বুধবার, জুলাই ০৮, ২০০৯

আবুল হাসান

এই বুড়ো বয়সে প্রায় বালকবেলার মতই উল্লসিত হয়ে উঠেছি, যখন কাগজের প্যাকেট খুলে দেখি, সেখানে চুপটি করে আমার জন্যে বহুকাল ধরে অপেক্ষা করছেন আবুল হাসান।
আমার শৈশব বা কৈশোর কেটেছে আবুলহাসানবিহীন, এবং আশ্চর্য হলো তাতে আমার কোন দুঃখও নেই। প্রাপ্তবয়স্ক হবার আগে মদের পেয়ালা মুখে তোলা মানা, এটা কে না জানে? এই দুপুর-রাতে তাই মাঝারি স্বাস্থ্যের বইটার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অজান্তেই কেমন নেশাতুর হয়ে পড়ি।
মজার ব্যাপার হলো, আবুল হাসানের নাম প্রথম ভালভাবে শুনি মির্জাপুরের সাকেব ভাইয়ের কল্যাণে। তিনি তখন প্রবল বিক্রমে সামহোয়ারইনে ব্লগিং করেন, কিন্তু আসল নামে নয়। একটা অদ্ভুত নিকে- চামেলি হাতে নিম্নমানের মানুষ। এই লম্বা ও আজব নিকের খোঁজ নিতে গিয়ে প্রথম শুনলাম আবুল হাসানের নাম, তারপরে পড়া হলো তাঁর আশ্চর্য সব কবিতা।

সাকেব ভাইই প্রথম কোট করেছিলেন, ঝিনুক নীরবে সহো, সহে যাও, ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুজে মুক্তা ফলাও।
তারপরে কোত্থেকে কেমন করে খুঁজে পাই সেই বিখ্যাত কবিতা, আসলে আমার বাবা ছিলেন নিম্নমানের মানুষ…। পড়ে টড়ে আমি বেমক্কা তব্দা খেয়ে বসে ছিলাম অনেকক্ষণ।

এবার তাই দেশ থেকে বই আনাবার সুযোগ পেতেই লিস্টির একদম শুরুতে রেখেছিলাম আবুল হাসানের কবিতা সমগ্রের নাম।
অবশেষে ঠিক যেন আকাশ থেকে টুপ করে আমার হাতে চলে এলো বইটা।

এটা একটা আশ্চর্য বোধ, যেন তেপান্তরের মাঠের মধ্যিখানে কেউ হঠাৎ করে আমার হাতে কোন অমূল্য রত্নভান্ডার ধরিয়ে দিয়ে উধাও হয়ে গেছে, আমি পাতার পর পাতা মুগ্ধ চোখে পড়েই যাচ্ছি কেবল। সে এক পাথর আছে কেবলি লাবণ্য ধরে- এই কবিতার নামও- আবুল হাসান!

একটু বোধহয় মাতলামীতে পেয়েছে আমাকে আজ। আপাতত সদ্য পড়া একটা চমৎকার কবিতা শুনিয়ে বিদেয় হই।

নিঃসঙ্গতা

অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক!

অতটা চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভিড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরো কিছু কম!

একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনি, চেয়েছিল

একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!

শুক্রবার, জুলাই ০৩, ২০০৯

সদ্য পড়া বইঃ শমন শেকল ডানা

হাসান ভাইয়ের বইটা হাতে আসতে বেশ লম্বা সময় লেগে গেলো।
বইমেলার পরপর একবার বই আনিয়েছিলাম কিছু, এবারে দেশ থেকে আরও কিছু বই আনালাম। বইগুলো হাতে পেয়ে দেখি একেবারে হাসান-হোসেনময় বই সব! আবুল হাসান আর আবু হাসান শাহরিয়ারের কবিতার কালেকশান, হাসান ভাইয়ের শমন শেকল ডানা আর আকমল হোসেন নিপুর জলদাসের মৎস্য ঘ্রাণ। শমন শেকল ডানাই পড়া শেষ হলো সবার আগে।

বইটার প্রচ্ছদেই বিষণ্ণ ছাপ রয়েছে একটা, মন খারাপ করিয়ে দেয়া একটা অনুভুতি, আশ্চর্য এই যে এই অনুভুতিটাই পুরো বইটুকু পড়ার সময় হাত ধরে হেঁটেছে আমার সাথে।

ফ্ল্যাপের ভূমিকাটুকু কে লিখেছে জানি না, কিন্তু খুব ভাল লিখেছেন। বই পড়তে শুরু করার আগেই বেশ ভাল রকম প্রস্তুত করিয়ে দেয় মনটাকে।
বইয়ের গল্পটা একেবারেই আমাদের চেনাজানা গল্প। গত কবছরে, বা তারও আগে থেকে এখন পর্যন্ত, বা আর কোন অজানা ভবিষ্যত পর্যন্ত হয়ত এই গল্পের ভেতরের ঘটনাগুলোকে ঘটতে দেখেছি এবং দেখতে থাকবো আমরা। বামপন্থী মিছিলের সামনে দাঁড়ানো ছেলেটি সামরিক বাহিনিতে যোগ দিয়ে কেমন করে বদলে যায়, অথবা রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকা নাসিমা আপা মৌলবাদী স্বামীর কবলে পড়ে কেমন করে বোরকার অন্তরালে চলে যায়। পাহাড়ের মানুষদের উচ্ছেদের গল্পও আছে এখানে, ধর্মের ব্যবধানে সংখ্যায় কম যারা, অত্যাচারিত হয়ে তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাবার দুঃখও আছে। একদম, পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনের খবরগুলোই গল্প হয়ে এসেছে এ বইটিতে।
তবে এখানেই খানিকটা সমস্যা আছে। বইয়ের গল্পটি আমাদের জানা, এবং বইটি পড়ে শেষ করার পর আমি আর নতুন কোন অনুভবে আন্দোলিত হইনি। এই জায়গাটায় সম্ভবত হাসান ভাই কিছু করে দেখাতে পারতেন।
হাসান ভাইয়ের লেখার স্টাইল চমৎকার, খানিকটা ফিচারধর্মী, অবশ্য একথা বললে সরলীকরণ হয়ে পড়ে। আরেকটু ভালভাবে বললে, উনি যা করেন, একটা স্টেটমেন্ট দেন, তারপর সেটাকে ঘিরেই আবর্তিত হতে থাকে গল্পের বুনোট।

একটু অবাক করা ব্যাপার হলো, বইটির মধ্যে তাড়াহুড়োর ছাপ পেয়েছি আমি। অথচ এমনটা হবার কথা নয়। গ্রন্থ হিসেবে বের হবার কথা ছিলো গতবইমেলায়, তার মানে তখুনি একটা বই হিসেবে এটা তৈরিই ছিলো, কিন্তু বের হয়েছে এবারের বইমেলায়। মাঝখানে অন্তত এক বছর সময় ছিলো, এর পরেও বইটির কোথাও তাড়াহুড়োর চিহ্ন আশা করিনি।

গল্পের যে মূল চরিত্র, মানে কথক, তার সাথে একাত্ম বোধ করার জন্যে যথেষ্ঠ সময় দেননি লেখক। পড়ছিলাম, মনে হচ্ছিলো, খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছি যেন, ঘটনাগুলোও আমার পরিচিত, জানা, কিন্তু কোনটাই যেন ঠিক আমার ঘটনা নয়, যেন দেয়ালে লাগানো স্ক্রাপবুকের মত করে আঠা দিয়ে সাঁটা বিচ্ছিন্ন কিছু ছবি দেখে চলেছি আমি। এই ব্যাপারটাতেই আমার মনে হয়েছে, আরেকটু যদি আপন আপন করে তুলতেন চরিত্রটাকে, আরেকটু যদি আমি-আমি!

অবশ্য, বইয়ের পরিচিতি দিতে গিয়ে ফ্ল্যাপে বলা হয়েছে, এটি একটি ডকুফিকশন। এ কথাটা মাথায় রাখলে উপরের অনেক অভিযোগই খন্ডিত হয়ে যায়, কিন্তু তারপরেও আমার মতে, এটিতে ফিকশনের চেয়ে ডকু-র পাল্লাই ভারী থেকে গেছে!

আর, বইয়ের চেহারা ছবি নিয়ে বেশ দুঃখ পেলাম। খানিকটা এতিম এতিম লেগেছে বইটিকে। প্রকাশনায় যত্নের খানিকটা অভাব ছিলো যেন। বইয়ের ফরম্যাটিং অমনোযোগের ছাপ নিয়ে এসেছে, কাটা বা বাঁধাইয়েও পাশ মার্ক পাবে টেনেটুনে। ঠান্ডা, বা ভন্ড- এ ধরণের শব্দগুলোর "ন্ড" আসেনি একটাও, ফ্ল্যাপের সব গুলো "ণ" সপাটে হয়ে গেছে "ন", আর মায়িশা নামটা অনেক জায়গায় হয়ে গেছে মালশা! বাংলা হরফে লেখা ইংরেজি যে বাক্যগুলো কথোপকথনে ব্যবহৃত হয়েছে, তাতেও রয়ে গেছে অনেক ভুল। আরও দুঃখ পেয়েছি, বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় বিভিন্ন রকমের স্পেসিং দেখে, দু লাইনের মাঝের ফারাক কোথাও কম, কোথাও বেশি। হাতে এক বছর পাবার পরেও বইটির উঠ-ছেঁড়ি-তোর-বিয়া ধরণের গেটআপ মনঃপুত হয়নি আমার।

দীর্ঘ অপেক্ষার পরে বইটি হাতে পেয়ে মনে হলো, লেখক ও প্রকাশক এই বেচারা পাঠকের উপরে সুবিচার করেননি তেমন।
তবে আমি জানি, খুব ভাল করেই জানি যে হাসান ভাইয়ের হাতে জাদু আছে। পরবর্তী বইয়েই তিনি আবার তাঁর মত করে ফিরে আসবেন বলেই আশা রাখি।