেই ছ‌য় ব‌ছ‌র নিয়ে, আমার জীবনের সামার অব সিক্স‌টি নাইন স‌ম‌য়‌গুলো- নিঃশ্বাস আট‌কে আসে। স‌ত্যিই ম‌নে হ‌য় লিখ‌তে লিখ‌তে ম‌হাকাব্য‌ হ‌য়ে যাবে, ত‌বু ব‌লার ক‌থা শেষ হ‌বে না। চেনা নেই জানা নেই, একান্ন‌টা ভিন্ন‌ প‌রিবার থেকেঠিক স‌মান সংখ্য‌ক ভিন্ন‌ ম‌ন নিয়ে এসে এক‌সাথে আম‌রা একান্ন‌ব‌র্তী প‌রিবার হ‌য়ে গেলাম যেন। দিন‌ রাতের পুরোটা সময় একসাথে খাওয়া-বসা-পড়া, নিঃশ্বাসের বাতাসটুকুই শুধু নয়, এতগুলো কিশোর ছেলে-পেলে আমরা নিজেদের স্বপ্নটুকুও ভাগাভাগি করে নিতাম। আহা, "শেয়ারিং" শব্দটার ঠিক অর্থ নিজের জীবনে বুঝতে চাইলে কেউ যেন আমাদের কলেজে পড়ে।

বন্ধুত্ব ছিলো, স্বপ্ন পূরণের স্বপ্ন ছিলো, আবার রাজনীতিও ছিলো ওখানে, পেয়েছি বিশ্বাসঘাতকতার তিক্ত স্বাদ। জীবনের ঐ ছোট্ট সময়টুকুতে আমরা যেন ঠিক আরেকটা জীবন কাটিয়ে এসেছি।

"৯৪ এর পরের প্রতিটি বছর আমরা ১২ইমে উদযাপন করেছি আমাদের ব্যাচের জন্মদিন হিসেবে। কলেজের নিয়মের বেড়াজালে থেকে লুকিয়ে চুরিয়ে, খানিকটা সিনিয়র হবার পরে সীমাবদ্ধ আড়ম্বরে।

কলেজ ছেড়ে বেরিয়েছি আজ আট বছর হতে চললো, মাঝের প্রতিটা বছর ঠিক এই দিনে একইভাবে নিজেরা নিজেদের উইশ করেছি। বের হবার পর প্রথম ক"বছর কাছাকাছিই ছিলাম, হয়তো রিক্সা বা বাসের দূরত্বে। ধীরে ধীরে বাড়ল সেটা, গড়ালো মুঠোফোনে। লম্বা সময় বাদে এখন যোগাযোগের মাধ্যম কেবলই ইন্টারনেট। জিমেইলের বাহন চড়ে, অথবা অধুনা ফেইসবুক, দূরত্বের মাপকাঠি এখন রিক্সাভাড়া নেই, হয়ে গেছে অপটিক্যাল ফাইবার। তবু একসময় ভোরের কুয়াশা সরিয়ে একসাথে পা মিলিয়ে যাদের সাথে পা ফেলতাম, যাদের সাথে একসময় নিজের হৎস্পন্দনও বাঁধা ছিলো একসুরে, প্রাণের সেই বন্ধুদের আজ ভীষণ মিস করছি। খুব খুব খুব।

দোস্তরা, ভাল থাকিস, শুভ জন্মদিন তোদের সবাইকে।
শুভ জন্মদিন, আমাদের সবাইকে।


সোমবার, মে ১২, ২০০৮

দিন বাড়ি যায়

পায়ের তলায় চাকা লাগিয়ে দৌড়ুচ্ছি, চৌপর দিনভর ব্যস্ত থাকি।
গত একমাসে প্রায় কিছুই লেখা হয়নি আমার, অবশ্য পড়েছি প্রচুর। সুখের খবর হচ্ছে, পড়তে চাইলে সচলায়তনে এখন লেখার অভাব নেই!

লিখতে চাইনি, তা নয়। গত মাসে পরপর দুই রবিবার দুইটা পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে মনে হয়েছিলো, এই নিয়েই লিখি না কেন? বেশ তো মজা হলো। আমাদের দেশীয় উৎসবগুলো নিয়ে এখানে এইসব সমস্যায় পড়তে হয়। যদি উইকেন্ডে আপনা থেকেই না পড়ে, তাহলে জোর করে সেটাকে এনে উইকেন্ডে ফেলে উৎযাপন করা হয়। বৈশাখ তো বৈশাখ, এমনকি ঈদের আনন্দও এইরকম শিফটিং এর কবল থেকে বাঁচতে পারে না সবসময়। দেশে লোকে ঈদ করে চাঁদ দেখে, আমরা এখানে করি উইকেন্ড দেখে।

প্রথম উৎসবে গিয়ে পেটপুরে সিংগারা খেলাম। ফেইস-বুকিশরা জানেন, তার আগের একটা সপ্তাহে আমার হঠাৎ করে সিংগারা-বিরহ শুরু হয়েছিলো। সেটা সামাল দেয়ার জন্যেই একরকম হুড়োহুড়ি করে গেছিলাম বৈশাখ আয়োজনে।

আর ২য় উৎসব হয়েছিলো অনেক বেশি জমজমাট করে, মেলবোর্নের বিখ্যাত ফেডারেশান স্কোয়ারে। সিডনীতে বাংগালী অনেক, বেশ বড় করেই তাই উৎসব হয় ওদের। কিন্তু মেলবোর্নে উৎসব মানেই চেনা-জানা দুতিনটে কম্যুনিটি সেন্টারের কোন একটায় ছোটখাটো আয়োজন। মেলবোর্নবাসী জাতে উঠছে, ফেডারেশান স্কোয়ারে অনুষ্ঠানটা মোটামুটি এইরকমই একটা ঘোষণা বলা যায়। চ্যানেল আই দেখিয়েছে সেটা টিভিতে, নানান রাঘব কোম্পানী স্পন্সর করেছে।
আমি অবশ্য পুরোটা দেখতে পাইনি। সারাদিন কাজ ছিলো, সব শেষ করে আমি যখন পৌঁছুই তখন সমাপনী সংগীত শুরু হয়ে গেছে, তোমার হলো সারা, আমার হলো শুরু।

সেই উৎসবে একজন দীর্ঘদেহীকে দেখে খুব পরিচিত মনে হলো, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছি না কোথায় দেখেছি ওনাকে। অনেক চিন্তা ভাবনা করে শেষমেষ কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম সরাসরি। প্রথমে কলেজের নাম বললাম, না, উনি সেখানে পড়েন নি। তারপরে ইউনিভার্সিটির কথা বলতেই মিলে গেল। জানালেন, শহীদুল্লাহ হলে থাকতেন। আমি থাকতাম অমর একুশে হলে। উনি শুনে বললেন শেষের দিকে ওখানেই চলে এসেছিলেন। আমি তো খুব খুশি, ভাই-টাই ডেকে কথা শেষ করে যখন চলে আসছি বাসায়, তখন হুট করে মনে আমার পড়লো ওনাকে তো আসলে সিনিয়র হিসেবে পাইনি ভার্সিটিতে, উনি একুশে হলের হাউস টিউটর ছিলেন! কি সর্বনাশ!
তো এই নিয়েও লিখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সময় পাই নি শেষমেষ।

তারপরে মাঝে আবার উবুন্টু নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছিলাম অনেক সময়। ইচ্ছে করে নয় অবশ্য। স্বল্প ড়্যামের ল্যাপটপে ভিস্তা চালানো আর ঘোড়ার রেসে শামুক দৌড়ানো প্রায় সমার্থক। এই ঝামেলা থেকে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম অনেক আগেই, কিন্তু বাংলা লেখার জন্যে আমি শতভাগ নির্ভর করি অভ্রের ওপর, এদিকে লিনাক্সে অভ্র না চলায় বাধ্য হয়েই ভিস্তা পুষছিলাম। শাব্দিক নামে ফায়ারফক্সের জন্যে একটা প্লাগইন আছে, যেটা দিয়ে লিনাক্সেও অভ্র ব্যবহার করা যায়, কিন্তু সেটা পুরোপুরি নির্ভুল নয়। চ আর ছ-এ কি এক শত্রুতা বাঁধিয়ে রেখেছে, কিছুতেই তারা যুক্ত হয়ে চায় না, জ্ঞান লিখতে গেলে লিখতে হয় গ্গান। এই মুশকিল সমাধান করছি বড়ই অদ্ভুত উপায়ে। উবুন্টুর ডিফল্ট কি বোর্ড প্রভাতও রেখে দিয়েছি। প্রায় সব লেখাই লিখি শাব্দিক প্লাগইন দিয়ে, লেখা শেষে বানানগুলো ঠিক করি প্রভাত দিয়ে। এইভাবে কতদিন চালাতে হবে বলা মুশকিল, কারণ শুনেছি অভ্র-র হর্তাকর্তাদের লিনাক্স খুব একটা প্রিয় নয়।
এই জোড়াতালির কষ্টের কথাও লিখব ভেবেছিলাম একদিন, হলো না।

আবার সচলায়তনে যখন এই সময়ের বাংলা গান নিয়ে বেশ জোর তর্কালোচনা চলছিলো, আমি চুপচাপ পড়ে গেছি। অনেকদিন আগে একবার ছয় নম্বর বাস অথবা হয়তো শাপলা সার্ভিসে অথবা অন্য কোন বাসে চড়ে টিউশানিতে যাচ্ছিলাম। যেতে যেতে দেখি আমার পেছনের কোন একটা সীটে বছর পঁচিশের এক ছেলে হাতে একটা বই ধরে বসে আছে। সন্ধা হয়ে গিয়েছিলো, বাস চলতে চলতেই বাসের ভেতরের অথবা বাইরের রাস্তার আলো এসে পড়লে, সেই আলোয় সেই ছেলে বই পড়ে, আর পড়তে পড়তে আবেগে চোখ মুছে। এই দৃশ্য দেখে আমি অভিভূত হয়ে পড়ি, সেই লেখকের নাম জানার জন্যে উদগ্রীব হয়ে পড়ি মুহুর্তেই, কিন্তু কিছুতেই সেই সার্থক লেখকের নাম দেখতে পাই না। অবশেষে, আর কিছু পরেই যখন আমাকে বাস থেকে নেমে যেতে হবে, তাই আর থাকতে না পেরে খানিকটা নির্লজ্জ হয়েই মাথা পুরো ঘুরিয়ে দেখে নিলাম লেখকের নাম, আর দেখে ভীষণ অবাক হলাম। না, আমার চেনা-জানা অথবা সুপরিচিত কোন লেখকের বই ছিলো না তা, কী নাম ছিলো এতদিন পরে আর মনে করতেও পারছি না, হয়তো ছিলো কাশেম বিন আবুবকর, অথবা নিশাত চৌধুরী বা অন্য কেউ। কিন্তু তারপর থেকে আমি আর বই বা গানের পছন্দ নিয়ে বড় একটা আলাপে যাই না। কার যে কী ভাল লাগে, কে-ই বা তা জানে! আমার নিজের ভেতরেও কত রকমের স্ববিরোধীতা! আনিলা বা এলিটার গান খুব ভাল লাগে কিন্তু এদিকে মিলা বা ইভা রহমান শুনলে গা রিরি করে ওঠে। ফরিদা পারভীন শুনে চুপ করে বসে রই, আবার চুপটি করেই শুনি আনুশেহ। হাবিবের কিছু ভাল লাগে, কিছু মন্দ লাগে, আর ফুয়াদকে শুনতে পারি না একদমই। কিন্তু আমার সবচেয়ে অবাক লাগে এদের সাথে এক সমতলে কেউ যখন অর্ণবের নাম নেয়! মন দিয়ে গান শোনে আর প্রাণে সেটা অনুভব করে এমন কারো এরকম ভুল হতে পারে বলে আমি মনে করি না। বাঙ্গালী মাত্রই লেট লতিফ, সময়ে লোকের মূল্যায়ন করতে জানে না, দেরি করে ফেলে সবসময়েই। আজ থেকে বছর কুড়ি বাদে এই সময়ের গানকে যদি কেউ অর্ণব যুগের গান বলে পরিচয় করিয়ে দেয়, এই আমি অন্তত অবাক হবো না।
তো লিখতে চেয়েছিলাম এই বহু পুরনো গল্পের কথা, চেয়েছিলাম অর্ণবের কথা বলতে, কিন্তু সময় হলো না।

এর মাঝে আরো অনেক কিছুই হলো। পদ্মায় নতুন করে চর পড়লো, আমার ওজন বেড়ে গেলো প্রায় কেজির কাছাকাছি, অস্ট্রেলীয় সৈনিক মারা গেল পরবাসী যুদ্ধে, এক ভারতীয় ট্যাক্সি ড্রাইভারকে কারা যেন ছোরা মারলো এখানে, পার হয়ে গেল আমার বস সত্যজিতের জন্মদিন। এ সব কিছু নিয়েই কত কী লেখার ছিলো, কিন্তু আর হলো কই!

এই করে করে চলেই এল পঁচিশে বৈশাখ। এই এক আশ্চর্য দিন। এমনকি এই জবরজং শীতের জংলা কুয়াশারও যেন মনে থাকে এই দিনের কথা। আমার ঘরে গীতবিতান খোলা হয়, নেটে বসে রবি দাদুকে সেলাম ঠুকি বারে বারে। তারপর আয়েশ করে গা এলিয়ে দিয়ে শুনি পাশ থেকে বউ গুন গুন করে গাইছে, আমায় নহে গো ভালবাসো শুধু, ভালবাসো মোর গান। হুম, নজরুল গেয়েই তাহলে রবিকে শুভেচ্ছা জানানো? তবে তাই হোক।
আর এইসব টুকরো টাকরা ভাবনা আর কয়েক চিমটি স্মৃতি মিলিয়ে আমি শেষ মেষ লিখেই ফেলি আমার দিন যাপনের গালগপ্পো।