সোমবার, জুলাই ২৮, ২০০৮

হাওয়াই মিঠাই ১০

গত কয়েকদিন খারাপ খবর পেয়ে পেয়ে আমার সেটাই অভ্যেস হয়ে গিয়েছিলো। ব্লগ আর মেইল খুলে আজ শুনি এই তো কাল শুনি ঐ। সারাদিন মুখ কালো করে ঘুরে বেড়াতাম, আর ভাবতাম, আশি নম্বর বন্দরে এই কর্মবিরতির কারণ কি?
মাঝে অনেক জল ঘোলা হয়েছে, আপাতত সুদিন ফিরে এসেছে, এখন আবার স্বর্গের দুয়ার খোলা, আমিও হাঁপ ছেড়ে বলি লে বাবা। মনটাও বেশ ফুরফুরে।
এই ফুরফুরানির পেছনের আরও একটা কারণ- দেশ থেকে কিছু বই হাতে পেলাম কালই। অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম । বহুদিন বইমেলায় যাই না, নতুন বইয়ের গায়ে নতুন প্রেমিকার চেয়েও বেশি নেশা ধরানো মাতাল গন্ধ থাকে, সেটার স্মৃতি প্রায় ভুলতে বসেছিলাম, অনেকদিন পরে ফিরে এলো।

বইয়ের লিষ্টি এখান থেকেই পাঠানো। বহু দৌড়ঝাঁপ করে সুহৃদরা খুঁজে খুঁজে কিনেছেন। এর মধ্যে কিছু ব্লগারদের বই।
আলবাব ভাইয়ের বউ, বাটা বলসাবান দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো। এইরকম আকৃতির বই- ঠিক একটানে কিশোরবেলায় নিয়ে আছড়ে ফেলে। সেই শীর্ষেন্দুর জাদু-মাখা বইগুলোয় ছেয়ে থাকা কিশোর বেলা! আরিফ জেবতিকের ধুলিমাখা চাঁদের ফক্ফকে জোছনার একটা টুকরাও আমার বাসায় এখন। এখনও সচলায়তনের পূর্ণ ব্লগার নয়, সেই মূর্তালা রামাতের কষ্টালজিয়ার, কি মুশকিল, একেবারে দু দুটো কপি কেমন করে যেন চলে এসেছে। অমিত আহমেদের গন্দম কেনা হয়েছে জানি। কিন্তু আঁতি পাতি করে খুঁজেও বইয়ের প্যাকেটে কোথাও পেলাম না সেটা। হদিশ করার চেষ্টা চলছে এখনও।
ব্লগারদের বই কিনতে শুদ্ধস্বরে হাজির হয়েছিল আমার বউ-এর বড় বোন। সৌভাগ্য এই, গিয়ে দেখাও হয়েছিলো (আহমেদুর রশিদ) টুটুল ভাইয়ের সাথে। পরে জানতে পেরেছি, উনি বিস্তর সহায়তা করেছেন আমাদের আপুকে। মজার ব্যাপার, বইয়ের নামের লিষ্টি শুনে উনি নিজেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, যাদের জন্যে কেনা হচ্ছে তারা ব্লগার কিনা!
টুটুল ভাই আমার পিতৃদত্ত নাম শুনে চিনতে পারেন নি। :) অন্য নামে ব্লগিং করার এই হলো কুফল। কিন্তু তারপরেও আন্তরিকতার কোন কমতি ছিল না, টুটুল ভাইকে অশেষ কৃতজ্ঞতা।
মিসিং বইয়ের তালিকায় আরও আছে শহীদুল জহিরের কোন একটা সমগ্র। এই নিয়েও দুঃখে আছি, বিচ্ছিন্ন কিছু গল্প বন্ধুদের কল্যাণে পড়েছি, তবে আরও ভাল করে পড়ার ইচ্ছে ছিলো।

অন্য বইগুলোও আপাতত শুঁকে শুঁকে দেখছি। হাসান আজিজুল হকের আগুনপাখিও এলো হাতে। প্রবাসে বই আনাতে গেলে বইয়ের সংখ্যার চেয়েও ওজন ঝামেলা করে বেশি। তারপরেও দুটো মোটা মোটা বই চলে এসেছে, একটা হলো তিলোত্তমার রাজপাট। এই লেখকের কোন গল্প এর আগে ভাল করে পড়িনি, পড়ে দেখবার জন্যেই আনা, কেমন হবে এখনো জানি না।
অন্য মোটা বইটা, এতদিন পরে, আমি জানি, খুবই আজব, তবু, হাতে যে এলো সেই অনেক, খুব খুশি, মানে বইটার নাম, অবশেষে!- সচলায়তন সংকলন!
গত বইমেলায় বের হওয়া এই বইটা সত্যিই আমি মাত্র গতকাল হাতে পেলাম। হাতে পেয়ে কি যে করবো বুঝে পাচ্ছি না! বেচারী এসে ঠিক যেন বনলতা সেনের মত লাজুক ভঙ্গিতে আমার হাতে এসে বসেছে, আর আমিই তাকে উল্টো জিজ্ঞেস করছি, এতদিন কোথায় ছিলেন?
বইটা অদ্ভুত সুন্দর হয়েছে, জাস্ট অদ্ভুত! প্রচ্ছদের জন্যে সুজন্দাকে অনেক ধন্যবাদ। পুরো খাটাখাটুনির জন্যে মাহবুব আজাদ আর সুমন চৌধুরির অনেক অনেক ভদকা পাওনা হয়ে গেছে!
এই সব সহায় সম্পত্তির মালিক বনে গিয়ে বেশ আনন্দে আছি। আগামী বেশ অনেকদিন এসব উল্টে পাল্টে পড়তে পড়তেই সময় চলে যাবে আশা করি।

শেষ করি একটা কথা বলে।
বইয়ের ফ্ল্যাপে আলবাব ভাইএর ইমেইল আইডি দেখলাম,এটা বেশ আধুনিক ব্যাপার, এখন বেশিরভাগ লেখকই তা-ই করেন। কিন্তু আমি চেয়ে দেখি, তার নিচেই আরেক ঠিকানা, সচলায়ত.কম/আলবাব, মনটা খুশিতে ভরে গেলো। এই রকম একটা ঠিকানার মালিক এখন আমরা সবাই। আমরা সবাই এই একটা ঘরের সাথে একটা স্ল্যাশের বাঁধনে বন্দী।
আলবাব ভাইকে এর আগে এত বেশি আপন মনে হয়েছে কিনা মনে করতে পারছি না!

মঙ্গলবার, জুলাই ১৫, ২০০৮

বলদ প্রজন্ম

রাত-ঘুমে আমি আর কোনও স্বপ্ন দেখবো না বলে পণ করেছি।

তারচে ঢের ভাল, কুচি করে কাটা ছোট পেঁয়াজ মাখিয়ে, আর খানিকটা সর্ষে তেলে, ভাজা ভাজা, মুড়ি খাই বসে। গুরুজনেরা বলে গেছেন, মাঝে মাঝে ওরকম মুড়ি খাওয়া ভালো।

আয়নায় দুয়েকবার, ভুলে চুকে, চোখ পড়ে গেলে, খানিকটা লাজ শরম লাগে বৈকি! তবু, খুবেকটা চিন্তিত নই। বাজারে হালাল সাবানের ছড়াছড়ি, মুখ ধোয়া মোছা শেষ করে, জিভ দিয়ে সামান্য চেটে নিলেও বেশ কাজে দেয়। ভেতর বাহির, সবই পাক-সাফ।

দিনমান, আলু দিয়ে রুটি দিয়ে ভাজি ভুজি খাই, চাপাতিও খাই, মাঝে মাঝে চড় চাপাটিও খাই। তাপ্পরে, ঘরে এসে, মুড়ি খেতে খেতে বসে বসে, সব ভুলে যাই।
মাথায় দিলে নাকি কদুর তেলেও বেশ আরাম। পিঠে সেটা তেমন আর কাজে দেয় কই, তার জন্যে মাখি টাইগার বাম।

ওরকম শপাঁচেক লাথির দাগ, আর্টিস্টির শার্ট দিয়েই কি দারুণ ঢেকে দেয়া যায়। ক্ষত-টত সবই বাজে কথা। ল্যাপি কোলে নিয়ে, লেপের ভেতর, স্বমেহনের উদ্দামতার পর, মুড়ি খেলেই সব চুকে বুকে যায়।

মেরুদন্ডে জোরালো ব্যথা নিয়ে, আমি তবু রোজ দিনে, তাহাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াই।
দেশ এগিয়ে যায়, আমি বসে বসে মুড়ি খাই।

হাওয়াই মিঠাই ৯

সাত সকালে ঘুম ভেঙ্গে অফিসগামী ট্রাফিক, তিনচারটে রেড লাইট, আর আরেকটু হলেই ওয়েস্টগেইট ব্রীজটাকে পাশ কাটিয়ে পড়িমড়ি করে ছুটে ইন্সটিটিউটে যাবার পর যখন জানলাম সবাই মিলে পার্লামেন্ট হাউসে যেতে হবে, শুনেই চিড়বিড়ে অনুভুতি হলো মনে। কাইন্ড অব এক্সারশান। আঙুল গুনে দেখলাম তিনটা কারণে মেজাজ খারাপ করার অধিকার আছে আমার। এক, এখুনি আবার দৌড় লাগাতে হবে, তাই। দুই, যেতে হবে সিটির মাঝখানে। এরা পার্লামেন্ট বানিয়ে রেখেছে একদম সিটির ভেতরে, যেখানে দিনের এই সময়ে পার্কিং খুঁজে পাওয়া আবুল হায়াতের মাথায় চুল খুঁজে পাবারই শামিল। আর তিন, আরে ব্যাটা এদের পার্লামেন্ট আবার দেখার কি আছে? দেখতে হলে আয় আমাগো শেরেবাংলা নগর, দেখায়া দিই লুই কান কি একটা চুম্মা জিনিস বানায়ে রাখছে! ঐ জিনিস একবার দেখলে দুনিয়ার আর কোন পার্লামেন্টে মন লাগে?

ভিক২এক গাদা টুট টুট শব্দে ভরা বাক্য মনের ভেতর গজরাতে গজরাতে শেষমেষ হাজির হলাম ভিক্টোরিয়ান পার্লামেন্ট হাউসের সামনে। প্রথম দর্শনে মনে হলো, চলেবল। টেনেটুনে পাশ মার্ক দেয়া যায় আমাদের সংসদ ভবনের কথা মাথায় রাখলে।
ঢোকার সময়ে, মনে মনে ধন্যবাদ জানালাম সিকিউরিটির বাড়াবাড়ি নেই দেখে। একটা নীরিহ দর্শন মেটাল ডিটেক্টরের মাঝখান দিয়ে চলে যেতে হলো। পকেট থেকে চাবির গোছা, ভাংতি পয়সা সব কিছু আলাদা ট্রেতে দিয়ে কোনরকম ঝুট ঝামেলা বাদেই অন্য পাড়ে চলে গেলাম। কিন্তু আমাদের একজন সঙ্গীকে ঠিকই আটকে যেতে হলো, বেচারা পার হতে যেতেই মেশিন রীতিমতন আর্তচীৎকার করে উঠল। সিকিউরিটি অফিসারদের জিজ্ঞাসু দৃষ্টির সামনে মুখ কাঁচুমাচু করে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হলো তাকে, দেখা গেল, সব কিছু ঠিকই আছে, গোলমাল করেছে বেমক্কা নানা জায়গায় (খাস বাংলায় বললে, চিপায়-চুপায়) মেটাল বোতাম লাগানো হাল-ফ্যাশানের পাতলুন। এবার আর মেশিনে ভরসা করা গেল না, আরেকদফা হস্ত-চালিত তল্লাশীর পরে তার ছাড়পত্র মিললো, আমরাও বুকে ভি (ফর ভেনডেট্টা, থুক্কু, ভিজিটর) ট্যাগ লাগিয়ে চটপট ঢুকে পড়লাম পার্লামেন্ট ভবনে।
ভিক৩
একজন লিঁয়াজো অফিসার ভেতরে ঢুকতেই আমাদের স্বাগত জানালো। মাথা ভর্তি রূপালী চুল, বয়েস পঞ্চাশের এদিক ওদিক, অল্প খানিকটা ঝুঁকে হাঁটে। আর একদম চোস্ত অজি উচ্চারণে ইশকুলের বাংলা ব্যাকরণের সেই পন্ডিত স্যারের ভঙ্গীতে কথা বলে। আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো ভেতরের হাল-চাল।
দুটা রুম আছে এদের সংসদে। একটাকে বোধহয় কেবিনেট বলে, আরেকটার নাম ভুলে গেছি। তবে রং মনে আছে, একটা ঘরের পুরোটা সবুজ, অন্যটার লাল। চেয়ার টেবিল থেকে শুরু করে কার্পেট ইস্তক লাল আর সবুজ রং করা দুই ঘরে। গুগলে খানিকটা ঘাঁটাঘাটি করলে ঠিকঠাক তথ্য মিলিয়ে লেখা যেত সব, কিন্তু ডায়রি বলেই আর এতসব হাবিজাবি করতে ইচ্ছে করছে না।
আমি বাংলাদেশি শুনেই ভদ্রলোক বলে উঠলো, "তুমি বুঝবে আমাদের পার্লামেন্টারি সিস্টেম। তোমাদের আমাদের একইতো, তাই না? "
আমি খুব বিজ্ঞের মত মাথা নাড়লাম, যদিও খুব ভাল করে এসব জানা নেই আমার।

সবুজ ঘরে পেতে রাখা সার বাঁধা চেয়ারগুলোয় বসে পড়লাম আমরা। রূপালী বুড়ো হঠাৎ আমার দিকে আঙুল তুলে বললো, তুমি বসেছ ঠিক ট্রেজারারের চেয়ারটায়। তারপরেই আমার আশ-পাশের চেনা জানা সহপাঠীদের পদবী জেনে নড়ে-চড়ে বসলাম, কেউ শিক্ষামন্ত্রী, কেউ স্বাস্থসেবা মন্ত্রী, কেউ ক্রীড়ামন্ত্রী। আর নিজে এতক্ষণ যে চেয়ারের হাতলে পেছন ঠেকিয়ে আয়েশ করে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার গায়ে একটা আদুরে চাপড় মেরে জানালো, এটা হলো প্রিমিয়ারের চেয়ার!
প্রিমিয়ার, মানে এই স্টেটের হর্তা-কর্তা।
ভিক৪মাঝের টেবিলটার উপরে অনেকগুলো সবুজ বই, লাল ঘরে যেগুলোর রং বদলে লাল হয়ে গিয়েছিলো পরে, ওগুলো হলো ভিক্টোরিয়া স্টেটের ল-বুক। সব রকম আইনের অ-আ-ক-খ তোলা আছে ওইখানে। সংসদ অধিবেশনে যখন বচসায় মাতে সরকারি আর বিরোধী পক্ষ, এই বইগুলোর রেফারেন্স চলে আসে সাথে সাথেই।

টেবিলের সমতল থেকে খানিকটা উপরে স্পীকারের আসন। টেবিলের দুপাশে বসে এখানকার প্রিমিয়ার আর বিরোধী দল।
মজা পেলাম স্পীকারের আসনের পাশে সোনালি রঙের ভীম-সুলভ গদা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এক লোকের ছবি দেখে। বুড়ো জানালো, অনেক আগে নাকি পার্লামেন্টে একটা আজব সিস্টেম চালু হয়েছিলো। স্পীকারের সাথে মতে না মিললে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কয়েকজন জোট বেঁধে খোলা তরবারি হাতে চড়াও হতো স্পীকারের উপর। এরকম বেশ কয়েকজন স্পীকারের মৃত্যুর পর নতুন নিয়ম চালু হলো, তার দেহরক্ষী হিসাবে নিয়োগ দেয়া শুরু হলো সেনাবাহিনীর চৌকষ অফিসারদের।
সেই ঐতিহ্য মেনে এখনো নিয়োগ দেয়া হয়, তবে সেটা ঠিক দেহরক্ষী পদে নয়, বরং ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে। কিন্তু তবু নিয়ম মেনে সেই প্রাণ-রক্ষাকারী গদা হাতে তার একটা লাইফ সাইজ ছবি দাঁড় করিয়ে রাখা হয় স্পীকারের পাশে, বেচারাকে সাহস দিতেই বোধহয়।
অজিদের ঐতিহ্য-প্রীতি দেখে অবাক হতে হয়। ইংল্যান্ডের রাণীকে এখনো রাণী মানে এরা, তাঁর জন্মদিনে লোকে এখানে পাবলিক হলিডে কাটায়। এই নিয়ে নানা প্রশ্নোত্তর চললো, আমরা জিজ্ঞেস করলাম, রাণী আসলে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ করেন এ দেশের শাসনব্যবস্থা? বুড়ো উত্তর দিলো, একেবারেই নিয়ন্ত্রণ করে না। রাণীর ক্ষমতা আছে, মানে এ দেশের লোকেরাই দিয়ে রেখেছে, অস্ট্রেলিয়ার যে কোন আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে সুদুর লন্ডনে বসেই তিনি নাক গলাতে পারবেন, কিন্তু রাণী সেই ক্ষমতা কখনোই ব্যবহার করেন না। করবার কোন সম্ভাবনাও নেই।
ভিক৫
রুমগুলোর সাজসজ্জার জাঁকজমক দেখে মুগ্ধ হলাম। সিলিংয়ে সোনালী রঙের যে কারুকাজ, জানা গেলো, সেটা আসলে সোনাই! সারা বছরে সব মিলিয়ে ৩৫ অথবা ৫৩ দিন অধিবেশন বসে এখানে, আর তার সর্বমোট বাজেট বেশ কয়েক মিলিয়ন ডলার।
পার্লামেন্টের সব সদস্যদের ব্যাকগ্রাউন্ড রাজনীতি ঘেঁষা নয় জেনে খুব মজা পেলাম। এখানে অনেকেই আছে ফুটি খেলোয়াড়। ফুটি হলো একটা অজি খেলা, এটাকে রাগবির আরও-এক-কাঠি-জংলি ভার্শন বলা যায়।
জানা গেলো, অস্ট্রেলিয়ার নিয়ম-কানুন আমেরিকানদের মত নয়। এখানে যে কোন অভিবাসী নাগরিকত্ব পাবার পর পার্লামেন্টের সদস্য পদের জন্যে নির্বাচনে লড়তে পারে। এখানেই বর্ন এন্ড ব্রট আপ হতে হয় না। গায়ের চামড়ার রঙও খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তার একদম নগদ উদাহরণ পেয়ে গেলাম, ভিক্টোরিয়ার বর্তমান গভর্ণর হচ্ছে একজন শ্রী লঙ্কান অভিবাসী।

কথা বলতে বলতেই একজনকে দেখলাম সবুজ ঘরে ঢুকছে। কোট টাই পড়া, সাথে একজন মোটামতন মহিলা আর কমবয়েসী একটা ছেলে, সম্ভবত মহিলার পুত্র। রূপালী বুড়ো প্রিমিয়ারের চেয়ারের হাতলে হেলান দিয়েই তাদের উদ্দেশ্যে হাই জানালো। তারপরেই আমাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো, "ও হচ্ছে ফার্ন ট্রী গালী আসনের সংসদ সদস্য। খুবই পরিশ্রমী একজন মানুষ। "
আমরা বসে থেকেই তাকে হাই বললাম। সাথের মহিলা সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের জানালো, ওঁরা ওই এলাকারই বাসিন্দা, ট্রাফিক লাইট নিয়ে একটা সমস্যার কারণে সরাসরি দেখা করতে চলে এসেছে এমপি-র সাথে। কাজ শেষ, এমপি তাই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সংসদ দেখাচ্ছে তাদের।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস সবার অগোচরে পার্লামেন্ট ভবনের বাতাসে ছড়িয়ে দিলাম।
বাংলাদেশে যেখানে আমার বাড়ি, ওই এলাকার প্রয়াত সংসদ সদস্যকে এলাকাবাসী একটা মজার নাম দিয়েছিলো, একবার হোসেন। ভদ্রলোকের নাম ছিলো আকবর হোসেন, কিন্তু নির্বাচনের ঠিক আগের সময়টুকু বাদে তাঁকে আর কখনোই এলাকায় দেখা যেত না, পাঁচ বছরে ওই একবারই তিনি আসতেন আমাদের এলাকায়। তাই নাম পালটে লোকে তাকে ডাকতো একবার হোসেন।
ভিক৬
পার্লামেন্টের মেম্বার হবার সুবিধা কি? এক‌টা ম‌জার ক‌থা জান‌লাম। অস্ট্রেলিয়ার আইনে এম‌নিতে নিয়‌ম আছে, কেউ কারো বিরুদ্ধে জ‌ন‌স‌ম্মুখে কুৎসা র‌টালে যে কেউ যে কারো বিরুদ্ধে স্যু ক‌রে দিতে পারে।
কিন্তু পার্লামেন্টারি প্রিভিলেজ ব‌লে এক‌টা টার্ম আছে এখানে, যার সার ক‌থা হ‌লো, পার্লামেন্টের ভেত‌রে যে যেম‌ন ইচ্ছা অভিযোগ তুল‌তে পার‌বে, এই ক‌থার ভিত্তিতে কারো বিরুদ্ধে কোন আইনি অভিযোগ ক‌রা যাবে না, অর্থ্যাৎ স্যু-এর প‌থ ব‌ন্ধ‌।
আম‌রা বেশ ম‌জা পেলাম এ ক‌থা শুনে। কিন্তু তার‌প‌রেই বুড়ো একটা তথ্য জানালো।
প্রায় বছর বিশেক আগে একজন এমপি তার এই পার্লামেন্টারি প্রিভিলেজের নিদারুণ অসদ্ব্যবহার করেছিলো। সেই এমপির স্ত্রী ছিলো বেশ বিখ্যাত একজন ব্যারিষ্টার, তাদের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই বনিবনা হচ্ছিলো না। ডিভোর্সের কথা-বার্তা চলছিলো তখন। এর মধ্যেই একদিন সেই এমপি পার্লামেন্টে বসে তার স্ত্রী সম্পর্কে উক্তি করে বসে, ভদ্রমহিলা নাকি পেশাগতভাবে অসৎ, দাগী আসামীদের সাথে ওঠাবসা আছে তার- এরকম অভিযোগও করে বসে।
যেহেতু পার্লামেন্টে বসে বলা, ভদ্রমহিলা তাই কোন রকম আইনী আশ্রয় নিতে পারে নি। রাগে দুঃখে এবং অপমানে দুদিন বাদেই মহিলা আত্মহত্যা করে বসে! তার বেশ কিছুদিন বাদেই জানা যায় মহিলা নিষ্কলুষ ছিলো। এমপি-কে তখন পদত্যাগ করতে হয়, এবং পার্লামেন্টারি প্রিভিলেজের উল্টা-পাল্টা ব্যবহারের কারনে তাকে সোজা জেলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়।
সেই এমপি নাকি এখনো বেঁচে আছে, এবং জেলেই জীবন কাটাচ্ছে।
রূপালী বুড়ো গম্ভীর স্বরে আমাদের বললো, "গুরু দায়িত্ব নিতে হলে সেটার ব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হয়, নইলে অঘটন ঘটার সম্ভাবনা প্রবল।" আমার এ কথা শুনে মনে হলো, হুম, এ কথা সবাইই বোঝে, শুধু যাদের হাতে দায়িত্ব পড়ে তারা ছাড়া।

সবুজ ঘর ছেড়ে লাল ঘরে চলে এলাম আমরা খানিক পরেই।
এখানে জাঁকজমক আরো বেশি। আমাদের মতন আরো কিছু ভিজিটরদের দেখলাম টুকটুক করে ছবি তুলছে। আর এতক্ষণে ছবি তোলার কথা মাথায় এলো আমার। সাথে ক্যামেরা নেই, তাই অবশেষে ফোনটাই বের করতে হলো। নোকিয়া ই৬৫-র ক্যামেরা কোয়ালিটি খুব একটা খারাপ হবার কথা না।
লাল ঘরে আরো কিছুক্ষণ চললো আলাপচারিতা। সঙ্গী সাথী অনেকেই আড়মোড়া ভেঙ্গে ছবি তুলতে শুরু করলো এবার।
এর মাঝেই দেখা পেলাম আরেকজন এমপির। এই ভদ্রমহিলা নাকি প্রায় ১৩ বছর ধরে সংসদ সদস্য। এতদিন সরকারী দলেই ছিলো, সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিরোধী দলে গেছে। ভীষণ হাসি-খুশী, ছুটতে ছুটতে কোথাও যাচ্ছিল, মাঝে একবার রূপালী বূড়োকে চুমু খেতে থামলো শুধু। আমাদের সাথেও হাই-হ্যালো করলো কিছুক্ষণ। অনেক বয়েস, কিন্তু কথা বলার সময় মনে হচ্ছিলো সদ্য ইশকুল পাশ ছটফটে কোন কিশোরী যেন!
ভদ্রমহিলা চলে যেতেই রূপালী বুড়ো বললো, তোমাদের এবার এঁর গল্প শোনাই। প্রায় তের বছর ধরে সংসদ সদস্য, নিজের স্বামী সংসারও সামলায় সে, আবার এর মাঝেও প্রায় পঁচিশ বছর ধরে একটা রুটিন আছে তাঁর। প্রতি বুধবার ভোর তিনটেয় উঠে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার ড্রাইভ করে একটা আদিবাসী ক্যাম্পে যায় এই মহিলা। ওখানে গিয়ে ছয়শ লোকের খাবার রান্নার তদারকি করে। রান্না ও পরিবেশন শেষে বাসন কোসন পরিষ্কারের ঝুট ঝামেলা শেষ করে তবে বাড়ি ফিরে সে।
এই পঁচিশ বছরে বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া এর ব্যতিক্রম ঘটেনি।

আমি নিঃশ্বাস আটকে বসে শুনলাম কেবল। এতক্ষণে বুড়োর প্রথম প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর মাথায় এলো আমার।
হু, আমাদের দুই দেশের পার্লামেন্টারি সিস্টেম একই, শুধু কেবল, তার মানুষগুলোই বৈপরীত্যে ভরা।

মঙ্গলবার, জুলাই ০৮, ২০০৮

হাওয়াই মিঠাই ৮

আমার এক বন্ধু দেশ থেকে ঘুরে এলো সম্প্রতি। যাবার সময় "কিছু আনতে হবে কি না"- এই প্রশ্নের উত্তরে প্রায় নির্দ্বিধায় সাম্প্রতিক সময়ের মুভিগুলোর ডিভিডি নিয়ে আসতে বললাম। এমনিতে এখানকার মুভি ক্লাবে ডিস্কপ্রতি ভাড়াও খুব বেশি না, সস্তাই বলা চলে। তবু ইষ্টার্ণ প্লাজার সাথে তার কোন রকম তুলনাই চলে না। এছাড়া একদম নতুন মুভিগুলোও পেয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। ইতিমধ্যেই আমি দ্রোহী ভাইয়ের দেয়া লিংকে গিয়ে নতুন মুভি দেখতে দেখতে মাসের প্রথম সাতদিনেই আমার পুরো মাসের ডাউনলোড কোটা খতম করে বেজায় বিপাকে পড়েছি। এজন্যেই শাস্ত্রে আছে, দুষ্টু লোকের মিষ্টি কথায় কান দিতে নেই। দ্রোহী ভাই এর পরে যতই লোভনীয় লিংক হাজির করুন, আমি আর ঐ পথে পা বাড়াচ্ছি না।

তো, বন্ধু এখানে ফিরবার সাথে সাথে আমিও আচমকাই প্রায় শ"খানেক দেখা না দেখা সিনেমার মালিক বনে গেলাম। এই অযাচিত আনন্দে গত কদিন অনেকগুলা সিনেমাও দেখা হয়ে গেল টপাটপ।

প্রথমদিন মুভিগুলোর এলবাম হাতে নিয়ে দেখছিলাম কি কি আনা হলো, দেখতে দেখতে এই সিডি যারা তৈরি করেন, তাদের বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারা গেল না। হরেক রকমের কালেকশান একেকটা ডিভিডিতে। একসাথে তিন/চার বা পাঁচটি মুভি হয়তো, কোনটায় থ্রিলার মুভিগুলো একসাথে দেয়া, কোনটায় হরর। আবার অভিনেতা অনুসারেও কালেকশান বানানো, টম হ্যাংক্স, কিয়ানু রিভস, এন্জেলিনা জোলি, টম ক্রুজ- এরকম নানান রকম। হঠাৎ একটা কালেকশান দেখে তুমুল মজা পেলাম। পামেলা এন্ডারসন!

আহা, একটা সময় এই মহিলা আমাদের বয়েসী কিশোরদের নিদ্রা বা জাগরণে দরজা নক না করেই ঢুকে পড়তেন। তাতে যে আমরা খুব একটা নাখোশ হতাম, এমন কথা বুকে হাত দিয়ে কেউ বলতে পারবে না। বন্ধুরা যারাই নতুন কম্প্যু কিনতো, কোন একটা ড্রাইভের ভিতরে একের ভিতরে আরেক, তার ভেতরে আরেক, এরকম গভীর গোপন কোন জায়গায় লুকোনো ফোল্ডারে গিয়ে এই স্বর্ণকেশী কানাডিয়ান ভদ্রমহিলার ছবিই সবচেয়ে বেশি জমানো হতো। কোথায় যেন পড়েওছিলাম, গুগলে পামেলার খোঁজেই নাকি সবচেয়ে বেশি সার্চানো হয়েছে। লুকিয়ে বেওয়াচ দেখার স্মৃতি এখনো মুছেনি মন থেকে, তার মধ্যে পামেলার সিনেমার কালেকশান হাতে পেয়ে মন্দের ভাল হলো এই যে, নিজের বয়স হুট করে দশ বছর কমে গেলো! ইশ, আশপাশে বন্ধুগুলো নেই, এটাই যা দুঃখ।
*

অন্জন দত্তের বানানো একটা মুভি দেখলাম মাত্রই। দি বং কানেকশান।
অন্জনের গান নিয়ে মুগ্ধতার কোন সীমা-পরিসীমা নাই। আমাদের সাংসারিক এমপিথ্রিপ্লেয়ারে নিয়ম করে কদিন পর পর গান আপডেট করা হয়। প্রায় প্রতিবারই সব গান মুছে ফেলা হয় নতুন গান ভরবো বলে, তারপর অবশ্যম্ভাবী ভাবে অন্জনের ফোল্ডার পুরোটা আবার কপি করা হয়। প্রতিবার একই কাহিনি।

কিন্তু অন্জনের সিনেমা ঠিক একইরকম ভাললাগা মনে আনে কি না তাই ভাবছি। এর আগে, অন্জনের একটা সিনেমার কথাই মনে করতে পারছি, বোধহয় আট বা দশ বছর আগে, বাংলা নয়, হিন্দী মুভি ছিলো সেটা- বড়া দিন। সিনেমার কাহিনি মনে নেই ঠিকঠাক, তবে গানগুলো খুব সুন্দর ছিল।

তারপরে, ভারতীয় কোন একটা বাংলা চ্যানেলে দেখেছিলাম অন্জনের বানানো একটা ড্রামা সিরিয়াল বা এরকম কিছু। নাম মনে নেই, রাজা অপেরা সম্ভবত। তবে সেটাও একেবারেই মনে দাগ-টাগ কাটেনি।

দি বং কানেকশান দেখতে বসার সময় অবশ্য আগের এসব কথা তেমন মনে ছিল না। বেশ আয়েশ করেই দেখে গেছি পুরোটা।

সিনেমার গল্প খুব সাদামাটা। মূলত প্রবাসী বাঙ্গালী এবং শেকড়ের সাথে তাদের টানা-পোড়েন নিয়ে গল্প। শুরুতে দেখায় একজন চাকরী নিয়ে ইউএস যাচ্ছে, অন্যদিকে ইউএস-এ বড় হওয়া আরেকজন বাঙ্গালী কোলকাতায় ফিরে আসে নাড়ীর টানে। এই দুই পরবাসে দুই বাঙ্গালীর কান্ডকীর্তি, নানা ঘটনাপ্রবাহে তাদের অভিজ্ঞতা এবং আশপাশের মানুষদের নিয়ে তৈরি দি বং কানেকশান।

গল্পে আসলে কোন অভিনবত্ব নেই। এরকম গল্পগুলোকে আমি গুগল-গল্প বলি। মানে, কোন একটা শব্দ নিয়ে গুগলে খোঁজ লাগালে একদম প্রথম দিকে যে লিংকগুলো আসে, ওগুলোই সবচেয়ে কমন লিংক। বং কানেকশানের গল্পটাও তেমনি। পরবাসী মন নিয়ে ভাবতে বা লিখতে গেলে একদম কমন-গল্প হিসেবে যে ঘটনাগুলো মনে আসবে, বং কানেকশান তার বাইরে হাঁটেনি একদম।

তবু, পুরো ছবিটা দেখে যেতে কোথাও খারাপ লাগেনি। নতুন কোন গভীর ভাবনার উদ্রেক ঘটায়নি মনে, তেমন বিষম কোন চিন্তা-টিন্তায় ফেলে দেয়নি, একদম সরলরৈখিক ভাল লাগা।

নীল দত্তের মিউজিক, এক কথায় দারুণ লেগেছে। থিম মিউজিক ছাড়াও, সুজন মাঝিরে গানটা তুমুল। অন্জন বেশ অনেকটা বদলে নতুন করে গেয়েছেন তার "তুমি না থাকলে" গানটা। এটাও চমৎকার।

আর যে গানটার কথা লিখবো না ভেবেছিলাম, তবু লিখছি- রবি দাদুর পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে গানটা সম্পূর্ণ ঝিনচ্যাক কম্পোজিশানে গাওয়া হয়েছে এই সিনেমায়। পরীক্ষা নিরীক্ষা আমার কাছে বরাবরই বেশ লাগে, শুনে ভাল লাগলে ভাল বলবো, নইলে বলবো "দুরে গিয়ে মর", ব্যস, এইতো।

ঘটনা হচ্ছে, পাগলা হাওয়ার মুল গানটাকে রীতিমতন ওলট পালট করে দেয়া এই নতুন ভার্সানটা শুনতে, খারাপ দুরে থাক, বরং বেশ ভাল লেগেছে। এতই যে, মাঝে মাঝেই ইউটিউবে গিয়ে গানটা শুনে, বেশ খানিকটা অপরাধী-অপরাধী মন নিয়েও মজা নিচ্ছি।
*
ইউটিউবের লিংকগুলো দিয়ে দিচ্ছি নীচে। ভাল লাগলে পরে সিনেমাটাও দেখে নিতে পারেন। হাতের কাছে না পেলে ইউটিউবেই পেয়ে যাবেন।

১। পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে
২। থিম মিউজিক
৩। সুজন মাঝিরে
৪। তুমি না থাকলে

মন, হাওয়ায় পেয়েছি তোর নাম-

বড় হয়ে যাওয়াটা সবসময়ে ভাল কিছু নয়। বড় হতে হতে যেটা হয়, শৈশব আর কৈশোরের জমানো সব ঐশ্বর্যগুলো টপাটপ হারিয়ে যেতে থাকে। আমার প্রায়শই এই বলে ভ্রম হয় যে, রাজা সলোমনের চেয়ে আমি কোন দিক দিয়ে কম ঐশ্বর্যবান ছিলাম না। কখনও গোনাগুনতির সুযোগ পাইনি, মাথায়ও আসেনি যে হিসেব রাখতে হবে বা এরকম, কিন্তু যদি গুনে রাখতাম, কোন একটা পাতার শুরু থেকে শুরু করে, আমার অজস্র জমানো বা কুড়িয়ে পাওয়া ধন-সম্পদগুলোর প্রতিটির নামধাম লিষ্টি করলে, হয়তো, প্রায় মাইলখানেক লম্বা কোন তালিকা হয়ে যেত।
খেলতে খেলতে কালো রঙ্গের একটা কাঠি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম একবার। ড্রাম পেটানোর জন্যে যেগুলো ব্যবহৃত হয় অনেকটা সেরকমই। কেমন করে যে এলো ওটা আমাদের বাড়িতে, তা ভেবে দেখার সময় হয়নি, কিন্তু ঐ লাঠি হাতে নিয়েই আমি হয়ে গেলাম জাদুকর জুয়েল আইচ। ওটা হয়ে গেল আমার জাদুর লাঠি। সারাদিনমান সেটাকে হাফপ্যান্টের কোমরে গুঁজে আমি ঘুরে বেড়াতাম, আর সুযোগ পেলেই সকলের চোখের আড়ালে মনের সুখে জাদু করে বেড়াতাম। আম্মার আলমারিটাকে ছুঁয়ে দিলেই সেটা হয়ে যায় যেন হীরে-মণিভরা সিন্দুক। অথবা আমাদের টিভিটাকে ছুঁয়ে দিলে তার ভেতরে দিয়ে দেখা যেত তেপান্তরের ঐ পারের কোন রাজকন্যার ঘুমিয়ে থাকা মুখ। সেই মুখ দেখে আমি আকুল, এদিকে আম্মা হয়তো খেতে ডাকছে, কিন্তু আমি তখন সেই জাদুর লাঠিকেই জীয়ন-মরণের কাঠি বানিয়ে সেই রাজকন্যার ঘুম ভাঙাতে ব্যস্ত।

আব্বা একবার কিনে দিল একটা দুরবীন। তারপরে আমাকে আর পায় কে? আমি তখন যুদ্ধরত কোন তুখোড় সেনাপতি। অথবা কখনও মতিউর কখনও ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর। আমাদের ঘরের পাশ থেকে উঁকি দিয়ে, কখনওবা বাড়ির দেয়ালের উপরে চেপে দুরবীন চোখে দেখে চলেছি দুরবর্তী পাকসেনাদের গতিবিধি। তারপর সেই দুরবীনই কানে লাগিয়ে শুনে চলেছি তাদের গোপন যুদ্ধপরিকল্পনা! এই যুদ্ধ-খেলার অন্যতম সঙ্গী হয়ে গেলো, কদিন পরেই, উপহার পাওয়া পিস্তল। সে সময় উঠানের পেঁপেঁ গাছটার আড়াল থেকে পাকসেনাদের উদ্দেশ্যে গুলি আর গ্রেনেডের বৃষ্টি ছুঁড়ে দিতাম।

কোন কোন রাতে, বাড়ির সামনের বিশাল দিঘীর এপাড়ে বসে ওপাশের পানিতে আলোছায়ার নাচন দেখতে থাকতাম আমি। সিমেন্টে বাঁধানো ঘাটে পিঠ দিয়ে আকাশে খুঁজে বেড়াতাম হান্টারের কুকুরটাকে। ততদিনে সাই-ফাই হজম হয়ে গেছে, ছুটে চলা দুয়েকটা তারাকে ভিনগ্রহীদের পাঠানো সিগন্যাল ভেবে নিয়ে কতদিন বিছানায় পাশ ফিরে শুয়েছি। পেঁপেঁ গাছের তিতকুটে পাতাগুলোকে চার-চারটে দিন পানিতে ভিজিয়ে রেখে দিয়েছি, পঞ্চম দিন সেটা থেকে টুথপেস্ট বানাবার আশায়। শার্লক হোমস পড়ে ছবি এঁকে এঁকে নিজেই একটা বর্ণমালা দাঁড় করিয়ে ফেললাম একদিন। তারপর সেটার মূল কপিটাকে পলিথিনে জড়িয়ে আমাদের পেয়ারা গাছটার সব থেকে উঁচু ডালে বেঁধে রেখে দিয়েছিলাম। লম্বা দিন নিজের বানানো ঐ বর্ণমালা দিয়ে খাতায় পাতায় হিজিবিজি লিখে গেছি অনেক।
"ডানপিটে" নাম দিয়ে নিজেই হাতে লেখা একটা পত্রিকা বের করেছিলাম ফোর এ পড়বার সময়। সেটার আমিই আঁকিয়ে, আমিই লেখিয়ে। কবিতা লিখতাম, কার্টুন বা ফিনলে চায়ের বিজ্ঞাপন, সবই ছিলো দারুণ উত্তেজনার।
লুকোনো রত্নভান্ডারের তাকে তাকে, এরকম হাজারো ঐশ্বর্য জমিয়ে চললাম আমি। বড় হতে হতে টের পাই, নতুন ঐশ্বর্যের ভিড়ে সেগুলোকে আর খুঁজে পাই না আর, হারিয়েই ফেললাম কি? ধুর!

ক্রমশ হারানোর তালিকাও বাড়তে থাকে। সেই পেঁপেঁ গাছ, জাদুর কাঠি, হরেক রকমের রঙ পেন্সিল, আমার ছোট্ট কবিতার ডায়রিটা- ছেলেবেলার সবগুলো রঙধনু স্মৃতির সাথে সাথে কোথায় যে হারিয়ে গেল সব।

আজ বড়বেলায় এসে হিসেবের খাতা খুলে অঙ্ক কষি। কুড়িয়ে পাওয়ার ঘরে দেখি ঝিলমিল করতে থাকে অনেকগুলো নাম, আর যেখানে তাদের দেখা পেয়েছি, সেই সচলায়তন।

আর বেশি বড় হতে চাই না আর, হারাতেও চাই না কিছু। রাজা সলোমনকে দান করে দিতে পারি আমার বাদবাকি সব ঐশ্বর্য, তবু শুধু এইটুকুই আমার হাতে থাকুক, সবসময়।