সোমবার, ডিসেম্বর ২২, ২০০৮

দু' বছর

রোজ সকালে আড়মোড়া ভেঙে ওই একটা সবুজ তোয়ালেতেই মুখ মুছি প্রতিদিন।
রোজ একই জুতা জামা গায়ে, সেই একই রাস্তা ধরে-
একই গন্তব্যে পৌঁছে যাই বারবার।

দুয়েকটা রঙীন ফানুস এসে মাঝে মাঝে,
খানিকটা রঙধনু ধার দিয়ে যায় হয়তো-
আমাদের দুজনের চোখের জল আজ,
মিলেমিশে মুখ লুকিয়ে হাসে।

এরকম অভ্যস্ততায় কতগুলো দিন কেটে গেলো!
একটাই জানলা দিয়ে রোজ, দুয়েকটা চড়ুই এসে পড়ে-
কী আশ্চর্য, আমরা দুজন একটি ঘরে থাকি!
অথবা আমাদের একমাত্র সুখের আজ ঠিক দুবছর।

প্রতিনিয়তই আমাদের নিঃশ্বাসের সুর মিলে যায়-
তবু দেখ, সেই তোর জন্যেই কোন গান
আজও লেখা হয়ে উঠলো না আমার।

====
Tomar Jonyo.mp3

---------

গানঃ অন্জন দত্ত, তোমার জ‌ন্যে, এল‌বাম- হ্যালো বাংলাদেশ।

রবিবার, ডিসেম্বর ১৪, ২০০৮

একটা রূপকথা

দেখি, আজ একটা গল্প বলি বরং।
এক বাড়ির বড় ছেলে নতুন বিয়ে করে খুব লক্ষীমন্ত একটা মেয়েকে ঘরে নিয়ে আসলো। দুইজনে খুব ভাব-ভালবাসা, খুব মিল-ঝিল। নিজেদের মত করে সুখেদুখে দিন কাটায়।
বাড়ির বাকি লোকজনের আবার এটা পছন্দ হলো না। রূপকথার কূটনী বুড়িদের মত তাদের চোখ টাটাতে লাগলো এত সুখ দেখে। তারা নানান মিটিং-টিটিং করে একসাথে নানান রকম ফন্দি-ফিকির করতে লাগলো। বৌ-টার লক্ষীপনাকে বললো ন্যাকামী, লাগাল সেটা ছেলেটার কানে। কিন্তু ছেলে সেসবে কানই দিলো না, বউটাকে যে সে খুব ভালমতন চেনে। বাড়ীর সবার সব কূট-বুদ্ধি বিফলে গেলো।
এদিকে কদিন পরে, মেয়েটার শরীর খারাপ হলো। কী ব্যাপার কী ব্যাপার? ছেলে ডাক্তার-বদ্যি ডেকে আনলো। ও মা, জানা গেলো, সে তো ভারী সুখের খবর। মেয়ে যে মা হবে!
ছেলে আর বৌয়ের মনে কী খুশি! আনন্দে তারা ডুবে ডুবে যায়। কিন্তু বাড়ির লোকের আবারো চোখ টাটায়। তারা ঠিক করলো এতদিন যেমন তেমন, এইবারে আর ছাড়াছাড়ি নেই। ওদের যেহেতু কিছু করতে পারেনি, ওদের সন্তানেরই অনিষ্ট করবে তারা।
তো, দিন যায়, মাস যায়। নয় মাস বাদে মায়ের প্রসব ব্যাথা ওঠে, আতুঁড় ঘরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে, অনেক যন্ত্রণা আর কষ্টের পরে মা-টা একটা ফুটফুটে চাঁদের মত মেয়ের জন্ম দিলো। সেই ফুটফুটে মুখ দেখে পাখীদেরও মন ভরে যায়, ফুলেদেরও হাসি খেলে যায়।
কিন্তু বাড়ীর লোকেদের তা সইবে কেন, তারা করলো কী, সেই ছোট্ট পরীর মতন বাবুটার একটা হাত ভেঙে দিলো। বাবুটা আকাশ কাঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। সেই কান্নায় মেঘেদেরও চোখ ভিজে যায়। কিন্তু সেই পিশাচদের মন ভেজে না। তারা এবার বাবুটার আরেকটা পা ভেঙে দেয় মট করে। আর কষ্টে যন্ত্রণায় বাবুটা চিৎকার করে ওঠে, সারা পৃথিবী নিস্তব্ধ হয়ে যায় সেই দুখে।
এমনি করে জন্মের সময়ই সেই পিশাচেরা ছোট্ট বাবুটাকে পঙ্গু করে দেয়, যেন বেঁচে গেলেও সে পিঠ সোজা করে দাঁড়াতে না পারে সহজে।

আচ্ছা, আপনাদের কী মনে হয়? অনেকবছর পরে যখন ঐ পঙ্গু মেয়েটার সন্তানেরা সেইসব পিশাচদের পরিচয় জানবে, তখন তারা কী করবে?

*

আপনারা হয়তো জানেন না, নাকি জানেন?
আজ থেকে অনেকবছর আগে, এই দিনে, এই ১৪ ডিসেম্বরে, আমাদের মা, এই মাতৃভূমি, এই বাংলাদেশের জন্মের ঠিক আগমুহুর্তে, আমাদের মাকেও পঙ্গু করে ফেলার ষড়যন্ত্র হয়েছিলো। যে সন্তানদের উপর ভরসা করে জন্মের পরে এই দেশটা মাথা তুলে দাঁড়াবার চেষ্টা করতে পারতো, সেই সন্তানদের, সেই শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিকদের তালিকা বানিয়ে বানিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো।

এই পঙ্গু মায়েরই সন্তান আমি। সেই পিশাচদের পরিচয়ও জানি। কিন্তু আমার আসলে কিছুই করার নেই। কেবল প্রতি বছর এই দিনটিতে ভীষণ মন খারাপ করে বসে থাকা ছাড়া।

সোমবার, ডিসেম্বর ০৮, ২০০৮

কামরুল-বন্দনা

(হেডনোট, অথবা শিরঃটীকা- এই লেখার মূল উদ্দেশ্য দুইটি।
এক- বন্ধুদের ঢোল বাজাতে আমার ব্যাপক ভাল লাগে। সুযোগ পেলেই বাজাই।
দুই- খেয়াল করে দেখলাম, এই ব্লগের হার্টথ্রব কামরুল একাই আমাদের বন্ধুদের নিয়ে লিখছে। আমি ভাবলাম, আজ নাহয় আমিই কামরুলকে নিয়ে কিছু লিখি। )

আমরা সবাইই কুমিল্লার ছেলেপেলে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, পড়েছি সবাই জিলা স্কুলে। তারপরেও কামরুলের সাথে আমাদের পরিচয় হতে খানিকটা দেরি হয়ে গিয়েছিলো। কারণ সম্ভবত এই যে, সেভেনের পর থেকে আমাদের কলেজ আলাদা হয়ে গিয়েছিলো।
সম্ভবত নাইন বা টেনের কোন একটা সময়ে কোন এক টিউটরের বাসায় দরজায় দাঁড়িয়ে আমি চেঁচামেচি করছি, এইসময় ছোটখাটো সাইজের একটা ছেলে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, কী রে, কেমন আছিস?
আমি চিনলাম না।
ঐ সময়টায় এরকম আমার প্রায়ই হতো যে রাস্তায় কারও সাথে দেখা হলো, আমার কুশল জিজ্ঞেস করছে, কেমনাছি, কীকর্ছি, নানান হাবিজাবি। প্রথম দিকে দুয়েকবার লোকজনের মনে দুঃখ দিয়ে ফেলতাম। পরে শুধরে নিয়েছি, কোনভাবেই আর টের পেতে দিতাম না যে আমি আসলে মানুষটাকে চিনতে পারছি না।
এবারও তাই করলাম। চিনতে না পেরে, দুপলক শুধু, তারপরেই একদম স্বাভাবিক স্বরে বললাম, এই তো ভাল আছি, তোর কী খবর?
কামরুল আমার দুই নম্বুরী মূহুর্তেই ধরে ফেললো, বললো, আমারে চিনস?
আমি পুরাই বেকুব। মাথা টাথা চুলকে স্বীকার করলাম যে আসলে চিনি নাই।
সেই থেকে শুরু।

আমাদের হু আ
———————–
হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে এখন অবশ্য অল্প কিছু মুশকিল আছে। ভদ্রলোকের জনপ্রিয়তা কদিন সাইন কার্ভ হয়ে ওঠা নামা করে এখন মোটামুটি নেগেটিভে চলে গেছে।
কিন্তু আমরা যে সময়টায় বইয়ে মুখ গুঁজে বড় হয়েছি, আমাদের সময়ের অনেকটা জুড়ে ছিলেন হুমায়ুন আহমেদ। আমাদের খুব প্রিয় মানুষ ছিলেন তিনি।
তো, আসলে, কামরুল ছিলো আমাদের হুমায়ুন আহমেদ।
হুমায়ুন মানেই যেমন ছিলো, দারুণ রসিক কেউ, বা অনাবিল বিনোদন। কামরুলও তাই।
সিলেট ক্যাডেট কলেজের অসম্ভব মজার গল্পগুলো আমার ধারণা সিলেটের পোলাপানের চেয়ে আমরা ভালো জানি। ছুটিতে বাসায় এলেই কুমিল্লা টাউন হলের শহীদ মিনার বা লাইব্রেরীর সিঁড়িতে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা চলতো। আমি মোটেও গল্পবাজ কেউ নই। যে কোন আড্ডায়ই আমার মূল ভূমিকা মনোযোগী শ্রোতা। কিন্তু সেই আড্ডাগুলোয় দেখা যেত একা আমিই কেবল নই, বাদ বাকি সবাইও আমার মতই শ্রোতায় পরিণত হয়ে গেছে। আর আমাদের মধ্যে এক এবং অদ্বিতীয় বক্তা হলো কামরুল।

একটু দেরিতে পরিচয়ের কারণেই হয়তো কামরুল দ্রুতই শুরুর ঘাটতিটুকু ধুমধাম পুষিয়ে দিতে শুরু করলো। আমাদের কুমিল্লা পার্টির সকল আড্ডার মধ্যমণি হয়ে গেলো কামরুল।
ওর গল্পের ঢং পুরাই জাদুকরী। যে কোন কথাই এমন সুন্দর করে ব্যাটা বলে যে, মুগ্ধ হয়ে শুনতে হয় বসে বসে। জিহাদ, রায়হান বা আর সব পিচ্চিগুলার মনে আছে কিনা জানি না, সিসিবি-র একদম শুরুর দিকে আমরা হাতে গোণা কজন যখন এখানে লিখতাম, তখনও আমি ওদের বলেছি, কোন মতে যদি পারো, কামরুলকে ধরে নিয়ে আসো। দেখবা গল্প কারে বলে।
আর বলে দিতে হয় না, আমার ধারণা এখানের সবাইই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, আমার কথা হাড়ে হাড়ে ফলেছে।

আবার নচিকেতাও
—————–
সিসিবি-র আড্ডায় ব্যাটা গান গেয়েছে কি না জানি না। কামরুল কিন্তু মারাত্মক গান গায়। হুমায়ুনের সাথে সাথে ও আমাদের নচিকেতাও। পৌলমী বা শতাব্দী গান দুটো কামরুলের কাছেই প্রথম শোনা, ওর গলাতেই। আবার নীলাঞ্জনাকে যখন খোলা বারান্দায় ঝুলে থাকতে দেখা যায়, কামরুলের গলায় সেটা শুনতেও অদ্ভুত ভাল লাগে।
অল্প বিস্তর কৃতজ্ঞতাও রয়ে গেছে ওর প্রতি।
শিমুল মুস্তাফার একটা অসাধারণ আবৃত্তি আছে, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। দেশে এবং প্রবাসে এমন অনেক দিন গেছে, যে বহু বহুবার রিপিট করে এই আবৃত্তি শুনেছি।
দুর্দান্ত এই আবৃত্তিটাও প্রথম শোনা হয় কামরুলের কল্যাণে।

পুকুর পাড়ের কামরুল
——————–
কামরুলের এই নামকরণের পেছনে একটা কারণ আছে।
ঢাবি-র প্রথম বর্ষে আমি তখন একুশে হলে থাকি। কামরুল শহীদুল্লায়। তো কার্জনে ক্লাশ শেষে অথবা ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে আমরা ফিজিক্সের কিছু পোলাপান প্রায় সারাক্ষণই শহীদুল্লাহ-র পুকুর পাড়ে বসে থাকি। আর ওখানে গেলেই আমার কমন রুটিন ছিলো কোন এক ফাঁকে চট করে উঠে কামরুলের রুমে গিয়ে ওর সাথে দেখা করে আসা।
ব্যাপারটা এতই নিয়মিত ছিলো যে, প্রায় অনেকদিনের বাদে কামরুলকে যখন আমার ফিজিক্সের বন্ধুদের সাথে প্রথম পরিচয় করিয়ে দিলাম, আমার তৎকালীন ছায়াসঙ্গিনী (পরবর্তীতে প্রেমিকা ও অতঃপর বউ) বলে উঠলো, আচ্ছা! এই তাহলে পুকুর পাড়ের কামরুল!!!

এখন নাকি ফারুকী
——————
কামরুল এখন নাটক বানায়। দুর্ভাগ্য এই যে কেবলই শুনেছি, দেখার কপাল হয়নি। লোকমুখে শুনি নাটকগুলো নাকি বেশ ভাল হয়। অনেকবার ব্যাটারে বলেছি দুয়েকটা ইউটিউবে দয়া আপলোড কর, একটু দেখি। না, শালা দেখায় না।
তো বানাক নাটক, ফারুকী হোক, দিনে দিনে জহির রায়হান হোক। সিনেমা বানাক দারুন দারুণ।
ওহ, সিনেমার কথা বলতেই মনে পড়ে গেলো।
কলেজের ছুটিগুলোয় কোন কোন দুপুরে আমরা সবাই কামরুলের বাসায় জড়ো হতাম। অনেকগুলা কারণ ছিলো তার, সবচেয়ে আসল কারণ, আমাদের সবার মধ্যে ওর ভিসিআরটাই সবচেয়ে নতুন ছিলো। আর, দৈবক্রমে দুপুরগুলোয় ওদের টিভিটাই খালি পাবার সম্ভাবনা ছিলো বেশি। বাকি আর কিছু বলতে হবে?

…..তারপর
———–
কামরুল এরকমই আমাদের কাছে। গল্পবাজ, সারাক্ষণ হাসি আনন্দে ভরে থাকা, এবং চারপাশের সবাইকে ভরিয়ে রাখা একটা মানুষ।
আমি জানি, জীবনের একটা অংশ বা স্মৃতির একটা টুকরো শুধু আমরা কুমিল্লার বন্ধুরা ওর সাথে শেয়ার করেছি। এর মধ্যেই কামরুল আমাদের হুআ, নচিকেতা, ফারুকী বা পুকুর পাড়ের কামরুল।
সত্যি কথা বলতে কী, এই লেখাটা লেখার জন্যে আমি আসলে যোগ্য ব্যাক্তি নই। সিলেটের বন্ধুরা কামরুলের আরও কাছের, আরও আপন। এবং কামরুলের মাহাত্ম আসলে সবচেয়ে ভাল বলতে পারবে ওরাই।

আমি আসলে ঢোলে একটা বাড়ি দিয়ে গেলাম। বাকীরা এসে বাজাতে থাকুক এইবার, আমি দেখি।

রবিবার, ডিসেম্বর ০৭, ২০০৮

চাচামিয়া

আমি সোফার এক কোনায় পায়ের উপর পা তুলে আরেকটু আরাম করে বসে গলা উঁচিয়ে বললাম, চাচামিয়া, শেখ মুজিবরে নিয়াও কিছু বলেন, ওনারে আপনের কেমুন মনে হয়?

চাচা একটা গলা খাঁকারি দিলেন, তারপর প্রায় অদৃশ্য কোন একটা জায়গা থেকে একদম জুয়েল আইচের স্টাইলে একটা পান বের করলেন। তারপর শূন্যে সপাং সপাং খানিক্ষণ ঝেড়ে মুছে, পুরাই রজনীকান্ত স্টাইলে সেটা মুখে চালান করে দিলেন। পুরো পরিবেশটাই এমন সিনেমাময় যে, খানিকটা কান পাতলেই আমি ব্যাকগ্রাউন্ডে কোথাও দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার ধিড়িম ধিড়িম বাজনা শুনতে পাচ্ছিলাম।

চাচামিয়ার গলা আরও কয়েকবার শব্দ করে উঠলো। আমি সোফায় পা বদলে বসলাম। আগ্রহে বেশ খানিকটা সামনে ঝুঁকে আছি, কি বলবেন শোনার অপেক্ষায়।

যে বাড়িতে এসেছি, আমাদের পরিচিত এক বাংলাদেশীর বাড়ি সেটা, কিবরিয়া ভাই-র। সদ্য পুত্রসন্তানের পিতা হয়েছেন। এই আনন্দে কিবরিয়া ভাই আশপাশের অনেককেই নিমন্ত্রণ করেছেন। যাবো না যাবো না ভেবেও শেষমেষ হাজির হলাম। এমনিতেই অসামাজিক হিসেবে অনেক দুর্নাম কামিয়ে ফেলেছি। শুনেছি আড়ালে আবডালে আমার অহংবোধ নিয়ে বেশ নাকি কানাঘুঁষা চলে। সেসব প্রাচীর অবশ্য এক দু'বারের হাজিরায় লোপাট হবার কোন সম্ভাবনা নেই, তবু আসা।

তো আসা ইস্তক একটু বেকায়দায় আছি। এই বাড়িটা একটু আজিব কিসিমের মনে হলো। বসবার ঘর আর তার ঠিক পাশের ঘরটার ঠিক মাঝবরাবর একটা পর্দা টানা। কিবরিয়া ভাবী পর্দানশীন বলে জানি। কিন্তু আসা মাত্রই আমার বউ ঐ পর্দার আড়ালে চট করে হারিয়ে গেলো, তার আর দেখা পাচ্ছি না। এরকম পরিস্থিতিতে আমরা পাশাপাশি দুই রুমে বসেও এসএমএস চালাচালি করি, আজ চাচামিয়ার কথার তোড়ে সেটাও হচ্ছে না।
বসার ঘুরে ঢুকেই সামনে প্রমাণ আকৃতির একটা বুকশেল্ফ দেখে মনে ভরে গিয়েছিলো। কাছে যাবার উপায় নেই, দুর থেকে সেখানে জরির কাজ ওয়ালা কিছু বইয়ের ঝিলিক দেখতে পাচ্ছিলাম। লোকেদের ভিড় টিড় এড়িয়ে এক ফাঁকে কাছে গিয়ে দেখি, আঠারো খন্ড মওদুদী সমগ্র সেগুলো। মুখটা বিস্বাদ হয়ে গেলো সাথে সাথেই, এ তো একেবারে ডেরায় এসে পড়লাম দেখি! দুইবার চেয়ে নিয়ে পানি খেয়েছি, মুখের তেতো ভাব কমেনি তাতে একটুও, পানিতে কিছু মেশানো ছিলো কি না বসে বসে তাই ভাবছি।

তার মাঝে দেখা পেলাম এই চাচামিয়ার। ইনি কিবরিয়া ভাইয়ের বাবা। দেশ থেকে সদ্যই এসেছেন নাতিকে দেখতে, সাথে চাচীও আছেন। খানিক এদিক ওদিক তাকিয়ে আর কাউকে চেনা-জানা পেলাম না। তাই শেষমেষ কি বুঝে চাচামিয়ার ঘাড়েই চাপলাম।

আলাপ চালাতে একটু সমস্যা হচ্ছিলো অবশ্য। উনি কানে বেশ খাটো। গলা চড়িয়ে চড়িয়ে কথা বলতে হয়। দুয়েকটা শব্দ দুম করে চেঁচিয়ে হয়তো বলে ফেলা যায়। কিন্তু পুরো একটা বাক্য এরকম উঁচু স্কেলে শেষ করে আনাটা বেশ কসরতের কাজ। আমি গান টান গাই না, গলাও সাধি না, তাই বিপাকে পড়েছি।

চাচামিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, বৈদেশ কেমন লাগে চাচা?
সেই শুরু। চাচা এইবার ঠিক উপস্থিত বক্তৃতার বক্তার মত অদৃশ্য একটা মাইক্রোফোন ঠিক করে নিলেন। আমি খেয়াল করে দেখলাম, তাঁর সবকিছুতেই বেশ একটা স্টাইল আছে। লুংগি পড়া থেকে গলায় মাফলার জড়ানো বা কোন কথা বলার আগে মাথা পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী বাঁকিয়ে খানিকটা ধ্যান করে নেয়া, সবকিছু মিলিয়ে বেশ একটা বলিউড বলিউড ভাব। তিনি হড়বড় করে বললেন, এই দেশটা বাবা বেশ ভাল। ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আছে চারিদিকে। জন-মানু(ষ) কম, তাই বেশ আরাম লাগে। বাংলাদেশের মত ভিড় ভাট্টা নাই। দেশে যেরকম উঁচা উঁচা বিল্টিং, আর অনেক অনেক মানু, এইরকম তো এইখানে না, বোঝলেন না?
আমি বুঝলাম।
কানের ব্যাপারটা শুরুতে ধরতে পারিনি। চাচাকে পান সাজিয়ে দিতে এসে চাচী-ই হঠাৎ করে বললেন, বাবাজী, কালা মানুষ, একটু জোরে বলো ওনারে।
এইরকম অবলীলায় কাউকে কালা ডাকতে শুনিনি আগে, আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।

কেমন করে কানের এই সমস্যা, এই নিয়েও উনি না জিজ্ঞেস করতেই বলে দিলেন। এই ঘটনা বেশ ইন্টারেস্টিং। তখন যুদ্ধের সময়। চাচামিয়ার বাড়ি সীমান্তের পাশেই কোথাও। কোন এক সকালে উনি খেজুর গাছে উঠেছিলেন রসের হাঁড়ি বদল করতে। হঠাৎ ভারত থেকে উড়ে এলো এক বিমান। একেবারে ভোমরা-ঘুড়ির মতন শব্দ করে। মাথার একদম বিশ হাত উপর দিয়ে চলে গেলো সেই বিশ হাত লম্বা বিমান। আর সেই বিমানের শব্দে চাচামিয়ার কানে তালা লেগে গেলো, সেটা আজও খুলে নাই।

আমার বেশ খারাপ লাগলো শুনে। যুদ্ধের কথা জিজ্ঞেস করলাম, চাচামিয়া, কিছু "ইয়াদ" আছে আপনার?
এইবার মনে হয় চাচামিয়ারে গল্পের মুডে পেলো। "তা আছে না আবার?" বলে শুরু করতেই থেমে যেতে হলো। নতুন মানুষ এলেন। তাদের সাথে সালাম বিনিময় হলো। চাচামিয়া নতুন গল্পে মজে গেলেন।
হুট করে নির্বাচন প্রসংগ এলো। বললাম, চাচা, কি মনে হয়, কে যাবে এইবার?
চাচা একবার চোখ বুজে কি যেন ভাবলেন, সম্ভবত বক্তব্য গুছিয়ে আনলেন একটু। তারপর হঠাৎ করে বললেন, জিয়ার ছেলেরাতো ভাল না বাবাজী। জিয়ার কথা চিন্তা করেন, উনি মারা গেলেন। ওনার বাম পকেটে পাওয়া গেলো তিন টাকা, ডান পকেটে পাওয়া গেলো কুরান শরীফ...। কিন্তু তাঁর ছেলেরা...।
আমার পেটে একটু মোচড় লাগে। এই ব্যাপারগুলা কোন বাংলাদেশের ইতিহাস বা কোন জিয়াউর রহমানের কথা ইনি বলছেন ঠিক ধরতে পারলাম না। তবে, বুঝতে পারছিলাম, উনার পাল্লা শেষমেষ দাঁড়িপাল্লার দিকে টানবে।

এর মাঝে দুয়েকবার মাঝের পর্দা কেঁপে ওঠে। আমি চাচামিয়ার তীব্র দৃষ্টি এড়িয়ে তার ফাঁকে ফোকরে উঁকি মারি, যদি আমার বউটারে এক নজর দেখতে পাওয়া যায়।
তার খানিক পরেই কোন একজন ভাবী বেরিয়ে আসেন, মাত্রই অফিস থেকে ফিরেছেন তিনি বোঝা গেলো, কাজের পোশাক পরনে। এইভাবেই নতুন বাবু দেখতে চলে এসেছেন। চাচামিয়ার কাছ থেকে বিদায় নিতে আসলেন, চাচামিয়া চশমাটা হাতে নিয়ে কাঁচ দুটো একটু মুছলেন। তার অবিকল সিনেমার জাজদের মত গম্ভীর গলায় বললেন, মা জননী, আমরা মুসলমানের জাত, আমাদের কাপড় চোপরে যদি সেইটার ছাপ না থাকে কেমুন হয় বলেন? আপনে কিছু মনে নিয়েন না, আমি বুড়া মানু, আপনার ভাল-র জন্যেই বলছি, একটু ঢোলাঢালা কাপড় পরবেন।
ভাবী প্রায় মাটির সাথে মিশে গেলেন। আমি বৈদ্যুতিক শক খাওয়ার মত করে বেকুব হয়ে বসে রইলাম। ভাবী মাথা নেড়ে খুব দ্রুত বিদায় নিলেন। চাচামিয়ার নজরের জোর দেখে আমি চমৎকৃত হবো কি না বুঝলাম না!

আমি তখুনি, সোফায় পা বদলে বউয়ের জন্যে অপেক্ষার সময়টা কাটিয়ে দিতে বললাম, চাচামিয়া, শেখ মুজিবের কথা বলেন, উনারে আপনের কেমুন মনে হয়?

চাচামিয়া এইবার সাধু-সন্ন্যাসীদের মতন পাক্কা বিশ সেকেন্ড চুপ থাকেন। তারপরে বলেন, তার আগে একটা গল্প বলি বাবাজী। ফেরাউন আর তার বন্ধু গেছে এক রাজ্যে ঘুরতে, গিয়া দ্যাখে, সেইখানে সব জিনিসের দাম এক টাকা। কলার দামও এক, কাঁঠালের দামও এক। আবার ইলিশ মাছের দামও এক, কৈ মাছের দামও এক টাকা....।
আমি আবারও মাথা চুলকালাম। এইটা ফেরাউনের গল্প কেমনে হইলো? এটাতো আমাদের জসীমউদ্দীনের সেই "মুড়ি মুড়কির এক দর" এর গল্প। এই গল্পের ফেরাউন ভার্সন তো শুনি নাই।
চাচামিয়া ততক্ষণে বলে চলেছেন, তা বোঝলেন বাবাজী, তো মুজিব হইলো গিয়া ধরেন এই ফেরাউনের মতন...।

আমার তক্ষুনি একটা গায়েবী ফোন এলো। খুব জরুরী দরকারী ফোন। রিংটোনের বাজনা ছাড়াই আমি সেই ফোন ধরে অন্যপ্রান্তের কারও সাথে ব্যস্ত হয়ে কথা বললাম। তারপর অতি দ্রুত সেই পুলসিরাতের মতন কাঁপতে থাকা পর্দার পাশে দাঁড়িয়ে বেশ কবার হাঁকাহাঁকি করে আমার বউকে বের করে আনলাম। ওর হাত ধরে কানে কানে ফিসফিস করে বললাম, চল, ভাগি।
বউ অবাক, হলো কী?
সিঁড়ি বেয়ে ছুটে নামতে নামতে আমি হাঁপানো গলায় বললাম, তেমন কিছু না, এই মাত্র বাংলাদেশের ইতিহাসকে নতুন করে লেখা হবার হাত থেকে বাঁচালাম!

----------------
জনগুরুত্বপূর্ণ ডিসক্লেইমারঃ উপরে যাহা পড়িলেন, তার পুরোটাই চাপাবাজি। জীবিত বা প্রাক্তন-জীবিত কাহারো সাথে উক্ত ঘটনার কোনই মিল নাই। কেহ মিল খুঁজিয়া পাইলে, তাহা নিছকই কাকতাল বলিয়া জানিবেন।