মঙ্গলবার, অক্টোবর ২০, ২০১৫

জালালের গল্প

সর্বশেষ ইমনের করা কাজ দেখেছিলাম আমাদের বসার ঘরের টিভিতে, সেটা ছিল আরএময়াইটি-র ফিল্ম কোর্সের জন্যে ওর বানানো একটা শর্ট ফিল্ম। ইমন আর তন্বীর মেলবোর্নে থাকাকালীন একটা বছর আমাদের জন্যে উল্লেখযোগ্য একটা সময় হয়ে থাকবে আজীবন, সেটা নিয়ে লিখেছি আগে এখানেই, নাম ছিল ‘গগন আজ দেশে ফিরছে”। সে দিন সকাল বেলা আমাদের বাসায় বসে দুইজনে ব্যাগ গোছাচ্ছে, আর পাশের ঘরে বসে আমি ভীষণ মন খারাপ করে লিখে চলেছি সেই ব্লগ, অতঃপর রাতে যখন ওদের প্লেনে তুলে দিয়ে আসলাম, মনে আছে তারপরের অনেকগুলো দিন আমার আর তিথি-র চারপাশ জুড়ে ছিল একটা অদ্ভুত শূন্যতা।

সেই প্লেন উড়ে চলে যাবার বছর চারেক বাদেই যে আমি আবু শাহেদ ইমনের পরিচালিত সিনেমা বড় পর্দায় দেখার জন্যে এই মেলবোর্নেরই এক সিনেমা হলের টিকেটের লাইনে দাঁড়াবো, সত্যি বলছি, এই কথা সেদিন ঘুর্নাক্ষরেও ভাবিনি! 

কিন্তু এই ছেলে আসলে চমকে দিতে জানে! প্রতিবার ওর সাথে কথা বলার সময় নতুন কোন চমকের জন্যে প্রস্তুত থাকি, চমকে দেয়াটাকেই একরকম নিয়মে পরিণত করেছে সে! 

জালালের গল্প- নিয়ে ওর ভাবনার কথা জানি অনেকদিন। শুরুর দিকের একটা স্ক্রিপ্ট রয়েছে আমার কাছে, যখন এই গল্পের নাম ছিল জালালের পিতাগণ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিছু ছেলেমেয়ে ছিল গল্পের গুরুত্বপুর্ন চরিত্র। কিন্তু ইমনের মজা হল এই, ওর মাথায় গল্পেরা সারাক্ষণই বদলে বদলে যায়। এই অভ্যাস দেখেছিলাম ইমন যখন এখানে ছিল, তখুনি। তাই ওর জালালের গল্প দেখতে গিয়ে যখন দেখি শুরুর সেই গল্প একেবারে আগাগোড়া বদলে গেছে, একেবারেই অবাক হইনি, মনে হয়েছে, এটাই আসলে ইমন, ওর ট্রেডমার্ক।  

সিনেমার শুরুটা দুর্দান্ত! একটা রান্নার হাঁড়িতে করে ভাসতে ভাসতে আমাদের জালাল এসে পড়ে  গ্রামের মিরাজের ঘরে। সেখানে ঘটনাক্রমে সে হয়ে যায় শিশু-পীর। তার পা ধোয়ানো পানি খেয়ে রোগ সেরে যাচ্ছে দুরারোগ্য রোগীর, এইরকম এক গুজব রটে যায় গ্রামে গ্রামে, ভাগ্য ফিরে যায় মিরাজের। সেখান থেকে ধীরে ধীরে শুরু হয় গ্রাম্য-রাজনীতি। সেই রাজনীতির চাপে পড়ে জালালকে আবার ভেসে যেতে হয় হাঁড়িতে করে। 
শৈশবের এই অংশটুকুর নাম দি এরাইভাল। এভাবে এমনি করেই আরও দুটি পর্বে আমরা দেখি জালালের কৈশোর ও যুবক বয়সের গল্প। 

পুরো গল্প এখানে বলে দিতে চাইছি না আসলে, তারচেয়ে বরং সিনেমার অন্য কিছু দিক নিয়ে কথা বলি। 

পুরো সিনেমাটাই চমৎকার গতিময়। কোথাও এতটুকু থেমে যায়নি, প্রতি মুহুর্তেই অপেক্ষা করে ছিলাম পরমুহুর্তে কী হবে তা দেখার জন্যে। জালাল হিসেবে কিশোর ও তরুণ বয়েসী দুজনের অভিনয় খুবই ভাল ছিল। প্রয়োজনমত মজার কিছু সংলাপ দর্শকদের হাসিয়েছে নিয়মিতই। মিরাজের বউ যখন মিরাজকেই পানিপড়া খেতে বলে, সেই সংলাপ শুনতে শুনতে এটা যে ইমনেরই লেখা সংলাপ সেটা মিলিয়ে নিয়েছি মুহুর্তেই। অথবা যেখানে নিঃসন্তান তৌকির তার নবপরিণীতা স্ত্রীকে বলে, ‘কালো হয়ে যাবা তো’, বা সেই স্ত্রী যখন তার দেবরতুল্য তরুণটিকে দুধের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘তুমি খাইবা না?’ - পুরো সিনেমা হল জুড়েই দর্শকেরা হা হা শব্দ করে হেসে উঠেছিলো! 

পরের দু’পর্বে গল্প বদলে যায় যদিও। কখনো কখনো বিষণ্ণতা ঘিরে ধরে, কখনো হাসির নির্ভারতা, কখনো গল্পের গতিপথ হঠাত বদলের চমক! 
মিউজিক খুবই ভাল লেগেছে পুরো ছবিতেই। চিরকুট খুব যত্ন নিয়ে করেছে মিউজিকের কাজ, বেশ বোঝা যায় সেটা। লোকেশান বাছাই অপূর্ব ছিল। বিশেষ করে নদী-পাড়ের কিছু দৃশ্য, সাথে মাছ ধরার জাল, এরকম অতুলনীয় কিছু ছবি এখনও মাথায় গেঁথে আছে। 

তৌকির, মৌসুমি, শর্মীমালা, মিতালি দাশ এরা প্রত্যেকেই অসাধারণ অভিনয় করেছেন। মোশাররফ করিম যদি তার নিজস্ব অভিনয়ধারা থেকে বেরিয়ে এসে গল্পের সাথে আরেকটু মিশে যেতে পারতেন, তবে আরও ভালো হতো। মিরাজের শ্যালকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন যিনি, আমি সম্ভব হলে তাকেই পুরস্কৃত করতাম। এরকম দুলাভাই ভক্ত শ্যালক পাওয়া দুষ্কর। ছবিটি দেখতে দেখতেই মনে মনে ইমনকে বাহবা দিয়েছি এই চরিত্রটি নিয়ে আসার জন্যে। তেমনি করে বিভিন্ন রঙের হাঁস কিংবা ঘরভর্তি গাছপালা-র ডিটেইল পরিচালকের প্রতি মুগ্ধতা বাড়িয়েই দেয় কেবল। 

একটা চমৎকার গল্পের সাফল্য নির্ভর করে তার সমাপ্তির ওপরে। শুধু এইটুকু বলি, এর শেষটার জন্যেই জালালের গল্প-কে মনে থাকবে অনেক অনেক দিন। ব্রাভো ইমন! 

যতদূর শুনলাম, জালালের গল্প- ইতিমধ্যেই দিগ্বিজয়ী বীরের ভূমিকা নিয়ে ফেলেছে। ভারতের সপ্তম জয়পুর চলচ্চিত্র উৎসবে এটি আবু শাহেদ ইমন-কে এনে দিয়েছে সেরা নবাগত নির্মাতার পুরস্কার। পর্তুগালের আভাঙ্কা উৎসবে এটি একেবারে সেরা ছবি-র পুরস্কারই জিতে নেয়। ওর ছবি নিয়ে ইমন ইতিমধ্যেই জার্মানির পথে রয়েছে শুনলাম, সেখানকার বিভিন্ন উৎসবে ছবিটির প্রদর্শনী হবে। এবং সবচেয়ে দুর্দান্ত খবর হল, এবারের অস্কারেও বাংলাদেশ থেকে অংশ নিতে যাচ্ছে এই ‘জালালের গল্প’ই, এর চেয়ে দারুণ খবর আর কীইবা হতে পারে! 

চার বছর আগের লেখাটি শেষ করেছিলাম ইমনের জন্যে শুভকামনা দিয়ে, আজকে তার সাথে রইলো উঠে দাঁড়িয়ে ওর জন্যে একটা জোরসে করতালি! বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আবু শাহেদ ইমনদের হাত ধরে আরও পরিণত হয়ে উঠুক, বিশ্ব-চলচ্চিত্রে মাথা উঁচু করে থাকুক, এটাই প্রত্যাশা আমাদের। 

তারেক নুরুল হাসান
মেলবোর্ন, ২০/১০/২০১৫ 



রবিবার, অক্টোবর ১১, ২০১৫

শ্রোতার আসর- কে শুভেচ্ছা

শ্রোতার আসরের দশ বছর পূর্তির পরিবেশনা দেখে একটা চমৎকার সুখানুভূতি নিয়ে শনিবারের রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম আমার মেলবোর্ন জীবনেরও দশ বছর হয়ে গেলো। দশ বছর, একটা লম্বা সময় আসলে। 

এই দূর পরবাসে একটা বাংলা গানের দলের দশ বছর পূরণ করে ফেলাটা কিন্তু মুখের কথা নয়।  প্রবাসে বসে বাংলা ভাষা, সঙ্গীত বা সংস্কৃতির চর্চা করা কী পরিমাণ কষ্টসাধ্য একটা কাজ, এটা যারা না করেছেন, তারা আসলেই জানেন না। ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানো - এটা অনেকের কাছেই কেবলই একটা কথার কথা, কিন্তু এই কথাটির একদম শত ভাগ বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় এধরনের দলগুলোয়। নিজেদের চাকরি, সংসার, ছেলে পেলে, অন্যান্য সামাজিকতা এই সব কিছু করে তারপরে একেকটা প্রোগ্রামের জন্যে সময় বের করতে হয়। কাজের পরে প্র্যাকটিস, সবার সময় মিলানো, গায়কদের সাথে যন্ত্রশিল্পীদের সমন্বয়, মঞ্চের যোগাড়যন্ত্র, কখনো আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার জন্যে ছোটা, কখনো সেটা ছাড়াই...। এই সব মিলিয়ে একটা এলাহি কারবার আসলে।
এই এত কিছু করে করে একটা গানের দল আজকে দশ বছর পূর্ণ করে ফেললো, তাদের শুভেচ্ছা না জানিয়ে উপায় নেই। শ্রোতার আসরকে তাই শুভেচ্ছা জানাই।
মেলবোর্নে গান শুনতে গিয়ে নিদারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে প্রায়ই। কখনো পুরো অনুষ্ঠান দেখে মনে হয়েছে সপ্তম শ্রেণির শিশুকিশোরের ট্যালেন্ট শো দেখছি, যে যা পারছে, অথবা যা পারছে না, সব কিছু নিয়েই মঞ্চে উঠে যাচ্ছে। কেউ কেউ এক সময় গাইতেন, এখন মঞ্চে মাইক দেখে ভাবলেন দিই না একটা গান গেয়ে- এরকম মনোভাব নিয়ে গেয়ে দিলেন একটা গান, এমনও হয়েছে। এক অনুষ্ঠানে একবার আবেগতাড়িত এক ভদ্রলোক হারমোনিয়াম টেনে হঠাত ‘এবার একটা পুজোর গান শোনাই’ বলে গেয়ে উঠলেন ‘আমার পূজার ফুল ভালবাসা হয়ে গেছে... ’! বিশ্বাস করুন, আমার হৃদযন্ত্র তার ক্রিয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল সেদিন!
এই এত কিছুর মাঝখানে শ্রোতার আসর অনেকটা সুবাসের মতন। ওদের সবচেয়ে যেটা বেশি ভাল লাগে, তা হচ্ছে অভিনবত্ব। একটা পুরো অনুষ্ঠান সলীল চৌধুরীকে নিবেদন করে করা, এই প্রবাসে বসে ভাবা যায় এরকম? অথবা কখনো শচীন দেব বর্মনের গান দিয়ে সাজানো, কখনো থিম বেছে নেয়া হয় চিঠি, কখনো বাদল দিনের গান। এরকম চমৎকার সব অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ করে দিয়েছে আমাদের শ্রোতার আসর।
চমৎকার সব যন্ত্রশিল্পী রয়েছে এই দলটায়। পরিচিত গান, কিন্তু নতুন নতুন এরেঞ্জমেনটে গেয়ে কী শ্রুতিমধুর হয়ে ওঠে শেষমেশ।
ইউটিউবে গিয়ে গিয়ে পছন্দের গান শুনি আমরা প্রায় সবাইই। কিছু গান বারবার শোনা হয়। দেখা যায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই গানগুলো হয় সুপরিচিত শিল্পীদের গাওয়া। অথচ শ্রোতার আসরের অনুষ্ঠান দেখে এসে এমন হয়েছে, আমি ইউটিউব ঘুরে ঘুরে বার বার হয়ত শুনছি আমার অসম্ভব ভাল লাগা গান ‘কে যাস রে’, কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, আমি হয়ত শুনছি শ্রোতার আসরের সিমিনের গাওয়া ভার্সনটাই। একই ভাবে বার বার শুনি কাঁকনের গাওয়া ‘কেউ কোন দিন আমারে তো’। এই ব্যাপারটা আমার নিজের কাছেও ভাল লাগে, মনে হয়, একজন শিল্পীর এটাই তো সত্যিকারের প্রাপ্তি, শ্রোতার মনের ভেতরে ঢুকে পড়াটা।
আজকের অনুষ্ঠানটাও এক কথায় চমৎকার হয়েছে। অনেক ভাল লেগেছে শমী-র ‘তখন তোমার একুশ বছর...।’  গায়কদের মঞ্চে নিয়ে এসে তাদের সাথে কথা বলে বলে দর্শকদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার প্রচলন অন্তত এই প্রবাসে খুব বেশি দেখিনি। এ ব্যাপারটা কত যে হয়েছে, একটা লম্বা অনুষ্ঠান দেখে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভেবেছি, আচ্ছা ওই গানটা খুব ভাল লেগেছিল, কে যেন গেয়েছিল? দেখি সেটা আর মনে নেই। এত কম মানুষদের মাঝেও গানের শিল্পীরাই কেমন করে যেন আড়ালে থেকে যায়। তাই, এভাবে শিল্পীদের সামনে নিয়ে আসা, দর্শকদের মাঝে নিয়ে আসার ব্যাপারটা প্রশংসার যোগ্য। এই খানে বলে ফেলি, অন্তত আজকের পরিবেশনার স্টাইলের জন্যেই, গায়ক বা বাদ্যযন্ত্রীদের সাথে সাথে প্রায় সমান কৃতিত্ব দিতেই হবে উপস্থাপক আতিক রহমানকে। ওনার সাবলীলতা এবং রসবোধ আজকের অনুষ্ঠানের প্রাণ ভোমরা হয়ে ছিলো।
আরও ভাল লেগেছে মালা-র একদম হৃদয় নিংড়ানো গান ‘বলি মা তোর চরণ ধরে...’। কী যে ভাল লাগে কেউ যখন একদম অন্তর থেকে গায়! ভাল লেগেছে মৌলী, হিমানী, অনিন্দ্য, চঞ্চলজাকি আমানের গানও।
শ্রোতার আসরকে বলি, দশ বছর পরে আপনাদের প্রাপ্তি  আসলে কী জানেন? আমরা গান-প্রেমীরা মেলবোর্নের প্রায় সব অনুষ্ঠানেই হাজিরা দেই। সব অনুষ্ঠানে যাই এক ধরণের জুয়া খেলার মত করে, হয়ত গান ভাল লাগবে, হয়ত লাগবে না। হয়ত সন্ধ্যাটা সুন্দর কাটবে হয়ত কাটবে না। কিন্তু শ্রোতার আসরের অনুষ্ঠান দেখতে যখন যাই, আমরা সেই আশা নিয়ে যাই যে আজকে একটা ভাল অনুষ্ঠান দেখতে যাচ্ছি, ভাল কিছু গান শুনতে যাচ্ছি। 

সেই আশা দিনে দিনে আরও বেড়ে উঠুক, আপনাদের জন্যে রইলো শুভকামনা। 

বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০১, ২০১৫

বাংলা ভুলে গেছি!

সকালে ঘুম থেকে উঠে আমাদের কী কী মনে হতে পারে? 
সবচেয়ে প্রচলিত যেটা হয়, গভীর ঘুম ভাঙ্গার পরে হঠাত বুঝে উঠতে খানিক সময় লেগে যায় যে, এখন কোথায় আছি। ছোটবেলায় এরকম হতো, আমি কি গ্রামের বাড়িতে আছি নাকি নিজের বিছানায় শুয়ে সেটা বেশ খানিকক্ষণ বুঝতে পারতাম না।
হোস্টেলে থাকাকালীন সকালে ঘুম ভাঙ্গতো বাঁশির শব্দে। ছুটিতে বাসায় ফিরতাম যখন মাঝে মাঝে কোথা থেকে যেন বাঁশির শব্দ শুনতে পেতাম, ঝট করে ঘুম ভেঙ্গে কিছুক্ষণ বুঝতে পারতাম না কোথায় আছি এখন, বাসায় নাকি কলেজে!
এখন এই মাঝবয়সে এসে মাঝে মাঝেই সকালে উঠে আয়নায় তাকিয়ে মনে হয় বুড়ো হয়ে যাচ্ছি বেশ। মেটামরফোসিস গল্পের কথা মনে পড়ে যায়, যে গল্পে একদিন সকালে হঠাত উঠে গ্রেগর দেখে যে সে একটা পোকা হয়ে গেছে, মানুষ নেই আর।
স্কুল জীবনে কোন কোন কঠিন বিষয়ের পরীক্ষার দিন সকালে উঠেই সবার আগে আমার মনে হতো, কাল কী কী পড়েছি সব ভুলে গেছি, কিচ্ছু মনে নেই! সাংঘাতিক আতঙ্কে কাটতো কিছু মুহুর্ত। 

আজ সকালে উঠে, হাতে কিছু সময় পেয়ে, পত্রিকা খুলে বসলাম। প্রথম আলো। সেখানে চিত্র সমালোচনার পাতাটি পড়তে গিয়ে আমার পরিষ্কার মনে হল, আমি নির্ঘাত বাংলা ভুলে গেছি।
ভাল করে পড়ে দেখলাম লেখাটি আসলে বাংলাতেই লেখা, কিন্তু পড়ে সত্যিই অনেক কিছু বুঝতে পারছি না। লেখকের নাম মতিন রহমান, পরিচিত লাগলো নামটি, এই নামে একজন সিনেমা পরিচালক আছেন বলে মনে পড়ছে, জানি না তিনিই লেখক কিনা। লেখাটির কিছু শব্দের ব্যবহার বুঝিনি, কিছু বাক্য মনে হয়েছে অসমাপ্ত, কোন অর্থ দাঁড় করাতে পারেনি। কিছু শব্দের অর্থও জানি না মনে হল। লেখা থেকেই কিছু উদাহরণ তুলে দিচ্ছি, অর্থ বুঝিয়ে দিতে যদি কেউ এগিয়ে আসেন তাঁকে আগাম ধন্যবাদ! 
 


‘গল্পের আঙ্গিক বৈশিষ্ট্যে ধৃত হয়েছে ভারতীয় পরিবারের ছেলেমেয়ে যারা উচ্চশিক্ষায় বিদেশে গিয়ে হোটেল, রেস্তোরাঁয়, রেলস্টেশনে প্রেমখেলায় সময় কাটায়।’ - এ বাক্যটায় প্রথম চারটা শব্দের অর্থ করতে পারছি না, শেষটুকুও না। 

‘অজয়ের চরিত্রভাবে প্রশ্ন জুড়ে গল্পে বিরতি ঘোষিত হয়।’ - মানে বুঝিনি। 

‘বেশ কিছু কৌতুক ও উপভোগ্য রহস্য দৃশ্যের মাঝ দিয়ে গল্পটি নায়ক-নায়িকার ভাবমূলক দাবি থেকে অজয়ের বাবা বোধমূলক প্রাপ্তির দিকে নিয়ে যায়। অজয়ের বাবার নাট্য রসানুভূতিমূলক দৃশ্য বেশ উপভোগ্য।’ - ভাবমূলক দাবি, বোধমূলক প্রাপ্তি, রসানুভূতিমূলক দৃশ্য- এই ব্যাপারগুলো আসলে কী?  

‘গীতদৃশ্যে শিল্পীদের অঙ্গমুদ্রার বর্ণনাত্মক ভঙ্গি সুসামঞ্জস্য।’-  মিলছে না মনে হচ্ছে। 

‘ক্যামেরার অহেতুক কারিগরি কৌশলগতি থেকে আশিকী ভারমুক্ত।’ - কৌশল, ঠিক আছে, গতি কেন?
‘বৃষ্টিভেজা সকাল’সহ প্রতিটি গানের গীতসংলাপ শ্রুতিমধুর।’ - গীতসংলাপ, এটা কী, এবং কেন?
রাহুল ও শ্রুতির চুম্বনপূর্ব দৃশ্যে ক্লোজড শটে নীরবতা উভয়ের স্পটে যোগসূত্রের নির্মাণ।’- এ বাক্যের কোথায় শুরু, কোথায় শেষ, স্পট কী? পুরো বাক্যের কী মানে দাঁড়ায়?
অজয়কে উদ্ধার করতে রাহুলের গাড়ি চালিয়ে আসা ইন্টারকাট রীতিতে গড়ে তোলা দৃশ্যটি সম্পাদকের মস্তিষ্ক–প্রসূত করতে বাসনা। তবে স্টিম ইঞ্জিন ট্রেনের আগুয়ান গতিময় শটের সঙ্গে কম্পার্টমেন্ট দৃশ্যের স্টোটিক শটগুলোর সংযোগ ধারাবাহিকতা বিভ্রাট ঘটায়।’ - মস্তিষ্ক-প্রসূত করতে বাসনা কী জিনিস? স্টোটিক শট কী?
যৌথ দেশের যৌথ মেধাশ্রমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে নির্মিত আশিকী প্রথাবদ্ধ প্রেম কাহিনির চর্বিতচর্বণ। দর্শকের দৃষ্টিতে সময় কাটানো সিনেমা খোলা। এম এ আজিজ ও অশোকপতি পরিচালকদ্বয়ের ‘হিস্টরি রিপিট’।’ - সিনেমা খোলা এটা কী? খায় না মাথায় দেয়?
পুরোটা কয়েকবার পড়লাম। বুঝিনি ভাল করে এখনো। আরও ক’বার পড়বো কিনা ভাবতে ভাবতেই  মনে হল তার চেয়ে সিনেমাটাই দেখে ফেলা ভাল হবে। আমার অবুঝমূলক ভাবনা আগুয়ানিত হয়ে মস্তিষ্ক গীতসংলাপে সুসামঞ্জস্য হয়ে যাবে!